টারজান, হাস্টাকে শুধাল, আমাদের কি করতে হবে?
লালের সঙ্গে সাদার যুদ্ধ চলবে যতক্ষণ না লাল অথবা সব সাদা মারা পড়ে।
দুই দল মলু-ক্ষেত্রের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রিফেক্ট লড়াইয়ের নিয়মকানুন শুনিয়ে দিল। ভেরী বেজে উঠল। দুই দলের সশস্ত্র মানুষ এগিয়ে চলল পরস্পরের দিকে। শুরু হল দুই দলের মুখোমুখি লড়াই।
অনেকক্ষণ ধরে লড়াই চলল। দংশনক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ যুঝে ভুজঙ্গ সনে।’ এ এক আশ্চর্য লড়াই। বাঁচার লড়াই। নিয়ম নেই, নীতি নেই। হয় তোমার জীবন যাবে, নয়তো আমার।
রক্তাক্ত লড়াই শেষ হল। লালের দলে তখনও পনেরোজনই বেঁচে আছে।
তখন জনতা সমস্বরে চীৎকার করে বলতে লাগল, বিজয়ীর মালা লালদের গলায় পরিয়ে দেয়া হোক; কিন্তু তার পরিবর্তে একমাত্র টারজান ছাড়া বাকি সকলকেই মলু-ক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল।
সকলে ভাবল, সাবলেটাস হয়তো তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করতে ইচ্ছুক। কিন্তু এ সব কী হচ্ছে?
ক্রীতদাসরা এসে মৃতদেহগুলোকে মলু-ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল; পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্রগুলো কুড়িয়ে নিল; নতুন করে বালি ছড়িয়ে দিল। টারজান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সিজারের আসনের নিচে, একাকি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
বুকের উপর দুই হাত ভাঁজ করে টারজান দাঁড়িয়েই আছে। কিসের জন্য এ প্রতীক্ষা তাও সে জানে না। জনতার ভিড়ের ভিতর থেকে ভেসে এল একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ-ক্রমেই সে আর্তনাদ তীব্রতর হতে হতে প্রচণ্ড ক্রোধের চীৎকারে পরিণত হল, আর সে সব কিছুকে ছাড়িয়ে টারজনের কানে বাজতে লাগল। কয়েকটা শব্দ ও অত্যাচারী! ভীরু! বিশ্বাসঘাতক! সাবলেটাস নিপাত যাক!
প্রিফেক্টকে কাছে ডেকে সিজার ফিসফিস করে আবার তার সঙ্গে কি যেন পরামর্শ করল। বেজে উঠল ভেরী। প্রিফেক্ট উঠে দাঁড়াল। হাত তুলে বলতে লাগল, এই বর্বর লোকটির অসাধারণ ক্রীড়া-কৌশল সম্রাটের এতই ভাল লেগেছে যে তার প্রিয় প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য তাকে দিয়ে আর একটি নতুন। খেলার ব্যবস্থা-প্রিফেক্ট তার কথা শেষ করতে পারল না; বিস্ময়ে ও রাগে সমবেত দর্শকরা হৈ-হৈ করে উঠল। সিজারকে লক্ষ্য করে নানা রকম ধ্বনি দিতে লাগল। উদ্যত বল্লম হাতে সৈনিকরা তাদের ঠেকিয়ে রাখতে লাগল।
এমন সময় মলু-ক্ষেত্রের শেষ প্রান্তের ফটকটা সপাটে খুলে গেল।
মলু-ক্ষেত্রের শেষ প্রান্তের দিকে তাকিয়ে টারজান দেখল, ছ’টি গোরিলাকে ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কয়েক মিনিট আগেই মল্ল-ক্ষেত্র থেকে উৎসারিত বিজয়-গর্জন তাদের কানে গেছে; তাই উত্তেজনায় ও হিংস্রতায় কাঁপতে কাঁপতে তারা খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সামনেই দেখতে পেল একটি ঘৃণিত টারমাঙ্গানিকে। যারা তাদের বন্দী করেছে, বিরক্ত করেছে, আঘাত করেছে, এ তো তাদেরই একজন।
একটি গোরিলা গর্জে বলল, আমি গোয়াট। আমি খুন করি।
আর একটিও গর্জে উঠল, আমি জুঠো। আমি খুন করি।
গো-ইয়াড ঘেঁকিয়ে বলল, টারমাঙ্গানিকে মার।
তারা হেলে-দুলে এগোতে লাগল।
ওদিকে জনতা শিস দিচ্ছে, আর্তনাদ করছে। সে সব ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে তাদের স্লোগন : সিজারের পতন হোক! সালেটাস মুর্দাবাদ!
গোরিলারা এগিয়ে চলল। সকলের সামনে জুঠো। সে বলল, আমি জুঠো। খুনে।
টারজান বলল, বন্ধুকে খুন করার আগে ভাল করে তাকাও জুঠো। আমি অরণ্যরাজ টারজান।
জুঠো অবাক হয়ে থেমে গেল। অন্যরা তাকে ঘিরে দাঁড়াল।
গো-ইয়াড বলল, আমি ওকে চিনি। আমি যখন যুবক ছিলাম তখন ও ছিল রাজা।
গাইয়াট বলল, সত্যি তো এর চামড়া সাদা।
টারজান বলল, হ্যাঁ, আমি সাদা-চামড়া। এখানে আমরা সকলেই বন্দী। এই সব টারমাঙ্গানিরা আমাদের শত্ৰু, তোমাদের শত্রু। ওরা চায় আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, কিন্তু আমরা তা করব না।
জুঠো বলল, না, আমরা টারজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না।
সাবলেটাস পাশের অতিথিকে শুধাল, কি ব্যাপার? ওরা ওকে আক্রমণ করছে না কেন?
লোকটা ওদের মন্ত্রে বশ করেছে, অতিথি বলল।
উপস্থিত জনতা হা করে দেখছে। তারা দেখল, টারজান সিজারের আসনের দিকে এগিয়ে চলেছে; গোরিলারা হেলে-দুলে চলেছে তার পাশে পাশে।
সম্রাটের আসবেন নিচে পৌঁছে তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। টারজান সাবুলেটাসের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার সব ফন্দি ব্যর্থ হয়েছে সিজার। এরা সবাই আমার আপনজন। আমার কোন ক্ষতি এরা করবে না। বরং আমার এক কথায় এরা গিয়ে তোমাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে।
সে কাজ টারজান অনায়াসে করতে পারত, কিন্তু তার পরেই তো সৈনিকদের হাতে বল্লমের আঘাতে তারও ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। তাছাড়া, নিজে পালিয়ে যাবার আগে ক্যাসিয়াস হাস্টা ও সিসিলিয়াস মেটেলাসকেও তো সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে; তাদের সাহায্য ছাড়া সে তো এরিক ভন হারবেনের খোঁজই করতে পারবে না।
তাই প্রিফেক্ট যখন আবার তাকেও গোরিলাদের কারাগারে ফিরিয়ে নিতে এল তখন সে কোনরকম বাধাই দিল না। মলু-ক্ষেত্রের ফটক বন্ধ হয়ে গেলে আবার একবার তার কানে এল জনতার সমবেত কণ্ঠস্বর ও সাবলেটাসের পতন হোক।
কারাগারে ঢুকেই টারজান দেখতে পেল ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসকে। এক বন্ধুর চেষ্টায় কারাগারের চাবিও তাদের হস্তগত হল। হাতের বেরি খুলে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াল। অন্ধকার বারান্দা দিয়ে সেল থেকে সেলে ঢুকে সব বন্দীকে মুক্ত করে দিল। শুধু নিজেদের দলের লোকই নয়। আরও যে সব পেশাদার যোদ্ধাকে সিজার আটকে রেখেছিল তাদেরও মুক্তি দেয়া হল।
