এগিকে গাছের ডালে-ডালে কিছুদূর গিয়ে টারজান একটা নিচু ছাদের উপর নেমে এক লাফে আর একটা গাছে চড়ে বসল। কোন লোকজন সেদিকে আসছে কি না দেখার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে টারজান মাটি থেকে মাত্র বিশ ফুট উপরে নেমে এল। এত নিঃশব্দে সে নেমে এল যে প্রাঙ্গণে দাঁড়ানো দুটি মানুষ কিছুই টের পেল না।
টারজান কিন্তু তাদের ভালোভাবেই চিনতে পারল। দুটি যুবক-যুবতী। যুবকটির কণ্ঠে ক্রোধের আভাষ। যুবতীটি সহসা চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। যুবকটিও এক লাফে এসে তার হাত চেপে ধরল। যুবতীটি চীৎকার করে উঠল। যুবকটি এক হাতে তার মুখ চাপা দিয়ে আর এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল। আর তখনই মাটিতে ধপাস্ করে একটা শব্দ হওয়ায় মুখ ফিরিয়ে একটি অর্ধনগ্ন দৈত্যকে দেখে বিস্ময়ে হাঁ করে রইল। দুটি ইস্পাত-ধূসর চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ তার ভয়ার্ত কালো চোখের উপর, দুটি ভারী হাত চেপে ধরল তার টিউনিক; তাকে আছড়ে ফেলে দিল একপাশে।
যুবতী বলল, ডিলেক্টা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। এ জন্য আমার বাবা তোমাকে পুরস্কৃত করবে।
বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই একটি যুবক অফিসার এসে হাজির হল। টারজান তাকে চিনতে পারল। এ সেই ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস যে তাকে কলোসিয়াম থেকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসেছিল।
সব কথা শুনে প্রিক্লেরাস রেগে আগুন। বলল, থাম। ভাল চাও তো এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও।
ফাস্টাসের মুখ লাল হয়ে উঠল। বলল, আমার বাবা সম্রাট সব কিছুই শুনতে পাবে। ডিলেক্টা, তুমিও ভুলে যেয়ো না যে সাবলেটাস ইম্পারেটর তোমার বাবার প্রতিও খুব প্রসন্ন নয়।
ডিলেক্টা চীৎকার করে বলল, আমার ক্রীতদাসকে হুকুম করার আগেই তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও।
দুই কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফাস্টাস বাগান থেকে বেরিয়ে গেল।
অন্যদের সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রিক্লেরাস পিংগুকে বলল, নবাগত লোকটিকে বল যে, আমি তাকে বন্দী করতে এলেও সে যদি আমার নির্দেশ মত কাজ করে তাহলে ডিলেক্টার অনুরোধে আমি তাকে সাহায্য করতেই চাই।
টারজান বলল, কি নির্দেশ? আমাকে কি করতে হবে?
প্রিক্লেরাস বলল, তুমি যে আমার বন্দী এইভাবে আমার সঙ্গে চল। আমি তোমাকে কলোসিয়ামের দিকেই নিয়ে যাব। আমার বাড়ির বিপরীত দিকে পৌঁছেই আমি এমন একটা ইঙ্গিত করব যাতে তুমি বুঝতে পারবে যে সেটা আমার বাড়ি। তার পরেই আমি এমন সুযোগ করে দেব যাতে তুমি গাছের উপর। দিয়ে পালিয়ে আমার বাড়িতে ঢুকে যেতে পার। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি সেখানেই অপেক্ষা করবে। ডিলেক্টা এখনই পিংগুকে আমার বাড়ি পাঠাবে তোমার সেখানে যাবার সংবাদটা জানাতে, যাতে প্রাণ দিয়েও তারা তোমাকে রক্ষা করে। বুঝতে পারলে?
বুঝেছি, টারজান বলল।
প্রিক্লেরাস বলল, পরে তোমাকে কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের বাইরে পাহাড়ের ওপারে পাঠাবার একটা ব্যবস্থা আমরা করতে পারব বলেই আশা করি।
টারজানকে সঙ্গে নিয়ে সৈন্যসামন্তসহ ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস এগিয়ে চলল কলোসিয়ামের দিকে। কিছুদূর গিয়ে প্রিক্লেরাস পথের পাশে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবল, আর তার পরেই এসে সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিল। টারজান বুঝতে পারল, তরুণ অফিসারটি তার বাড়ির নিশানা তাকে বুঝিয়ে দিল।
গাছের ডালে ঝুলতে ঝুলতে টারজান প্রিক্লেরাসের বাড়িতে গিয়ে নামল। পিংগু সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করেই ছিল। আর তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল মধ্যবয়সী একটি সম্ভ্রান্ত মহিলা।
মহিলা মপিংগুকে শুধাল, এই কি সেই লোক?
মপিংগু বলল, হ্যাঁ, সেই।
মহিলা বলল, ওকে বল যে আমি ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসের মা কেস্টিভিটাস; আমার ছেলের পক্ষ হয়ে তাকে এখানে অভ্যর্থনা করছি।
বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরেই ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস টারজনের ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সকালবেলাকার সেই দোভাষী লোকটি।
লোকটি টারজানকে বলল, তোমার দোভাষী ও চাকর হিসেবে আমি এখানেই থাকব।
প্রিক্লেরাস জানাল, একমাত্র এই বাড়িটা ছাড়া সর্বত্র সম্রাটের লোকরা তন্ন তন্ন করে তোমার খোঁজ করেছে। কোথাও না পেয়ে সাবলেটাসের ধারণা হয়েছে যে তুমি পালিয়েছ। আমরা তোমাকে দিন কয়েক এখানে লুকিয়ে রাখব; তারপর রাতের অন্ধকারে শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেব।
টারজান হেসে বলল, দিনে বা রাতে যে কোন সময়েই আমি ইচ্ছা করলেই এখান থেকে চলে যেতে পারি। কিন্তু যার খোঁজে আমি এসেছি সে যে এখানে নেই সেটা নিশ্চিত জানতে পারলে তবেই আমি যাব। কিন্তু সর্বপ্রথম তোমার এই করুণার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, যদিও এই করুণার কারণ আমি জানি না।
প্রিক্লেরাস বলল, কারণটা খুবই সরল। আজ সকালে যে যুবতীটিকে তুমি রক্ষা করেছ সে ডিয়ন। সৃপ্লেন্ডিডারের মেয়ে ডিলেক্টা তার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আশা করি, আমার কৃতজ্ঞতার কারণটা এবার বুঝতে পেরেছ।
তা পেরেছি, টারজান বলল, ভাগ্যিস আমি ঠিক সময়ে সেখানে হাজির হয়েছিলাম।
এবার প্রিক্লেরাস বলল, এখানে তোমার জীবন যে কোন সময় বিপন্ন হতে পারে। তবু তুমি এখানে থাকতে চাইছ কেন?
টারজান বলতে লাগল, আমার এক বন্ধুর ছেলেকে খুঁজতে আমি এখানে এসেছি। অনেক সপ্তাহ আগে সেই যুবকটি আবিষ্কারের নেশায় এই ওয়াইরামওয়াজি পর্বতে এসে ঢুকেছে। বাইরে থেকেই তার লোকজন তাকে ফেলে পালিয়েছে। কিন্তু আমার দৃঢ় ধারণা যে কোন ভাবেই হোক সে এখানেই এসেছে। তাই যদি হয় তাহলে আজ হোক কাল হোক সে আমাদের এই শহরে আসবেই, আর নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি যে এখানে এলে তোমাদের সম্রাট তার সঙ্গে বন্ধুর মত ব্যবহার করবে না। তাই আমি এখান থেকে যেতে চাই তাকে সাহায্য করব বলে।
