প্রতিটি সৈনিকের হাতে একটা করে ছোট শিকল ও তার একদিকে একটা করে ধাতুর কলার ও তালা। সেগুলোর সাহায্যে তারা বন্দীদের গলায় গলায় শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলল। কিন্তু টারজানকে দলবন্দী করে এক শিকলে বাঁধা হল না; তার গলায় একটা লোহার কলার পরিয়ে শিকলের অপর প্রান্তটা। তুলে দেয়া হল একজন সৈনিকের হাতে।
পর্বতের সানুদেশ ধরে তারা উত্তর দিকে এগিয়ে চলল।
ঘটনাক্রমে টারজনের জায়গা হয়েছে বন্দী-সারির পিছনে আর লুকেডি রয়েছে সেই সারির একেবারে শেষে। হাঁটতে হাঁটতে টারজান শুধাল, এরা সব কারা লুকেডি?
টারজনের দিকে তাকিয়ে জনৈক বন্দী বলল, ওরা এসেছে ওদেরই একজনের হত্যাকে প্রতিরোধ করতে। ভালই হয়েছে যে এই লোকটিকে মেরে ফেলার আগেই ওরা এসে পড়েছে। নইলে সব্বাইকে মেরে ফেলত।
দু’ঘণ্টা চলবার পরে পথটা হঠাৎ ডানদিকে মোড় নিয়ে একটা সংকীর্ণ পাহাড়ি সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল। চলতে চলতেই টারজান বুঝতে পারল যে তারা ক্রমেই পাহাড়ের ভিতরে ঢুকলেও উপরে ওঠার বদলে সুড়ঙ্গটা বরং নিচের দিকেই নেমে যাচ্ছে।
ধুলো ভর্তি পথ ধরে সকলে এগিয়ে চলল দক্ষিণ দিকে। অনেকগুলো গ্রাম পার হয়ে গম্বুজ ও বুরুজওয়ালা একটা অট্টালিকা-নগরী। রাজপথ ধরে চলতে চলতে দেখল রাস্তায় ও বাড়ির ফটকে অনেক বাদামী ও কালো মানুষের ভিড়। অনেকেরই পরনে কুর্তা ও আলখাল্লা, যদিও নিগ্রোরা প্রায় উলফঙ্গ।
অধিকতর প্রশস্ত আর একটা রাজপথ ধরে কিছুটা এগোতেই একটা বৃত্তাকার বিরাট গ্র্যানিট পাথরের বাড়ি দেখা গেল। বড় বড় থামের উপরে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট উঁচু পর্যন্ত ধাপে ধাপে উঠে গেছে একটা বিরাট বাড়ি। একতলায় পর পর অনেকগুলো ঘর; কিন্তু পরের সবগুলো তলাই ফাঁকা। তার ভিতর দিয়েই টারজান দেখতে পেল, বৃত্তাকার বাড়িটার উপরে কোন ছাদ নেই; বুঝতে পারল একটা মলুক্ষেত্র রোমের কালো-সিয়ামের মত।
সকলে ঘোরানো বাড়িটার পিছন দিকে পৌঁছে গেল। বাড়ির ভিতরে অসংখ্য গলি, বারান্দা ও ছোট। ছোট ঘর; যেমন সংকীর্ণ, তেমনই অন্ধকার। সবগুলো ঘরের লোহার দরজা খোলা। চার-পাঁচজনের এক একটা দেলের গলা থেকে শিকল খুলে নিয়ে তাদের এক একটা অন্ধকার নরকের মধ্যে ঠেলে দেয়া হল।
টারজান দেখল, লুকেডি ও অন্য দু’জন বাগেগোর সঙ্গে তাকে যে ঘরে ঠেলে দেয়া হয়েছে সেটা আগোগোড়া গ্যানিট পাথরে গড়া। ঘরের একটি মাত্র দরজায় লোহার গরাদে বসানো। দরজার উল্টো দিকের দয়ালের মাথায় একটিমাত্র গরাদ দেয়া জানালা দিয়ে সামান্যমাত্র আলো ও হাওয়া ঘরে ঢুকছে। তাদের মুখের উপরেই দরজা বন্ধ করে ভারী তালা লাগিয়ে দেয়া হল। সেই নির্জন ঘরে সকলে অপেক্ষা করতে লাগল অনাগত নিয়তির জন্য।
একটা ফটকের সামনে পাল্কি থামল। লেপাস ও এরিক পাল্কি থেকে নামল। বাগানে ঢুকল। একটা গাছের ছায়ায় বসে একজন মজবুত দেহ বয়স্ক লোক নিচু ডেস্কে কি যেন লিখছে। তার প্রাচীনকালের রোমক দোয়াত, খাগের কলম, পার্চমেন্ট কাগজ দেখে ভন হাবেনের দেহে শিহরণ খেলে গেল।
কেমন আছ খুড়ো! লেপাস চেঁচিয়ে বলল। বয়স্ক লোকটি তার দিকে মুখ ফেরাল। লেপাস্ আবার বলল, আজ তোমার জন্য একজন অতিথি এনেছি। এই হচ্ছে অনেক দূরের দেশ জার্মানিয়া হতে আগত বর্বর সর্দার এরিক ভন হারবেন। তারপর ভন হাবেনের দিকে ঘুরে বলল, আর এই আমার মাননীয় খুড়ো মশায় সেপ্টিমাস ফেবোনিয়াস।
সেপ্টিমাস সাদরে ভন হারবেনকে গ্রহণ করল। কুশল-প্রশ্নাদি বিনিময়ের পরে লেপাসকে সঙ্গে দিয়ে তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিল।
এক ঘণ্টা পরে পোশাকাদি বদলে ভন হারবেন আবার যখন একাকি বাগানে ফিরে গেল সেপ্টিমাস তখন সেখান থেকে চলে গেছে।
ভন হারবেন একাই বাগানের ভিতরে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে একটা ঝোপের বাঁক ঘুরতেই একটি সুন্দরী তরুণীর একেবারে মুখোমুখি হল। তরুণীটি অস্ফুট গলায় বলল, তুমি কে?
ভন হারবেন জবাব দিল, আমি এখানে নবাগত। মালিয়াস লেপাস আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি তার খুড়ো সেপ্টিমাস ফেবোনিয়াসের অতিথি।
মেয়েটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, তা হতে পারে। অতিথি সঙ্কারের ব্যাপারে বাবার কুখ্যাতি আছে।
ভন হারবেন প্রশ্ন করল, তুমি কি ফেবোনিয়াসের মেয়ে।
মেয়েটি বলল, হ্যাঁ, আমি ফেবোনিয়া। কিন্তু তোমার পরিচয় এখনও দাও নি।
আমি এরিক ভন হারবেন; জার্মানিয়া থেকে এসেছি।’
মেয়েটি সোৎসাহে বলে উঠল, জার্মানিয়া! সিজার জার্মানিয়ার কথা লিখে গেছে বটে। সাঙ্গুইনরিয়াসও লিখেছে। সে দেশ তো অনেক দূরে।
ভন হারবেন বলল, সেদিনের পরে এত বেশি শতাব্দীকাল পার হয়ে গেছে যে তার তুলনায় তিন হাজার মাইলের দূরত্বটাকে খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না।
একটু চুপ করে থেকে ভন হারবেন ডাকল, ফেবোনিয়া!
সপ্রশ্ন দৃষ্টি তুলে মেয়েটি বলল, বল।
তোমার নামটা বড় সুন্দর। এ রকম নাম আগে কখনো শুনি নি।
নামটা তোমার পছন্দ?
খুব।
হঠাৎ মেয়েটি চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ভন হারবেনও পিছন দিকে ঘুরে গেল। একটি তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে তারা কেউই সজাগ ছিল না।
ভন হারবেন দেখল, একটি বেঁটে কৃষ্ণকায় যুবক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ঝলমলে পোশাক। কোমর থেকে ঝুলছে একটা বেঁটে তরবারি।
যুবকটি বলল, তোমার এই বর্বর বন্ধুটি কে ফেবোনিয়া?
