টারজানও শুনেছে।
মুভিরো বলল, বড় বাওয়ানার কান তো হরিণের মতই।
টারজান হেসে বলল, তা যদি না হত তাহলে আজ টারজানকে এখানে দেখতেই পেতে না।
কে আসছে? মুভিরো শুধাল।
একদল মানুষ, টারজান জবাব দিল।
প্রথম দেখা গেল একটি দীর্ঘদেহ নিগ্রো সৈনিককে। ওয়াজিরিদের দেখেই সে থেমে গেল। একটু পরে একটি দাড়িওয়ালা সাদা মানুষ এসে তার পাশে দাঁড়াল। ভাল করে লক্ষ্য করে সাদা মানুষটি শান্তির চিহ্ন দেখিয়ে এগিয়ে গেল। জঙ্গলের ভিতর থেকে এক ডজন বা তারও বেশি সৈনিক তাকে অনুসরণ করল। তাদের বেশিরভাগই কুলি; সঙ্গে মাত্র তিন-চারটে রাইফেল।
টারজান এবং ওয়াজিরিরা এবার বুঝতে পারল যে দলটা ছোট ও নিরীহ। ভয়ের কোন কারণ নেই।
দাড়িওয়ালা লোকটি এগিয়ে আসতেই টারজান সোল্লাসে বলর, ডক্টর ভন হারবেন! প্রথমে তো তোমাকে চিনতেই পারিনি।
হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ভান হারুবেন বলল, অরণ্যরাজ টারজান, ঈশ্বর আমার প্রতি সদয়। তোমার সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পুরো দুদিন আগেই তোমার দেখা পেয়ে গেলাম।
টারজান বলল, তুমি কেন টারজনের দেশে এসেছ ডাক্তার? আশা করি আমার বন্ধুটির কোন বিপদ দেখা দেয়নি।
ভন হারবেন বলল, আমরা এসেছি তোমার সাহায্য পাবার আশায় আমার ছেলে এরিকের ব্যাপারে। তাকে তো তুমি কখনও দেখনি।
টারজান বলল, না। কিন্তু তোমরা খুব ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। এইখানে তাঁবু ফেল। খেতে খেতেই তোমার সব কথা শোনা যাবে।
ভন হারবেনই শুরু করল। এরিক আমার একমাত্র ছেলে। চার বছর আগে ঊনিশ বছর বয়সে সম্মানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম শেষ করে প্রথম ডিগ্রিও পেয়েছে। সেই থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা নিয়েই দিন কাটিয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ব ও অপ্রচলিত প্রাচীন ভাষায় বিশেষ জ্ঞান লাভ করেছে। কয়েক মাস আগে সে আমার কাছে এসেছিল; এসেই আমাদের জেলায় এবং কাছাকাছি অঞ্চলে ব্যবহৃত কয়েকটি উপজাতির বিভিন্ন বান্টু কথ্য ভাষার প্রতি সে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই বিষয়ে উপজাতিদের মধ্যে গবেষণা চালাতে গিয়ে ওয়াইরামওয়াজি পর্বতমালার লুপ্ত উপজাতির প্রাচীন উপকথার বিষয়ে সে জানতে পারে, আর সেই থেকেই তার মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে এই উপকথার কোন বাস্তব ভিত্তি আছে, আর তা নিয়ে গবেষণা চালাতে পারলে হয়তো বাইবেলীয় যুগের লুপ্ত উপজাতিদের কোন বংশধরদের দেখাও মিলে যেতে পারে।
টারজান বলল, সে উপকথা আমি ভাল করেই জানি, আর তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাবার ইচ্ছাও অনেকবার হয়েছে, কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে তা আর ঘটে ওঠে নি।
ডাক্তার বলতে লাগল, এরিক যখন ওয়াইরামওয়াজিতে একটা অভিযানের প্রস্তাব করল তখন আমি বরং তাকে উৎসাহই দিয়েছি, কারণ এ ধরনের একটা অভিযান পরিচালনার পক্ষে সেই তো সবচাইতে উপযুক্ত লোক। সে বান্টুদের কথ্য ভাষা জানে, উপজাতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছে। আর পর্বতারোহণের যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও তার আছে।
কিন্তু যাত্রার পরে কিছুদিন যেতে না যেতেই আমি খবর পেয়েছি যে তার দলের কিছু লোক নিজ নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা আমাকে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু যে সব কথা আমার কানে এসেছে তাতে পরিষ্কার বুঝতে পারছি যে আমার ছেলের সময় ভাল যাচ্ছে না; কিছু গোলমাল দেখা দিয়েছে। সুতরাং স্থির করলাম, একটা সাহায্যকারী দল নিয়ে তার কাছে যাব। কিন্তু সারা জেলা ঘুরে ওয়াইরামওয়াজির পর্বতে যাবার মত মাত্র এই ক’টি লোককে যোগাড় করতে পেরেছি, কারণ তাদের ধারণা যে ওয়াইরামওয়াজি লুপ্ত উপজাতিরা একদল রক্তচোষা প্রেত। তখনই বুঝলাম যে এরিকের দল ছেড়ে যারা চলে এসেছে তারাই জেলার সর্বত্র এই আতংক ছড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই অরণ্যরাজ টারজনের কথাই আমার প্রথম মনে হয়েছে। …….এখন বুঝতে পারছ কেন আমি এখানে এসেছি।
তার কথা শেষ হতেই টারজান বলল, আমি তোমাকে সাহায্য করব ডাক্তার।
ভন হারবেন বলল, খুব ভাল কথা। আমি জানতাম তোমার সাহায্য পাব। যতদূর মনে হচ্ছে এখানে। তোমার লোকের সংখ্যা প্রায় কুড়ি, আর আমার সঙ্গে আছে চৌদ্দ। আমার লোকরা তল্পিবাহকের কাজ করতে পারবে, আর তোমার লোকরা তো আফ্রিকার সেরা যোদ্ধা বলে পরিচিত। তোমার নির্দেশে আমরা অচিরেই পথের হদিস পেয়ে যাব, আর ছোট হলেও যে দলটি আমাদের সঙ্গে যাবে তাদের নিয়ে এমন কোন দেশ নেই যেখানে আমরা যেতে পারব না।
টারজান মাথা নেড়ে বলল, না ডাক্তার, আমি একাই যাব। সেটাই আমার চিরকালের রীতি। একা হলে আমি অনেক দ্রুত যেতে পারব। তুমি তো জান জংলী লোকেরা আমাকে তাদের আপনজন বলে মনে করে। অন্য লোক দেখলেই তারা দূরে সরে যাবে, কিন্তু আমার কাছ থেকে দূরে যাবে না।
ভন হারবেন বলল, তুমি ভাল করেই বোঝ যে আমি তোমার সঙ্গেই যেতে চাই। তবে তুমি না বললে আমাকে তা মানতেই হবে।
তুমি তোমার মিশনে ফিরে যাও ডাক্তার, সেখানেই আমার চিঠির জন্য অপেক্ষা করে থেকো।
মুভিরোর দিকে ঘুরে বলল, মুভিরো, আমার সৈন্যদের নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। প্রয়োজন হলে আমি ডাকলেই যাতে তাদের পাই সেইভাবে ওয়াজিরির প্রতিটি সৈনিককে সর্বদা প্রস্তুত রেখো।
টারজান তার ধনুক ও তীর-ভর্তি তূনীর পিঠে ঝুলিয়ে নিল; বাঁ কাঁধ ও ডান বগলের নিচে জড়িয়ে নিল ঘাসের দড়িটা; কোমরে ঝোলাল স্বর্গত পিতার শিকারী ছুরি। ছোট বর্শাটা হাতে নিয়ে মাথা সোজা করে দাঁড়াল।
