জেন এবারও মাথা নাড়ল। না সে প্রশ্নেই ওঠে না।
তুমি কাবান্দাবান্দাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ? তার মুখের নিষ্ঠুরতা দুটি চোখেও ছড়িয়ে পড়ল। মনে রেখো, তোমাকে ধ্বংস করবার, অথবা কোন কিছু না দিয়েই তোমাকে অধিকার করবার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু আমি উদার। কেন জান কি?
কল্পনাও করতে পারি না।
কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে চিরদিনের মত এখানে রাখব; তোমাকে করব প্রধান ভৈরবী; যুগ যুগ ধরে তোমাকে যৌবনবতী করে রাখব; রূপবতী করে রাখব। তুমি আর আমি চিরকাল বেঁচে থাকব। মানবজাতিকে নবযৌবন দানের ক্ষমতা আমার আছে; সেই ক্ষমতাবলে সারা জগৎকে রাখব পায়ের নিচে। আমরা হব ঈশ্বর-আমি দেব, আর তুমি দেবী।
কাবান্দাবান্দা দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। চিত্র-বিচিত্র দেয়াল, আলমারি খুলে একটা বড় বাক্স বের করল। বলল, এখানে এস; দেখ। বাক্সের ডালাটা খুলে জেনের সামনে মেলে ধরল। ভিতরে মটর দানার মত অনেকগুলো কালো রঙের বটিকা। জান একগুলো কি?
না।
এই সব বটিকা হাজার মানুষকে দেবে অনন্ত যৌবন ও রূপ। একটি মুখের কথায় এগুলো তোমার হবে। আকাশে ভরা চাঁদ ওঠার শুভক্ষণে এর একটি বটিকা খেলে তুমি পাবে সেই অমূল্য রত্ন যার জন্য জগতের প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে গোটা মানবজাতি সাগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। জেনের হাত ধরে যুবক তাকে কাছে টানল।
ঘৃণায় চীৎকার করে জেন নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করল। যুবক তাকে আরও জোরে চেপে ধরল। জেন সজোরে তার মুখে আঘাত করল। বিস্মিত যুবকের মুঠি শিথিল হল। আর সেই সুযোগে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জেন পাশের ছোট ঘরে ছুটে গেল।
ক্রোধে গর্জন করতে করতে কাবান্দাবান্দা তার পিছু নিল। বারান্দায় যাবার দরজার কাছেই তাকে ধরে ফেলল। জেনের আপ্রাণ বাধা সত্ত্বেও চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে তাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে। চলল।
কেমন করে কিভাবে কাভুরুদের গ্রামে ঢোকা যায় তা নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করে টারজান ও ব্রাউন অনেকু রাতে বনের প্রান্তে একটা গাছে চড়ে শুয়ে পড়ল।
টারজান বলল, তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন। তুমি শুয়ে পড়। আমি তোমাকে ঠিক সময়ে জাগিয়ে দেব।
টারজানও ঘুমোল। কিন্তু তার ঘুম খুব পাতলা। প্রয়োজন মতই ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। একটা অস্বাভাকি শব্দ যেন তার চেতনায় আঘাত করল।
গাছের ভিতর দিয়ে সে দ্রুত এগিয়ে গেল। কান থেকে এবার নাকে এসে লাগল একটা গন্ধ। বুঝতে পারল, কাছেই একটি কাভুরু আছে। ভাল করে তাকাতেই দেখতে পেল, একটা লোক জঙ্গলের পথে হেঁটে চলেছে। মুহূর্তমাত্র অপেক্ষা করে টারজান তার উপর লাফিয়ে পড়ল; তাকে মাটিতে ফেলে দিল। লোকটির দেহ শক্তপোক্ত। নিজেকে ছাড়াতে যথাসাধ্য চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। জঙ্গলের রাজার হাতে সে তো মোমের পুতুলমাত্র।
লোকটির দুই হাত পিছমোড়া করে বেঁধে টারজান তাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। আধা অন্ধকারে টারজনের মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আর যাই হোক, এ লোকটি কাভুরু নয়।
বলল, কে তুমি? তুমি তো কাভুরু নও; তাহরে নিশ্চয় আমাকে কাবান্দাবান্দার কাছে নিয়ে যাবে না।
টারজান বলল, তুমি যদি আমার প্রশ্নের ঠিক জবাব দাও, তাহলে তোমাকে কাবান্দাবান্দার কাছে নেব না, বা তোমার কোন ক্ষতিও করব না। তুমি কে?
আমি ওগলি।
সদ্য গ্রাম থেকে এসেছ?
হ্যাঁ।
গ্রামে ফিরে যেতে চাও?
না। কাবান্দাবান্দা আমাকে মেরে ফেলবে।
কাবান্দাবান্দা কি এতই বড় যোদ্ধা যে তুমি তাকে ভয় কর?
তা ঠিক নয়, তবে সে খুব শক্তিধর কাভুরুদের প্রধান পুরোহিত।
একটু একটু করে টারজান ওলির কাছ থেকে সব কথা জেনে নিয়ে বলল, তাহলে মেয়ে দুটি এখনও জীবিত আছে?
হা; অন্তত কয়েক মিনিট আগে পর্যন্ত বেঁচে ছিল।
তাদের কি এখনই কোন বিপদ ঘটতে পারে?
কাবান্দাবান্দা কি করবে তা কেউ বলতে পারে না। তবে আমার মনে হয় এখনই তাদের কোন বিপদ ঘটবে না, কারণ তাদের একজনকে সে সঙ্গিনীরূপে বেছে নেবে, হয়তো বা এতক্ষণ নিয়েছে।
গুপ্ত পথটা কোথায়? আমাকে সেখানে নিয়ে চল। দাঁড়াও; আগে আমার বন্ধুদের ডাকি।
টারজান সঙ্গীদের জাগিয়ে তুলল।
ওগলি বলল, আমি তোমাকে সুড়ঙ্গ-পথে নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু সে পথে তোমরা বন্দিরে ঢুকতে পারবে না। গুপ্ত পথের হসিদ যারা জানে না তাদের কাছে সুড়ঙ্গের উভয় মুখই একদিকে খোলে-বনের দিকে; একমাত্র কাবান্দাবান্দাই ফেরার হদিস জানে। তাই সহজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে আসা যায়, কিন্তু ফিরে যাওয়া অসম্ভব।
কয়েক মিনিট ধরে আরও অনেক প্রশ্ন করে ওগলির কাছ থেকে খবরাখবর জেনে নিয়ে টারজান সঙ্গীদের বলল, আনেৎ ও লেডি গ্রেস্টোক মন্দিরের মধ্যেই আছে। আমার বিশ্বাস লোকটি সত্য কথাই বলেছে। ওর কথায় যতদূর বুঝতে পারছি লেডি গ্রেস্টোকের সমূহ বিপদ; কাজেই সময় নষ্ট করা চলবে না। মুভিরোর দিকে ফিরে বলল, ব্রাউন ও আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এই লোকটিকে আটকে রাখ। অন্ধকার নামবার আগেই যদি ফিরে না আসি তো বুঝবে যে আমাদের সব চেষ্টা বিফল হয়েছে। তখন বিমানযাত্রীদের কাছ থেকে যে সব অস্ত্র পেয়েছে সেগুলো আমাদের দিয়ে দাও। ব্রাউনের ধারণা জাহাজে আরও অস্ত্র আছে। চলে এস ব্রাউন।
দু’জন নিঃশব্দে এগিয়ে চলল খোলা প্রান্তেরের ভিতর দিয়ে। উড়োজাহাজের কাছে পৌঁছে ব্রাউন সোজা তাতে উঠে গেল। নেমে এসে এক বাক্সভর্তি কার্তুজ টারজনের হাতে দিয়ে বলল, তোমার তো পটেক নেই, এইটে দিয়ে কাজ চালাবে। আমি সবগুলি পকেটভর্তি করে এনেছি- প্রায় টনখানেক ওজন হয়েছে।
