দু’জন সৈনিক জেনকে চেপে ধরে টানতে টানতে বেদীর কাছে নিয়ে গেল। কম্পিতদেহ কাবান্দাবান্দা চুলের মুঠি ধরে জেনকে বেদীর উপর তুলে নিল। কটিবন্ধ হতে তুলে নিল তার সুতীক্ষ ছুরি। মেয়েটির বুক লক্ষ্য করে ছুরি তুলতেই দ্বারপথে গর্জে উঠল একটা পিস্তল। কাভুরুদের প্রধান পুরোহিত কাবান্দাবান্দা বুক চেপে ধরে মর্মভেদী হাহাকার করে জেনের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল।
দরজার দিকে তাকিয়েই জেন বলল, টারজান! অরণ্যরাজন টারজান!
একশ’ জোড়া চোখ পড়ল তাদের উপর-টারজান ও ব্রাউন নির্ভয়ে ঘরে ঢুকল। একজন সৈনিকের হাতে বর্শা উদ্যত হতেই কথা বলল ব্রাউনের পিস্তল; সৈনিক ধরাশায়ী হল।
টারজান কথা বলল স্থানীয় ভাষায়। আমরা এসেছি আমাদের মেয়েদের ফিরিয়ে নিতে। বিনা বাধায় তাদের তুলে দাও আমাদের হাতে, অন্যথায় তোমরা মুরবে। মনে রেখো, আমরা অন্য লোকের মত নই। আমাদের রাগিও না।
কাভুরুরা চিত্রার্পিতের মত দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ আনেৎকে দেখতে পেয়ে ব্রাউন এক লাফে সেদিকে এগিয়ে গেল। সৈনিকরা দুই পাশে সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিল। আবেগরুদ্ধ গলায় সে আনেকে জড়িয়ে ধরল। ‘
টারজান এক লাফে এগিয়ে জেনকে বলল, চলে এস। ওরা কোন কিছু ভাববার আগেই আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। নিচের ভয়ে জড়সড় মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, মুভিরোর মেয়ে বুইরা কি এখানে আছে?
একটি তরুণী ছুটে বেরিয়ে এল। চীৎকার করে বলল, বড় বাওয়ানা! এবার তাহেল বেঁচে গেলাম।
টারজান বলল, তাড়াতাড়ি চল। অন্য যে সব মেয়ে এখান থেকে পালাতে চায় তাদেরও সঙ্গে নাও।
পালাতে তো সকলেই চায়। পুরো দলটাই এসে টারজান ও ব্রাউনকে ঘিরে দাঁড়াল। মন্দিরের ফটকের কাছে যেতে না যেতেই তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল ধোয়ার ঘন কুণ্ডুলি; মাথার উপরে দেখতে পেল সশব্দ অগ্নিশিখা।
আনেৎ বলে উঠল, মন্দিরে আগুন লেগেছে।
ব্রাউন বলল, এটাও আমাদেরই কাজ। উড়োজাহাজের আগুনেই মন্দির জ্বলছে। আমরাও বুঝি আটকা পড়ে গেলাম। এখান থেকে বের হবার অন্য কোন পথ কি কারও জানা আছে?
জেন বলল, আছে। মন্দির থেকে বনের মধ্যে যাবার একটা গুপ্ত পথ আছে। আমি তার প্রবেশ পথটা জানি। এদিকে চল। মুখ ফিরিয়ে সে দরবারকক্ষের দিকে পা বাড়াল। অল্পক্ষণেই পৌঁছে গেল কাবান্দাবান্দার ঘরে। হঠাৎ একটা নতুন চিন্তা এল জেনের মাথায়। ব্রাউনের দিকে ফিরে বলল, আমরা সকলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম, দু’জন জীবন দিয়েছে, চিরযৌবনের গুপ্ত রহস্য জানতে। সে জিসিন আছে এই ঘরে। চলে এস।
প্রধান পুরোহিতের অন্দরমহলে ঢুকে আলমারিটা দেখিয়ে জেন বলল, এর মধ্যে একটা রহস্য আছে; তাতেই আছে তোমাদের বাঞ্ছিত বস্তু। কিন্তু চাবিটা আছে কাবান্দাবান্দার কাছে।
ব্রাউন বলল, আমার কাছেও একটা চাবি আছে। পিস্তলের এক গুলিতে তালাটাকে ভেঙ্গে সে আলমারি খুলে ফেলল।
ব্রাউন ছোট বাক্সটাকে তুলে নিল। তারপর সকলে ছুটল সুড়ঙ্গ-পথের খোঁজে।
পাশের বারান্দা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে সকলে ঢুকল একটা অন্ধকার ঘরে। সেটা পার হয়ে একটা দরজা খুলল। বাইরে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার।
জেন বলল, এই সুড়ঙ্গ শেষ হয়েছে বনের মধ্যে। এই পথে এগিয়ে চল।
***
তিন সপ্তাহ পরে। ছয়টি প্রাণীর একটি দল সমবেত হয়েছে কাভুরুদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে টারজনের বাংলোর বসবার ঘরের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের পাশে। সেখানে আছে অরণ্যরাজ ও তার স্ত্রী; হাতে হাত ধরে সিংহের চামড়ার আসনে বসে আছে ব্রাউন ও আনে; পিছনে একটা চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে। আছে টিবস্; আর ছোট্ট নকিমা গম্ভীরভাবে বসেছে একজন ভাইকাউন্টের কাঁধে।
ব্রাউন প্রশ্ন করল, বটিকাগুলো নিয়ে কি করতে চাও?
জেন বলল, তোমার যেমন ইচ্ছা। ওগুলো পাবার জন্য তুমি তো জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছিলে। ওগুলো তুমিই নাও।
ব্রাউন বলল, না জীবনের ঝুঁকি তো আমরা সকলেই নিয়েছিলাম; তাছাড়া আসলে তুমিই তো ওগুলো পেয়েছ। এ নিয়ে যত ভাবছি ততই নিজের ভুল বুঝতে পারছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা অনেকেই এত বেশিদিন বেঁচে থাকি যে তাতে জগতের কোন কল্যাণই হয় না। অনেকেরই আরও আগেই মরে যাওয়া উচিৎ।
কি করা হবে আমি বলছি। এগুলো আমরা ভাগাভাগি করে নেব। আমরা পাঁচজন হব চিরজীবী।
আর চিররূপসী, আনেৎ যোগ করল।
একটু কেশে টিবস্ বলল, যদি ক্ষমা করেন তো একটা কথা বলি মিস। এত বছর ধরে ট্রাউজার ইস্তিরি করতে হবে-সে কথা ভাবতেও ভাল লাগে না আর রূপ- ওরে বাবা! তাহলে তো চাকরিই জুটবে না। সুন্দর খানসামার কথা কে কবে শুনেছে?
ব্রাউন তবু বলল, তাহলেও আমরা ভাগ করেই নেব। তুমি খেয়ো না। কিন্তু সাবধান, কোন প্রিন্সের কাছে যেন এগুলো বিক্রি করো না। এই নাও, পাঁচটা সমান ভাগ করেছি।
জেন হেসে বলল, তোমরা কি নকিমার কথা ভুলেই গেছ?
ব্রাউন বলল, ঠিক কথা। ভাগ হবে ছয়টা। অনেক মানুষের চাইতে এ জগতে নকিমার দরকার অনেক বেশি।
লুপ্ত সাম্রাজ্যে টারজান (টারজন অ্যাণ্ড দি লস্ট এম্পায়ার)
মনিবের খোলা বাদামী কাঁধের উপর নকিমা উত্তেজিতভাবে নাচতে শুরু করে দিল। অনবরত কিচির-মিচির করছে, আর একবার টারজনের মুখের দিকে একবার জঙ্গলের দিকে তাকাচ্ছে।
ওয়াজিরিদের ছোট সর্দার মুভিরো বলল, কে যেন আসছে বাওয়ানা; নকিমা শুনতে পেয়েছে।
