সামনেই একটা ছোট নদী সবুজ উপত্যকার বুক চিরে এঁকে বেঁকে এগিয়ে পড়েছে একটা বড় জলাভূমিতে, যতদূর মনে হয়। জলাভূমিটা মাইল দশেক বিস্তৃত।
জলজ ঘাস ও শেওলার নিচের কর্দমাক্ত মাটির উপর দিয়ে দু’জন সেই জল ভেঙ্গে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে এক সময় পায়ের নিচে শক্ত মাটি পেয়ে ভন হারবেন বলে উঠল, আর ভয় নেই গাবুলা; মনে হচ্ছে এই পথ ধরেই আমরা হ্রদটাতে পৌঁছতে পারব।
এমন সময় পিছন থেকে একটা ছোট নৌকা দ্রুতবেগে ছুটে এসে সেখানে থেমে গেল। এক নৌকা ভর্তি সশস্ত্র সৈনিক তাদের দুজনকে ঘিরে ফেলল।
এরিক ভন হারবেন দীর্ঘকায়, উলফঙ্গপ্রায় সৈনিকদের মুখের দিকে তাকাল। প্রথমেই তার মনোযোগ পড়ল তাদের অস্ত্রশস্ত্রের দিকে।
আধুনিককালের অসভ্য মানুষদের হাতে যে রকম দেখা যায় তাদের বর্শাগুলো তার চাইতে অন্য রকম। আফ্রিকার অসভ্য লোকদের মত বর্শা তো আছেই, তাছাড়া আর একরকম ভারী বল্লম আছে যা দেখে যুবক পুরাতত্ত্ববিদটির মনে স্বভাবতই প্রাচীন রোমকদের হাতের তীক্ষ্ণমুখ শলাকার কথাই মনে পড়ল। সেই মিলটি আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলল তাদের কাঁধের উপর থেকে ঝোলানো কোষবদ্ধ এক ধরনের ছোট, চওড়া দু-মুখো তরবারি। এগুলো যদি রোমের রাজকীয় বাহিনীর গ্লোডিয়াস হিসৃপেনাস না হয় তো ভন হারবেন এতকাল বৃথাই পড়াশুনা করেছে, গবেষণা করেছে।
বলল, গাবুলা, ওদের জিজ্ঞাসা করতো ওরা কি চায়।
বান্টু ভাষায় গাবুলা শুধাল, তোমরা কারা, আর এখানে কি চাও?
ভন হারবেনও-বলল, আমরা বন্ধু হতে চাই। আমরা এসেছি তোমাদের দেশ দেখতে। তোমাদের সর্দারের কাছে আমাদের নিয়ে চল।
একটি ঢ্যাঙা নিগ্রো মাথা নেড়ে বলল, আমরা তোমাদের কথা বুঝতে পারছি না। তোমরা আমাদের বন্দী। তাই তোমাদের নিয়ে যাব আমাদের মনিবের কাছে। নৌকায় উঠে এস। বাধা দিলে বা গোলমাল করলে মেরে ফেলব।
ভন হারবেন ও গাবুলা ডোঙ্গায় পা দিল। একটা চওড়া খালের বুকে দুই পাশে দশ-পনেরো ফুট লম্বা প্যাপিরাস গাছের ভিতর দিয়ে ডোঙ্গা ভেসে চলল।
সর্দার জিজ্ঞাসা করল, তুমি কোথা থেকে এসেছ?
ভন হারবেন জবাব দিল, জার্মানিয়া থেকে।
সর্দার বলে উঠল, আরে! তারা তো বন্য ও অসভ্য বর্বর। তারা তো রোমের ভাষাই বলে না; তোমার মত খারাপ করেও বলে না।
কতদিন আগে জার্মান বর্বরদের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ ঘটেছিল?
আমি তো কখনও সে দেশে যাইনি; তবে আমাদের ইতিহাসকাররা তাদের ভাল করেই চেনে।
তারা কতদিন আগে তাদের কথা লিখেছে?
রোমক সনের ৮৩৯তম বর্ষে।
সে তো আঠারোশ’ সাইত্রিশ বছর আগেকার কথা। তারপরে সেখানে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।– সর্দার বলল, তা কেমন করে হবে? এ দেশের তো কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
ওয়াইরাম ওয়াজি পর্বতের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত গ্রামের বাগেগো লুকেডি লাউয়ের খোলায় দুধ নিয়ে ঘরে ঢুকল। একটি দৈত্যের মত সাদা মানুষ মেঝেতে বসে আছে। দুই হাত পিছু-মোড়া করে বাঁধা; পায়েও বেড়ি। লুকেডির হাত থেকে দুধটা খেতে খেতেই বাইরে একটা সোরগোল উঠল। নানা রকম হুকুমের শব্দ। ছেলেমেয়েদের চেঁচামেচি। বেজে উঠল–রণ-ডঙ্কা। শুরু হল অন্ত্রের ঝনঝনা। উচ্চ চীৎকার। লুকেডি দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েই সত্রাসে চীৎকার করে পিছিয়ে এসে কুঁকড়ে বসে পড়ল।
টারজান সবিস্ময়ে লুকেডির মুখের দিকে তাকিয়ে পরে নিচু দরজা দিয়ে বাইরে তাকাল।
গ্রামের পথে উদ্যত বর্শা হাতে পুরুষ, আতংকিত নারী ও শিশুদের ভিড়।
প্রথমে টারজান ভাবল, অন্য কোন অসভ্য জাতি বুঝি গ্রামে আক্রমণ করেছে। কিন্তু একটু পরেই হৈ-চৈ থেমে গেল। বাগেগোরা ইতস্তত পালাতে লাগল। তাদের পিছনে ধাওয়া করছে কিছু সৈনিক। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তার পরেই এস্ত পায়ের শব্দ, কিছু হুকুম, আর মাঝেসাঝে ভয়ার্ত আর্তনাদ।
তিনটি মূর্তি সবেগে কুটিরে ঢুকে পড়ল-শত্রু সেনারা কিছু পলাতককে খুঁজছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লুকেডি ঘরের এক কোণে লুকিয়ে পড়ল। টারজান বসে রইল। তাকে দেখতে পেয়ে দলপতি সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করল। একজন টারজানকে কিছু বলল। টারজান কিছুই বুঝতে পারল না, যদিও ভাষাটা যেন তার কাছে চেনা-চেনা মনে হল।
তাদের একজন লুকেডিকে দেখতে পেয়ে তাকে টানতে টানতে ঘরের মাঝখানে নিয়ে এল। তারপর আঙুল বাড়িয়ে দরজাটা দেখিয়ে টারজানকে আবার কিছু বলল। টারজান তার গলার শিকলটা দেখাল।
একটি সৈনিক কুটির থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই দুটো পাথর হাতে নিয়ে ফিরে এসে সে টারজানকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে পাথরটাকে সজোরে তালার উপর ঠুকতে লাগল। তালাটা ভেঙে গেল।
মুক্তি পাওয়ামাত্রই টারজান ও লুকেডিকে কুটিরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল। গ্রামের মাঝখানে প্রায় পঞ্চাশটি পুরুষ, নারী ও শিশু। বাগেগো বন্দীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শ’খানেক হালকা বাদামী রঙের। সৈনিক। টারজান এবার এই সব নবাগতদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল।
তাদের আলখাল্লা, বর্ম, শিরস্ত্রাণ পাদুকা-এসব কিছুই টারজান আগে কখনও দেখে নি; অথচ সবই তার কাছে কেমন যেন পরিচিত বলে মনে হচ্ছে। একটা বিচিত্র অনুভূতি জাগল তার মনে; সে যেন এই লোকগুলোকে আগেও দেখেছে, তাদের কথাবার্তা শুনেছে, এমন কি তাদের ভাষাও যেন বুঝতে পারছে। অথচ সে এও জানে যে, আগে কখনও সে তাদের দেখেনি। এমন সময় গ্রামের অপর দিক থেকে আর একটি মানুষ এগিয়ে এল–একটি সাদা মানুষ, সৈনিকদের মতই সাজপোশাক, তবে অনেক বেশি দামী ও ঝলমলে। হঠাৎ টারজান যেন সব রহস্যের চাবিকাঠিটি হাতে পেয়ে গেল যে লোকটি এগিয়ে আসছে। সে যেন উঠে এসেছে রোমের পালাজ্জো ডি কনজারভেটারিতে অবস্থিত জুলিয়াস সিজারের প্রতিমূর্তির বেদী থেকে। আসলে এই যুবকটির নাম মালিয়াস লেপাস।
