পেট্রোল কতটা আছে? টারজান শুধাল।
একটা টুপি ভর্তি হবে, ব্রাউন জবাব দিল।
ওতে হবে?
তা-মেশিন গরম হতে যদি বেশি সময় না লাগে। প্যারাসুট পেয়েছ?
একটা প্যারাসুট নিজে পরে টারজান আর একটা দিল ব্রাউনকে। তারপর দু’জনই ককপিটে উঠে গেল। মুখে কোন কথা বলল না। সব ব্যবস্থা রাতেই পাকা করা হয়েছিল।
অল্প চেষ্টাতেই প্রপেলার গর্জে উঠল। ব্রাউন হাসিমুখে বলল, যদি স্তবস্তুতি কিছু জানা থাকে তো সবগুলো আউড়ে যাও। যাত্রা শুরু হল।
বিমানটা স্বচ্ছন্দে উপরে উঠতে লাগল। বনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল মুভিরো, বালান্দো, টিবস্ ও ওগলি। আর দেখতে লাগল কাভুরু সৈনিকরা; বিমানের গর্জন শুনে ইতোমধ্যেই তারা পথে পথে জড়ো হয়েছে।
একজন সৈনিক ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল, মরা মানুষ কি উড়তে পারে। তার ধারণা যে দুটি যাত্রী বিমানের পাশে মরে পড়ে ছিল তারাই ওটাকে চালাচ্ছে।
সে কথা শোনামাত্রই সব কাভুরুদের মনে গেঁথে গেল। ভয়ে তারা শিউরে উঠল।
উড়োজাহাজটা যখন গ্রামের দিকে চলল তখন তারা আরও ভয় পেল।
একজন বলল, ওরা প্রতিশোধ নিতে এসেছে।
আর একজন বলল, আমরা যদি কুটিরেব মধ্যে ঢুকে যাই তাহলে ওরা আমাদের দেখতে পাবে না।
যে কথা সেই কাজ। দেখতে দেখতে পথঘাট ফাঁকা হয়ে গেল। প্রতিশোধ এড়াতে সকলেই ঘরে ঢুকে গেল।
জাহাজটা উপরে উঠতে লাগল–আরও উপরে।
এক সময় ব্রাউন চীৎকার করে বলল, প্রস্তুত হও।
টারজান নিরাপত্তা-বেল্টের হুকটা খুলে দিল।
হঠাৎ জাহাজটাকে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে দিয়ে ব্রাউন চীৎকার করে উঠল, লাফ দাও।
নিচের পাখনাটা ধরে টারজান লাফ দিল। পরমুহূর্তে ব্রাউনও লাফিয়ে পড়ল।
কাবান্দাবান্দার সঙ্গে জেন এঁটে উঠতে পারল না। ব্যাঘীর মত বাধা দেয়া সত্ত্বেও সে জেনকে টানতে টানতে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল।
তাকে কোচের উপরে ঠেলে দিয়ে কাবান্দাবান্দা বলল, শয়তানী, তোমাকে মেরে ফেলাই উচিত, কিন্তু আমি তোমাকে মারব না। তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব; পোষ মানাব- আর সে কাজ এখনই শুরু করব। বিকৃত মুখে সে জেনের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় বাইরের দরজায় ঘা পড়তে লাগল। কে যেন ভয়ার্ত গলায় ডাকল, কাবান্দাবান্দা! কাবান্দাবান্দা! আমাদের বাঁচাও! আমাদের বাঁচাও।
প্রধান পুরোহিত সক্রোদে চীৎকার করে বলল, কার এত সাহস যে কাবান্দাবান্দাকে বিরক্ত করে। তোমরা চলে যাও!
চলে যাওয়ার বদলে তারা দরজাটাকে সপাটে খুলে ফেলল। তাদের দলে সৈনিক ও ক্রীতদাস দুইই আছে।
প্রধান পুরোহিত শুধাল, তোমরা কি চাও? কেন এখানে এসেছ?
মরা মানুষরা উড়ছে; তারা উড়ছে গ্রামের উপরে, মন্দিরের মাথার উপরে। তারা এসেছে প্রতিশোধ নিতে।
কাবান্দাবান্দা ধমক দিয়ে বলল, তোমরা মূর্খ, ভীরু। মরা মানুষ কখনও উড়তে পারে না।
একজন সৈনিক বলল, কিন্তু সত্যি তারা উড়ছে। যে দু’জনকে কাল আমরা মেরেছিলাম তারাই এখন উড়ছে গ্রাম ও মন্দিরের উপরে। তুমি বাইরে চল কাবান্দাবান্দা; মন্ত্রের বলে ওদের তাড়িয়ে দাও।
প্রধান পুরোহিত বলল, তাই যাব। ইদেনি, এই মেয়েটাকেও সঙ্গে নিয়ে চল। সুযোগ পেলেই ও পালাবে।
ওকে পালাতে দেব না। বলতে বলতে ইদেনি সজোরে জেনের কব্জি চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল প্রধান পুরোহিতের পিছনে-পিছনে সকলে গিয়ে হাজির হল মন্দির-চত্বরে।
উড়োজাহাজের মোটরের শব্দ শুনেই জেন আকাশে চোখ তুলল। একটা ছোট বিমান পাখ খেয়ে ঘুরছে। কাভুরুরা বিস্মিত চোখে, ভীত চোখে সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
পরমুহূর্তেই জেন দেখল, বিমান থেকে একজন লাফ দিল। তার দেখাদেখি আরও একজন।
একজন সৈনিক চেঁচিয়ে উঠল, ওরা এসে পড়ল! কাবান্দাবান্দা, মরা মানুষের প্রতিহিংসার হাত থেকে আমাদের রক্ষা কর।
বাতাসে প্যারাসুট দুটো খুলে গেল। তা দেখে একটি ক্রীতদাস আর্তনাদ করে উঠল, এবার ওরা পাখনা মেলছে। শকুরেন মত আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
ওরা দু’জন যখন ধীরে ধীরে মাটিতে নামছে তখন একটা হাল্কা হাওয়া ওদের বয়ে নিয়ে চলল মন্দিরের দিকে। ওরা দেখল, সমবেত জনতা মন্দির-চতুরে ভিড় করে আছে। ওরা দেখল, বিমানটি তীব্র গতিতে নেমে যাচ্ছে। আরও দেখল হঠাৎ জনতা উধাও হয়ে মন্দিরে ঢুকে গেল, আর তখনই বিমানটি চত্বরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাতে আগুন ধরে গেল।
টারজান প্রথম মাটিতে পা দিল। তারপর নামল ব্রাউন। দু’জনই ছুটল মন্দিরের দিকে। বাঁধা দেবার কেউ নেই। রক্ষীরাও ভয়ে পালিয়েছে। কয়েকটা চিতাও ভয় পেয়ে ছুটে পালাল।
কিছুটা এগোতেই অনেক কণ্ঠের কল-গুঞ্জন কানে এল। সেই শব্দ লক্ষ্য করে টারজান বারান্দা ধরে এগিয়ে গেল।
সকলে সমবেত হয়েছে কাবান্দাবান্দার দরবার-কক্ষে। প্রধান পুরোহিত সিংহাসনে বসে কাঁপছে আতংকের প্রতিমূর্তি যেন।
অন্য সবাইকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে একটি সৈনিক সিংহাসনের দিকে এগিয়ে গেল। কাবান্দাবান্দার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, তোমার পাপেই আমাদের এই বিপদ। তুমি তোমার শপথ ভাঙতে চেয়েছ। এই মেয়েটা ওগলিকে যাদু করেছিল; তোমাকেও যাদু করেছে। এই মরা মানুষদের ওই লেলিয়ে দিয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। ওকে শেষ করে দাও। নিজের হাতে ওকে শেষ করে দাও; তবেই আমরা রক্ষা পাব।
শত কণ্ঠে ধ্বনি উঠল, ওকে সাবাড় কর! ওকে সাবাড় কর।
