এক মুহূর্ত সেইভাবে দাঁড়িয়ে ছোট নকিমাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিদায়-বাণীও উচ্চারণ না করে ধীর গম্ভীর পদক্ষেপে টারজান জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল।
ওয়াইরামওয়াজি পর্বতের গায়ে তাঁবুর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে এরিক ভন হারবেন শিবিরের দিকে তাকাল।
প্রথম ঘুম ভাঙতেই চারদিকে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা তার মনে একটা গোলমালের পূর্বাভাষ জাগিয়ে তুলেছিল। খাস খানসামা গাবুলাকে বার বার ডেকেও কোন সাড়া না পেয়ে সেটা আরও বেড়ে গেল।
তাড়াতাড়ি খোঁজ-খবর করতেই দেখা গেল লোকজনরা ভন হারবেনের সবকিছু নিয়ে সরে পড়েছে। সমস্ত খাবার-দাবার, রাইফেল ও গুলি তারা সঙ্গে নিয়ে গেছে। রেখে গেছে শুধু একটা লাজার পিস্তল ও এমুনিশন বেল্ট; এ দুটি বস্তু তাঁবুতে তার নিজের কাছেই ছিল।
ভন হারবেন পাহাড়ের উত্রাইয়ে বনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তার বেশি সময় লাগল না। তাঁবুতে ফিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু টুকিটাকি জিনিস হ্যাঁভারস্যাকে ভরে নিল, এমুনিশন বেল্টটা বুকের উপর জড়িয়ে নিল, তারপর উপরের দিকে তাকিয়ে ওয়াইরামওয়াজি রহস্যের পথে যাত্রা করল।
সারাটা দিন সে পাহাড় বেয়ে উঠল। বিশ্রাম শুধু রাতে। সকালে উঠে আবার যাত্রা শুরু করল।
শেষ বাধা পেরিয়ে পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে ভন হারবেন উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল। সম্মুখে প্রসারিত একটা উঁচু-নিচু উপত্যকা। দূরে দেখা যাচ্ছে আর একটা পর্বতশ্রেণী-অস্পষ্ট ও ধূসর। দূরের পাহাড় ও তার মধ্যে কি আছে? আবিষ্কারের সম্ভাবনায় তার নাড়ীর গতি দ্রুততর হল।
অনেক নিচে ফিতের মত তিনটে স্রোতধারা হ্রদে এসে পড়েছে; আরও দূরে চোখে পড়ছে একটা ফিতে-সেটা সম্ভবত রাস্তা। খাদের পশ্চিম দিকটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল, সেই বন ও হ্রদের মাঝখানে কি যেন নড়াচড়া করছে; হয়তো কোন তৃণভোজী পশুই হবে।
এ দৃশ্য দেখে ভন হারবেনের আবিষ্কারক মনটা উত্তেজনার একেবারে চরমে উঠে গেল। নিশ্চয় এখানেই আছে ওয়াইরামওয়াজি লুপ্ত উপজাতির গোপন রহস্য; যতদূর চোখে পড়ছে এই সব খাড়া পাথরের প্রাচীর বেয়ে নিচে নামা একেবারেই অসম্ভব।
সূর্য ডুবে গেল। এক সময় এ্যানিটের প্রাচীরে একটা সংকীর্ণ ফাটল তার চোখে পড়ল। পাহাড়ের মাথা থেকে নিচে নামবার মত একটা পথ তবু পাওয়া গেল; কিন্তু সে পথটা কতদূর নেমে গেছে ঘনায়মান অন্ধকারে তা বোঝা গেল না।
ক্ষুধায় ও ঠাণ্ডায় কাতর হয়ে রাতের অন্ধকারে সে সেখানেই বসে পড়ল; নিচের অন্ধকার শূন্যে তার চোখ। অন্ধকার আরও গাঢ় হতেই সে দেখল, অনেক নিচে একটা আলোর ফুলকি ঝিলিক দিয়ে উঠল; আরও একটা, আবারও একটা। প্রতিটি ঝিলিকের সঙ্গে বাড়ছে তার উত্তেজনা, কারণ আলো থাকা মানেই মানুষের উপস্থিতি। জলাভূমির মত হ্রদের অনেক জায়গাতেই আলোর ফুলকি জ্বলছে; আর যেখানে দ্বীপটা অবস্থিত সেখানে অনেক মানুষের চলাফেরা।
ওটা কি? নিচের আঁধার-ঢাকা গহ্বর থেকে যে শব্দটা উঠে আসছে সেটা শুনবার জন্য ভন হারবেন কান পাতল। অস্পষ্ট ক্ষীণ একটা শব্দ কানে এল; কিন্তু তার ভুল হয়নি-সে শব্দ মানুষের কণ্ঠস্বর।
অনেক দূরে উপত্যকার বুক থেকে ভেসে এল কোন জন্তুর আর্তনাদ; তারপরেই দূরে’বজ্রপাতের মত একটা গর্জন শোনা গেল। সেই শব্দ শুনতে শুনতে ভন হারবেন ক্লান্ত হয়ে সেখানেই শুয়ে পড়ল।
সকাল হলে কিছু গাছপালা জোগাড় করে আগুন জ্বেলে শরীর গরম করল। দিনের আলোয় পাহাড়ের গায়ের ফাটলটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল। সেটা কয়েকশ’ ফুট পর্যন্ত নেমে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তবু তার ধারণা হল, সেটা ওখানেই শেষ হয়ে যায় নি, আরও নিচে নেমে গেছে।
তবু নিরূপায় হয়েই তাকে নিচে নামতে হবে। আশা মরীচিকা! যদি একটা পথ মিলে যায়! ফাটলের উপর থেকে পা বাড়িয়ে নিচে নামতে যাবে এমন সময় পিছনে পায়ের শব্দ শুনে বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে গিয়ে সে হাতের লাজারটা বাগিয়ে ধরল।
মুখ ফেরাতেই এরিক ভন হারবেন দেখল রাইফেলধারী জনৈক নিগ্রো তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
হাতের পিস্তল নামিয়ে সে চীৎকার করে ডাকল, গাবুলা! তুমি এখানে কি করছ?
সৈনিক বলল, বাওয়ানা, আমি তোমাকে একলা ফেলে চলে যেতে পারিনি; এই পাহাড়ের অধিবাসী প্রেতাত্মাদের হাতে তো তোমাকে মরতে দিতে পারি না।
ভন হারবেন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, তাই যদি হয় গাবুলা, তাহলে তারা তো তোমাকেও মেরে ফেলতে পারে।
গাবুলা বলল, জানি বাওয়ানা, আমিও মরব। আজ রাতে আমাদের দু’জনেরই মৃত্যু অনিবার্য।
তবু তুমি আমার পিছু পিছু এসেছ কেন?
তুমি আমাকে কত দয়া করেছ বাওয়ানা; তোমার বাবা আমাকে কত দয়া করেছে। ওদের কথা শুনে ভয় পেয়ে আমি ওদের সঙ্গে পালিয়েছিলাম, কিন্তু আমি ফিরে এসেছি।
ভন হারবেন বলল, কিন্তু গাবুলা, আমি ওই খাদের নিচে নামব। বিদায়। সে হাতটা বাড়িয়ে দিল। গাবুলা কিন্তু মনিবের বাড়ানো হাতটা না ধরেই বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
জীবন্ত ওখানে নামতে পারলেও কোনদিন ফিরতে পারবে না জেনেও?
হ্যাঁ।
ভন হারবেন নতুন উৎসাহে ও শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে আবার নিচে নামতে পা বাড়াল।
নানা রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষার পরে অনেক কষ্ট স্বীকার করে প্রথমে ভন হারবেন ও পরে গাবুলা সেই গহ্বরের নিচে পৌঁছে গেল।
