প্রিক্লেরাস বলল, বেশ তো, তাই থাক। আমার বাড়িতে তুমি স্বাগত অতিথি।
টারজান তিন সপ্তাহ কাটাল ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসের বাড়িতে।
ওদিকে ঠিক সেই সময় ভন হারবেন সুখে দিন কাটাচ্ছে প্রাচ্যের সম্রাটের দরবারে একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে। কিন্তু যতই সুখে ও মর্যাদায় দিন কাটুক, আসলে সে যে একজন বন্দীমাত্র এই চেতনা তাকে সর্বদাই বিমর্ষ করে তোলে; সেখান থেকে পালাবার উপায়ের কথা ভাবে। তবু সে সব কিছুই সে ভুলে যায় এখনই সেপ্টিমাস ফেবোনিয়াসের কন্যার কথা তার মনে পড়ে।
এইভাবেই দিন কাটে। আর অনেক দূরের অন্য এক জগতে একটি ভয়ার্ত ছোট বানর এক সুদূর অরণ্যের প্রান্তে লাফিয়ে বেড়ায় মনের দুঃখে।
মনিব-কন্যা ও প্রিক্লেরাসের পরিবারের লোকজন ছাড়া একমাত্র সেই যে এত বড় একটা গোপন খবর জানে সেটাই মাঝে মাঝে পিংগুর মনকে সুড়সুড়ি দেয়, আর সেও এখানে-সেখানে মুখ খুলে বসে। ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাস পরিবারের সে বিশ্বস্ত ভৃত্য। তবু হাটে-বাজারে কখন যে সে কাকে কি বলেছে তাতেই ক্ষতি যা হবার তা হয়েছে। সেনানায়ক তাকে বন্দী করে প্রাসাদে নিয়ে গেল। সেখানে একজন অফিসারের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সব গোপন খবর সে ফাঁস করে দিল। ফলে সম্রাটের আদেশে পরপর বন্দী হল মপিংগুর মনিব, প্রিক্লেরাস ও টারজান।
যে সৈনিকরা টারজানকে কারা-কক্ষের মধ্যে ঠেলে দিল তাদের হাতে মশালের আলোয় সে দেখতে পেল, আরও একটি সাদা মানুষ ও জনাকয়েক নিগ্রোকে দেয়ালের গায়ে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। নিগ্রোদের মধ্যে একজন লুকেডি। টারজানকেও শিকলে আটকে দেয়া হল সাদা মানুষটির ঠিক পাশেই।
সৈনিকরা চলে গেল। কারা-কক্ষ অন্ধকারে ভরে গেল।
পাশের সাদা লোকটি বলল, তুমিই কি সেই সাদা বর্বর যার সুখ্যাতি কারাগারের মধ্যেও এসে পৌঁছেছে।
আমি অরণ্যরাজ টারজান।
সাবলেটাসকে তুমিই দুই হাতে মাথার উপর তুলে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসেছিলে! তাজ্জব ব্যাপার!
টারজান বলল, ওসব কথা থাক। তুমি কে, আর কোন্ অপরাধে সিজারের কারাগারে ঢুকেছ?
লোকটি বলল, কোন সিজারের কারাগারে আমি ঢুকি নি। যে জীবনটা এখন কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের সিংহাসনে বসেছে সে কোন সিজারই নয়।
তাহলে সিজার কে? টারজান প্রশ্ন করল।
একমাত্র প্রাচ্যের সম্রাটরাই সিজার নামের অধিকারী।
টারজান বলল, তাহলে ধরেই নিচ্ছি যে তুমি কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের লোক নও।
না। আমি কাস্ট্রা মেয়ারের মানুষ।
তাহলে তুমি এখানে বন্দী হলে কেমন করে?
লোকটি বলল, সে অনেক কথা। আমার খুড়ো প্রাচ্যের সম্রাট ভালিডাস অগাস্টাস বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে সাবুলেটাসের হাতে তুলে দিয়েছে। আমার নাম ক্যাসিয়াস হাস্টা; ভলিডাসের আগে আমার বাবাই ছিল সম্রাট। ভালিডাসের ভয়, আমি হয়তো সিংহাসনের দিকে হাত বাড়াতে পারি। তাই একটা সামরিক মিশনে পাঠাবার নাম করে সে আমাকে সাবুলেটাসের হাতে তুলে দিয়েছে।
তোমাকে নিয়ে সাবলেটাস কি করবে? টারজান জানতে চাইল।
ঠিক তোমাকে নিয়ে যা করবে, ক্যাসিয়াস হাস্টা জবাব দিল। সাবলেটাসের বিজয় উপলক্ষ্যে প্রতি বছর যে উৎসব হয় সেখানে আমাদের হাজির করা হবে, আর মলু-ক্ষেত্রে তাদের আমাদের খোরাক জোগাতে আমরা খুনোখুনি করে মরব।
সেটা কখন হবে? টারজান জানতে চাইল।
আর বেশি দেরী নেই। দেখছ না এখানে কত সাদা ও কালো মানুষকে আটক করে রেখেছে।
অন্ধকারে লুকেডিকে দেখা যাচ্ছে না, তবু তার দিকে ফিরে টারজান ডাকল, লুকেডি।
বল, লুকেডির গলা শোনা গেল।
তুমি ভাল আছ তো?
আমি তো মরতে বসেছি। ওরা আমাকে সিংহ দিয়ে খাওয়াবে, না হয় ক্রুসে পুড়িয়ে মারবে, অথবা যোদ্ধাদের সঙ্গে আমাকে লড়িয়ে দেবে। লুকেডির কাছে সবই সমান।
এই সব লোকই তোমাদের গাঁয়ের?
কে একজন বলে উঠল, গতকাল ওরা বলেছিল আমরা ওদের আপনজন, আর কালই সিজারের মজার জন্য ওরা আমাদের দিয়ে খুনোখুনি করাবে।
টারজান বলল, তোমরা নিশ্চয় সংখ্যায় খুব কম, তাই এই ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছ।
মোটেই না; সংখ্যায় আমরা শহরের লোকের দ্বিগুণ। আমরা সকলেই সাহসী যোদ্ধা।
তাহলে তোমরা বোকা।
আমরা চিরদিন বোকা থাকব না। অনেক লোকই সাবলেটাস ও কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের সাদা মানুষদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
শহরের এবং বাইরের নিগ্রোরা সিজারকে ঘৃণা করে। কথাগুলো বলল মপিংগু। তাকেও টারজনের সঙ্গে বন্দী করে আনা হয়েছে।
লোকগুলোর কথাবার্তা টারজনের মনে নতুন চিন্তার খোরাক জোগাল। সে জানে, হাজার হাজার আফ্রিকান ক্রীতদাস শহরে আছে; আরও হাজার হাজার আছে বাইরের গ্রামে গ্রামে। তাদের ভিতর থেকে যদি কোন নেতা মাথা তুলে দাঁড়ায় তাহলে অচিরেই সিজারের অত্যাচারের অবসান ঘটানো যায়।
এই সময় আর একদল সৈন্য এসে কারাগারের বাইরে থামল। ফটক খুলে তাদের মশালের আলোয় টারজান দেখল, আরও একটি বৃন্দীকে তারা সঙ্গে করে এনেছে। লোকটিকে টানতে টানতে ভিতরে নিয়ে আসতেই টারজান তাকে চিনতে পারল। ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস তাকে চিনতে পেরেও কথা বলল না দেখে টারজানও চুপ করে গেল। প্রিক্লেরাসকে শিকল দিয়ে দেয়ালের সঙ্গে বেঁধে রেখে সৈন্যরা বেরিয়ে গেলে টারজান বলল, আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের ফলেই তোমার আজ এই দশা হয়েছে।
