প্রিক্লেরাস বলল, নিজেকে অকারণে দোষী করো না বন্ধু। ফাস্টাস বা সাবলেটাস অন্য যে কোন একটা ছুতো খুঁজে নিত। যবে থেকে ডিলেকটার উপর ফাস্টাসের নজর পড়েছে তবে থেকেই আমার কপাল পুড়েছে। ওরা আমাকে সরিয়ে দিতই। আমি শুধু ভাবছি, কে আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল।
আমি। অন্ধকারেই একজন বলে উঠল।
কে কথা বলল? প্রিক্লেরাস শুধাল।
টারজান বলল, মপিংগু। তোমার সঙ্গে দেখা করতে ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাসের বাড়ি যাবার পথে আমার সঙ্গে তাকেও বন্দী করা হয়েছে।
আমার সঙ্গে দেখা করতে! প্রিক্লেরাস সবিস্ময়ে বলল।
আমিই মিথ্যা করে ও কথা বলেছি, পিংগু বলল। ওরা আমাকে বলতে বাধ্য করেছে।
ওরা কারা?
সিজারের অফিসার ও ছেলে। আমাকে সম্রাটের প্রাসাদের মধ্যে টেনে নিয়ে চিৎ করে ফেলে সাঁড়াশি দিয়ে আমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল, গরম শিক দিয়ে চোখ দুটো পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। বল কর্তা, তারপরে আমি আর কি করতে পারতাম।
প্রিক্লেরাস বলল, সব বুঝতে পেরেছি। তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না মৃর্পিংগু।
কারাগারের ঠাণ্ডা ও শক্ত পাথরের মেঝেতে শুয়েও টারজান একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। সে ঘুম ভাঙল অনেক বেলায় কারাধ্যক্ষের ডাকে। সকলকেই খেতে দেয়া হল মোটা রুটি ও জল।
খেতে খেতে টারজান অন্য বন্দীদের ভাল করে দেখতে লাগল। কাস্ট্রাম মেয়ারের এক সিজারের পুত্র ক্যাসিয়াস হাস্টা, কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের এক সম্ভ্রান্ত নাগরিক সৈন্যাধ্যক্ষ ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস, আর সে নিজে, এই তিনজনই সাদা মানুষ। বাকি সকলেই কালো নিগ্রো।
দুদিন দু’রাত কেটে গেল। তৃতীয় দিনে আর একটি বন্দীকে সেখানে রেখে রক্ষী-সৈন্যরা চলে গেল।
ক্যাসিয়াস হাস্টা চাপা উত্তেজনায় ডেকে উঠল, সিসিলিয়াস মেটেলাস, তুমি!
হাস্টার কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে মুখ ফিরিয়ে অপর যুবক বলে উঠল, হাস্টা! টার্টারাসের গভীরতম গভীর থেকে উঠে এলেও ও কণ্ঠস্বর আমি চিনতে পারতাম।
কোন্ দুর্ভাগ্য তোমাকে এখানে এনে ফেলেছে? হাস্টা শুধাল।
যে ভাগ্য আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে আমাকে মিলিত করেছে সেটা দুর্ভাগ্য হতে পারে না।
কিন্তু এ ঘটনা ঘটল কেমন করে?
মেটেলাস বলতে লাগল, তুমি কাস্ট্রাম মেয়ার ছেড়ে আসার পরে সেখানে অনেক কিছুই ঘটেছে। সম্রাটের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়ে ফুলবাস ফুপাস তোমার সব বন্ধুদেরই সন্দেহ করেছে। তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। এমন কি ফুপাস যদি তার মেয়ে ফেবোনিয়ার প্রেমে না পড়ত তাহলে সেপ্টিমাস ফেবোনিয়াসকেও এতদিনে কারাগারে ঢুকতে হত। কিন্তু সবচাইতে বড় দুঃসংবাদ হল, ভালিডাস অগাস্টাস ফুস ফুপাসকে পোষ্যপুত্র নিয়েছে এবং তাকেই পরবর্তী ম্রাটরূপে ঘোষণা করেছে।
হাস্টা চেঁচিয়ে বলে উঠল, ফুপাস হবে সিজার! আর মিষ্টি মেয়ে ফেবোনিয়া? সে কি ফুপাসকে ভালবাসতে পারবে?
মেটেলাস বলল, সেখানেই তো গোলমালের মূল। সে ভালবাসে আর একজনকে।
কে সে? মালিয়াস লেপাস নিশ্চয় নয়?
সে কাস্ট্রাম মেয়ারের মানুষ নয়। জার্মানিয়া থেকে আগত এক বর্বর সর্দার। সে নিজের নাম বলেছে এরিক ভন হারবেন।
টারজান বলে উঠল, এরিক ভন হারবেন। তাকে তো আমি চিনি। সে কোথায়? নিরাপদে আছে তো?
মেটেলাস বলল, মালিয়াস লেপাসের সঙ্গে সেও কাস্ট্রাম মেয়ারের কারাগারে বন্দী। মলু-ক্ষেত্রের খেলায় যদি সে বেঁচেও যায়, তাহলে তাকে সরিয়ে দেবার অন্য পথের অভাব ফুপাসের হবে না।
মল্ল-ক্ষেত্রের খেলা কবে হবে? টারজান প্রশ্ন করল।
অগাস্টের মাঝামাঝি তারিখে, হাস্টা জবাব দিল।
আমি শুনেছি সে খেলা এক সপ্তাহ ধরে চলে। কাস্ট্রাম মেয়ার যেতে ক’দিন লাগে। টারজান শুধাল।
মেটেলাস জবাব দিল, সেনাদলের লাগে আট ঘণ্টা। কিন্তু সে প্রশ্ন কেন? তুমি কি কাস্ট্রাম মেয়ার যাবার কথা ভাবছ নাকি?
টারজান কঠিন গলায় বলল, হ্যাঁ।
মেটেস হেসে বলল, আমাদেরও নিশ্চয় সঙ্গে নেবে?
তোমাদের দু’জনকেই সঙ্গে নেব, টারজান বলল।
দু’জনই হেসে উঠল।
ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস বলল, কাস্ট্রাম মেয়ারে গিয়ে ক্যাসিয়াস হাস্টা যদি আমার বন্ধু থাকে তাহলে আমিও আছি তোমাদের দলে।
হাস্টা বলল, কথা দিলাম ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস।
হাতের শিকল বাজিয়ে মেটেলাস বলল, কবে আমরা যাত্রা করব?
টারজান বলল, যে মুহূর্তে আমার হাতের শিকল ভোলা হবে; মলু-ক্ষেত্রে নিয়ে যাবার আগে সে কাজটা নিশ্চয় করা হবে।
খেলার শেষ দিন এসে গেল। রক্তপিপাসু মানুষের দল কলোসিয়ামে সমবেত হয়েছে। সেলের বাসিন্দাদের শেষবারের মত নিয়ে যাওয়া হয়েছে মলু-ক্ষেত্রের বেড়ার ধারে। লড়াইতে তাদের ফল ভালই। হয়েছে, কারণ বারোটার মধ্যে মাত্র চারটে আংটা শূন্য হয়েছে।
দরজাটা সপাটে খুলে একজন ছোট অফিসার এসে বলল, তোমরা সকলেই এস। এবার শেষ খেলা।
তাদের প্রত্যেককে দেয়া হল একটা তরবারি, ছুরি, বল্লম, ঢাল ও শনের জাল। একে একে তাদের ঢোকানো হলো মলু-ক্ষেত্রের ভিতরে। সপ্তাহব্যাপী লড়াইয়ের পরেও বেঁচে আছে এমন শ’খানেক যোদ্ধা সেখানে হাজির ছিল।
তাদের দুই সমান দলে ভাগ করা হল। এক দলের কাঁধে বেঁধে দেয়া হল লাল ফিতে, অপর দলের কাঁধে সাদা ফিতে।
টারজান, হাস্টা, মেটেলাস, লুকেডি, মপিংগু ও ওগো সকলেই পড়ল লাল ফিতের দলে।
