মেয়েটি উদ্ধত কণ্ঠে জবাব দিল, এ হচ্ছে এরিক ভন হারবেন; আমার বাবা সেপ্টিমাস। ফেবোনিয়াসের অতিথি। আর এ হচ্ছে ফুলবাস ফুপাস; বাবার প্রশ্রয় পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে।
ফুপাস ক্রুদ্ধ চোখ তুলে তাকাল। ঠিক সেই সময় মালিয়াস লেপাস এসে পড়ায় ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াল না। তবে ভন হারবেন বুঝতে পারল যে এই যুবকটি ফেবোনিয়াকে ভালবাসে।
আরও একটু পরে সেপ্টিমাস ফেবোনিয়াস এসে তাদের দলে যোগ দিল। বলল, এবার সবাই মিলে স্নানে যাওয়া যাক।
লেপাস ভন হারবেনকে চুপি-চুপি বলল, খুড়ো এবার সাবইকে নিয়ে সিজারের স্নানাগারে যাবে।
একটু বেলা হলে সৈন্যরা এসে কারা-কক্ষের দরজা খুলে দিল। জনৈক ক্রীতদাসসহ একটি শ্বেতকায় যুবক অফিসার ও কয়েকজন সৈনিক ঘরে ঢুকল। অফিসারটি শহরের ভাষায় টারজানকে কিছু বললে সে মাথা নেড়ি বুঝিয়ে দিল যে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তখন ক্রীতদাসটি বাগেগোদের ভাষায় কথা বললে টারজান তা বুঝতে পারল। তখন সেই ক্রীতদাসের মারফৎ অফিসার টারজনের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
অফিসার বলল, তুমি কে, আর একজন সাদা মানুষ হয়ে বাগেগোদের গ্রামে কি করছিলে?
বন্দী জবাবে জানাল, আমি অরণ্যরাজ টারজান। এই পাহাড়ে এসে হারিয়ে গেছে এমন আর একটি সাদা মানুষের খোঁজই আমি এসেছি পা ফসকে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে বাগেগোরা আমাকে বন্দী করে। তোমার সৈন্যরা বাগোগোদের গ্রামে হানা দিয়ে আমাকে ধরে এনেছে। সব কথা তো বললাম; আশা করি এবার তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে।
অফিসার বলল, তোমার কথার জবাব দিতে আমি আসি নি; এসেছি তার কাছে তোমাকে নিয়ে যেতে যে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
অফিসারের নির্দেশে সৈনিকরা টারজানকে নিয়ে কারা-কক্ষের বাইরে চলে গেল।
শহরের রাজপথ ধরে মাইলখানেক যাবার পরে সকলে একটা খুব বড় বাড়িতে ঢুকল। চওড়া বারান্দা ঘুরে তারা ঢুকল একটা প্রশস্ত কক্ষে। সেই কক্ষের এক প্রান্তে উঁচু বেদীর উপর কারুকার্যখচিত প্রকাণ্ড আসনে বসে আছে একটি দশাসই মানুষ।
ঘরে আরও অনেক লোকের সমাবেশ; সকলেরই পরনে কম-বেশি ঝকঝকে পোশাক-পত্তর। ক্রীতদাস, হরকরা ও অফিসাররা অনবরত আসা-যাওয়া করছে। টারজানকে নিয়ে সকলে একটা স্তম্ভের পাশে অপেক্ষা করতে লাগল।
বাগেগো দোভাষীকে টারজান জিজ্ঞাসা করল, এটা কোন্ জায়গা? আর দূরের ঐ লোকটিই বা কে?
এটা হচ্ছে পাশ্চাত্য দেশের সম্রাটের দরবার-কক্ষ। আর ওই হচ্ছে সাবলেটাস ইম্পারেটার স্বয়ং।
সম্রাট সাবলেটাসের চেহারা দেখবার মত। সাদা সুতোর টিউনিকের উপর সোনার বর্ম আঁটা; সাদা স্যান্ডেলে সোনার বলস; আর কাঁধের উপর থেকে নেমে এসেছে সিজারদের লাল পৃষ্ঠ-বসন। ভুরুর উপর দিয়ে জড়ানো কারুকাপ্যখচিত সাদা ফিতেটা বহন করছে তার মর্যাদার অপর চিহ্ন।
সকলে সিংহাসনের অদূরে থামতেই টারজান বাগেগো দোভাষীকে বলল, সাবলেটাসকে জিজ্ঞাসা কর, কেন আমাকে বন্দী করা হয়েছে; তাকে বল, আমি চাই অবিলম্বে আমাকে মুক্তি দেয়া হোক।
সাবলেটাস সক্রোধে বলে উঠল, সাবলেটাস ইম্পারেটরকে হুকুম করতে সাহস করে সে কে?
দোভাষীর কথা শুনে টারজান বলল, ওকে বলে দাও যে আমি অরণ্যরাজ টারজান; আর ওর মতই আমিও হুকুম করতে এবং হুকুম তামিল হতে দেখতেই অভ্যস্ত।
সে কথা শুনে সাবলেটাস গর্জন করে উঠল, এই উদ্ধত কুত্তাটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।
সঙ্গে সঙ্গে দুটি সৈনিক টারজানকে চেপে ধরল। একজন ধরল ডান হাত, অপরজন বা হাত। কিন্তু হঠাৎ টারজান এত জোরে দু’জনের মাথা ঠুকে দিল যে, তারা অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, আর সে নিজে বিড়ালের মত অনায়াস ভঙ্গীতে এক লাফে সম্রাট সাবলেটাসের বেদীর সামনে পৌঁছে গেল।
শক্ত থাবায় সম্রাটের কাঁধ দুটো চেপে ধরে টারজান তাকে সিংহাসন থেকে তুলে নিয়ে বারকয়েক সজোরে ঘুরিয়ে ছেড়ে দিল। কয়েকজন বর্শাধারী সাব্লেটাসকে উদ্ধার করতে ছুটে আসা মাত্রই সম্রাটের গলার চামড়া ও বর্মের নিচটা ধরে টারজান তাকে এমনভাবে তুলে ধরল আত্মরক্ষার ঢালের মত করে যে, পাছে সম্রাটের গায়ে আঘাত লাগে সেই ভয়ে বর্শাধারীরা টারজানকে আক্রমণ করতেই সাহস পেল না।
বাগেগো দোভাষীকে উদ্দেশ্য করে টারজান তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, ওদের বলে দাও আমি রাস্তায় নেমে যাবার আগে কেউ যদি আমাকে বাধা দেয় তাহলে সম্রাটের গলাটা আমি ছিঁড়ে ফেলব।
কথাগুলো শুনে সাবলেটাস তার লোকজনদের হুকুম দিল তারা যেন টারজানকে আক্রমণ না করে বরং তাকে নির্বিবাদে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে দেয়। ক্রোধে, ত্রাসে ও ক্ষোভে সালেটাসের গলা তখন থর থর করে কাঁপছে।
অর্ধনগ্ন বর্বর লোকটি তাদের সম্রাটকে দুই হাতে তুলে ধরে ফটক পেরিয়ে গাছের সারি দিয়ে ঘেরা রাজপথে নেমে গেল। দোভাষী চলল তার আগে আগে।
প্রশস্ত রাজপথের মাঝখানে থেমে টারজান সাকূলেটাসকে মাটিতে নামিয়ে দিল।
সাবলেটাস অতি দ্রুত ফটকের দিকে এগিয়ে চলল, আর রক্ষীরা আবার এসে রাজপথে ভিড় করল। কিন্তু তাদের চোখের সামনেই টারজান কয়েক পা দৌড়ে গিয়ে এক লাফে বুড়ো ওক গাছের ডালে চড়ে টারজান ডাল-পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সাবলেটাস ছুটতে ছুটতে বলতে লাগল, শিগগির! ওর পিছু নাও! ওই অসভ্য লোকটাকে যে নামিয়ে আনতে পারবে তাকে এক হাজার দিনার পুরস্কার দেব।
