টারজান বলল, এখন যাবে কোথায়?
জায়েদ বলল, আমার দেশ সুদানের অন্তর্গত একটা জায়গায়।
টারজান বলল, তুমি সেখানে একা যেতে পারবে না। আমি তোমাকে একটা গায়ে নিয়ে যাব। সেখান থেকে আর একটা গায়ে। এইভাবে তোমাকে তোমার দেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করব।
টারজান যখন এইভাবে কথা বলছিল জায়েদের সঙ্গে তখন শেখের মঞ্জিলে চলছিল দারুণ গোলমাল। তোলোগ আর ফাদ চক্রান্ত করছিল দুজনে মিলে শেখের বিরুদ্ধে। ফাঁদের সঙ্গে স্টিম্বল চক্রান্ত করছিল। ক্রীতদাস ফেজুয়ান ভাবছিল মুক্তির কথা। আর আতিজা জায়েদের জন্য চোখের জল ফেলছিল নীরবে।
শেখ শুধু ভাবছিল নিমুরে যাবার কথা। কিন্তু কোথায় কিভাবে যাবে সেখানে তার কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না।
একদিন ফেজুয়ানকে ডেকে শেখ বলল, তুমি ছেলেবেলায় তোমার গায়ের লোকদের কাছ থেকে নিমুরের গল্প অনেক শুনেছ। তারা নিশ্চয় সেখানে যাবার পথ বলে দিতে পারবে। তোমাকে আপাতত মুক্তি দিচ্ছি। তুমি তোমার গায়ে চলে যাও। তারপর গাঁয়ের লোকদের কাছ থেকে সব জেনে আমাকে জানিয়ে যাবে তাহলে তোমাকে অনেক ধনরত্ন দেব।
ফেজুয়ান বলল, কখন যাব তাহলে?
শেখ ইবন জাদ বলল, কাল সকাল হলেই রওনা হবে তুমি।
পথ চলতে চলতে ফেজুয়ান যে তার গায়ের কাছে চলে এসেছে তা বুঝতে পারেনি সে। তার ছেলেবেলায় আরব বেদুইনরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাই তার গাঁয়ের পথটা নিজেই ভুলে গেছে সে।
গাঁয়ের কাছে আসতেই একদল নিগ্রো যোদ্ধার সামনে পড়ে গেল।
নিগ্রোরা ফেজুয়ানকে বলল, তুমি আরব হয়ে আমাদের দেশে কি করছ?
ফেজুয়ান বলল, আমি আরব নই, আমিও তোমাদের মত নিগ্রো। তবে আরবরা আমার ছেলেবেলায় আমাকে চুরি করে নিয়ে যায়। সেই থেকে তারা আমায় আটকে রাখে।
নিগ্রোযোদ্ধাদের মধ্যে একজন বলল, তোমার নাম কি?
ফেজুয়ান বলল, আমার আসল নাম উলালা। আরবরা ফেজুয়ান বলে ডাকত।
এবার সেই নিগ্রোটি আনন্দে লাফিয়ে উঠে ফেজুয়ানকে জড়িয়ে ধরল। বলল, উলালা আমার ভাই। আমার নাম তাহো। চল গায়ে নিয়ে যাই। আমরা ভাবতাম তোকে সিংহতে ধরে নিয়ে গেছে। তুই আর বেঁচে নেই।
গাঁয়ে যেতেই সবাই এসে ভিড় করে দাঁড়াল। বাবা মা তাদের হারানো ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে চোখের জল ফেলতে লাগল।
উলালা বললর, এক যাদুকর বলেছে প্রাচীন নগরী নিমুরে অনেক ধনরত্ন আছে, আর এক প্রমা সুন্দরী মেয়ে আছে। সেখানে যাবার পথ জানার জন্য আমাকে এক আরব সর্দার আমার গায়ে পাঠিয়েছে। সে পথ বলে দিলে তারা আমাদের মোটা রকমের পুরস্কার দেবে।
গাঁয়ের সর্দার বাতান্দো বলল, তাহলে আমরা সেখানে যাবার পথটা দেখিয়ে দিতে পারি।
উলালা সর্দারকে বলল, তুমি বলেছিলে আরবদের নিষিদ্ধ নগরী নিমুরের পথ দেখিয়ে দেবে।
বাতান্দো বলল, তাদের সঙ্গে আর তাহলে লড়াই করতে হবে না। উত্তর দিকে যে পাহাড় আছে সেই পাহাড়ী পথ দিয়ে নিমুরে প্রবেশ করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।
উলালা বলল, কি ধরনের লোক বাস করে নিমুরে তা জান?
বাতান্দো বলল, কেউ তা বলতে পারে না। যারা যায় তারা আর ফেরে না। কেউ বলে সেখানে প্রেতাত্মারা বাস করে। কেউ বলে সেখানে শুধু চিতাবাঘ আছে।
উলালা বলল, তাহলে আমি এখন কি করব?
বাতান্দো বলল, তুমি এখন আরব সর্দার শেখকে গিয়ে বল, আমরা তাদের নিমুরের উপত্যকায় নিয়ে গিয়ে সেখানে যাবার পথ দেখিয়ে দেব। তাদের সঙ্গে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। তবে তাদের হাতে যে সব নিগ্রো ক্রীতদাস আছে তাদের সবাইকে ছেড়ে দিতে হবে।
উলালা যথাসময়ে চলে গেল শেখের শিবিরে। গিয়ে সব কথা শেখকে বলল। শেখ প্রথমে তার নিগ্রো ক্রীতদাসদের ছেড়ে দিতে রাজী হলো না। কিন্তু উলালা যখন বলল তাদের ছেড়ে না দিলে অন্যান্য নিগ্রোযোদ্ধারা শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠবে তখন বাধ্য হয়ে রাজী হলো শেখ। তবে সে ভাবল আপাতত সে রাজী হলেও পরে সুযোগ পেলেই সে মত পরিবর্তন করবে।
উলালার কথামত শেখ ইবন জাদ তিনদিন অপেক্ষা করল।
এদিকে টারজান জায়েদকে একটা আদিবাসী গায়ে নিয়ে গিয়ে সর্দারকে বলল, একে তোমাদের গাঁয়ে রেখে দেব।
সর্দার রাজী হয়ে গেল। জায়েদ তখন নির্জনে টারজানকে ডেকে বলল, আমার একটা কথা আছে বন্ধু। আমি একবার আতিজাকে শুধু চোখের দেখা দেখতে চাই। আমার বিশ্বাস ইবন জাদ তার দলবল নিয়ে এই পথেই নিমুরে যাবে। আমার অনুরোধ, শেখের দল না আসা পর্যন্ত তুমি আমার এই গাঁয়েই থাকার ব্যবস্থা করে দাও।
টারজান বলল, ঠিক আছে, তাই হবে। তুমি আজ হতে ছমাস এই গাঁয়ে থাকবে। এর মধ্যে শেখ যদি আসে তাহলে আমি তোমাকে আমার গায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে তোমার দেশ সুদান যাবার ব্যবস্থা করে দেবে।
জায়েদ টারজানকে কথায় কথায় বলেছিল শেখের শিবিরে একজন বন্দী আছে। টারজান ভাবল সে শ্বেতাঙ্গ হবে হয় স্টিম্বল না হয় ব্লেক।
এদিকে নিমুরের রাজপ্রাসাদে মলাদ নামে একজন নাইটের সঙ্গে ব্লেকের শত্রুতা ক্রমশই বেড়ে চলতে লাগল। ব্লেক সব সময় হাসিখুশিতে মেতে থাকলেও তাকে একেবারেই সহ্য করতে পারল না মলাদ। রাজার কাছে ব্লেকের নামে প্রায়ই নিন্দা করত নানারকম। রিচার্ড অবশ্য ব্লেককে তলোয়ার খেলা, ঘোড়ায় চাপা প্রভৃতি নাইটদের নানারকম কার্যকলাপ ও আদবকায়দায় কুশলী করে তোলার চেষ্টা করে যেতে লাগল।
