উল্টো দিকের দরজা থেকে কে যেন ছুটে এল। শোনা গেল আনেতের গলা। ম্যাডাম! ম্যাডাম! এসব কি? কি হয়েছে?
সবরভ সভয়ে বলে উঠল, ও কে? আমি জানি ও আনেৎ। তোমরা সবাই আমার উপর ভর করেছ।
জেন সান্ত্বনার সুরে বলল, শান্ত হও এলেক্সিস। কিটি এখানে নেই, আর আনেৎ ও আমি দু’জনই বেঁচে আছি। বলতে বলতে সে আনেতের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে হুড়কোটা খুলে দিল।
সবরভ আর্তনাদ করে উঠল, ওকে ঢুকতে দিও না! তুমি ভূত হও আর যাই হও, ওকে ঘরে ঢুকতে দিলে আমি তোমাকে টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলব।
সঙ্গে সঙ্গে দুরজা ঠেলে আনেৎ ছুটে এল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বারান্দার দরজা খুরে ঘরে ঢুকল কালো ক্রীতদাস মেডেক।
সে বলল, কি হচ্ছে এখানে? এ লোকটাকে কে এখানে আসতে দিল?
আনেৎকে দেখে সবরভ ভয়ে কুঁকড়ে সরে গেল। তার পরেই মেডেককে দেখে আর্তকণ্ঠে বলে উঠল, কিটি! না, আমি যাব না। তুমি চলে যাও!
মেডেক এগিয়ে গেল। সবরভ ঘুরে ঘরের একমাত্র জানালাটার দিকে ছুটে গেল। একমুহূর্ত গোবরাটে দাঁড়িয়ে থেকে পিছনে তাকিয়ে মেডেকের অস্পষ্ট মূর্তিটাকে দেখতে পেয়ে আতংকে চীঙ্কার। করতে করতে বাইরের অন্ধকার চত্বরে লাফিয়ে পড়ল।
মেডেক ছুটে গিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়াল। নিচ থেকে ভেসে এল স্বরভের আর্তকণ্ঠ। তাকেও ছাপিয়ে ভেসে এল অনেকগুলো চিতাবাঘের গর্জন ও হুংকার। বেচারি সবরভ! সদ্য নিহত শিকারের মাংস নিয়ে চিতাদের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেল। তারপর সব শেষ। চুপ।
মেডেক জানালা থেকে ফিরে এসে বলল, এ পথে পালাবার চেষ্টা বৃথা। তারপর বাইরের বারান্দায় গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
আনেৎ বলল, কি দুঃখের ব্যাপার ম্যাডাম।
জেন বলল, সত্যি দুঃখের। তবে এ ভালই হল। প্রিন্স সবরভ পাগল হয়ে গিয়েছিল।
বাইরে পায়ের শব্দ শুনে আনেৎ বলল, স্-স্-স্ ম্যাডাম! কে যেন আসছে।
জেন কান পেতে বলল, ধপাস্ করে কে যেন পড়ে গেল। শুনতে পেয়েছ?
হা। এ যে আর এক বিপদ।
দরজাটা সপাটে খুলে গেল; ঢুকল একটি মূর্তি। কণ্ঠস্বর শোনা গেল। কোথায় তুমি? ওগলির কণ্ঠস্বর।
আমি এখানে, জেন জবাব দিল।
তাড়াতাড়ি চলে এস। সময় নষ্ট করো না।
চলে এস আনেৎ, জেন বলল।
অন্য মেয়েটিও এখানেই আছে? ওগলির প্রশ্ন।
জেন বলল, হ্যাঁ আমি গেলে ও-ও যাবে।
কাভুরু বলল, তাই হবে। কিন্তু জলদি।
ওগলিকে অনুসরণ করে মেয়ে দুটি বারান্দায় বেরিয়ে এল।
অনেক বারান্দা ও ঘর পার হয়ে তিনজন এগিয়ে চলল সতর্ক পা ফেলে। ক্রমে রাত বাড়তে লাগল। তিনজনেরই একমাত্র লক্ষ্য জঙ্গলে পৌঁছবার গুপ্ত সুড়ঙ্গের মুখ।
এক সময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওগলি বলল, আমরা পৌঁছে গেছি। এই ঘরেই গুপ্ত সুড়ঙ্গের মুখ। কোন রকম শব্দ করো না।
সাবধানে দরজা ঠেলে তিনজন ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের ভিতর থেকে অনেকগুলো হাত বেরিয়ে এসে তাদের জাপটে ধরল। একটা ধস্তাধস্তির শব্দ জেন শুনতে পেল। শোনা গেল পলায়মান পদধ্বনি। তাকে টানতে টানতে বারান্দায় আনা হল। একজন নিয়ে এল একটা তৈল-প্রদীপ।
জেনের পাশে দাঁড়িয়ে আনেৎ ঠঠ করে কাঁপছে। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচজন সৈনিক। ওগলি সেখানে নেই।
একজন সৈনিক বলল, কোথায় গেল ওগলি? নিশ্চয় সুড়ঙ্গ-পথে পালিয়েছে। ছুটে চল। তাকে ধরতেই হবে।
অপর সৈনিক বলল, এতক্ষণে সে অনেক দূরে চলে গেছে। আমরা ধরবার আগেই সে বনের মধ্যে পৌঁছে যাবে। রাতের অন্ধকারে সেখানে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সকাল হোক, তখন দেখা যাবে।
আর একজন বলল, সেই ভাল। আপাতত এই দুটিকে কাবান্দাবান্দার কাছে পৌঁছে দেয়া যাক।
চিতাবাঘের চামড়ায় ঢাকা বিছানায় বসে ছিল কাবান্দাবান্দা। বড় বড় চোখে জেনের দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, এখান থেকে পালিয়ে যাবে? তা-ওগলি কোথায় গেল?
একজন সৈনিক জানাল, সে সুড়ঙ্গ-পথে পালিয়েছে।
বাঁকা হাসি হেসে কাবান্দাবান্দা বলল, ঠিক আছে। এটিকে নিয়ে আবার তিন-সাপের ঘরে আটকে রাখ। দেখ, যেন পালিয়ে না যায়। তারপর জেনকে দেখিয়ে বলল, এর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে; এই ষড়যন্ত্রে আর কারা লিপ্ত আছে তা আমাকে জানতে হবে। যাও।
আনেৎকে নিয়ে সকলে চলে গেল।
কাবান্দাবান্দা জেনকে একা পেয়ে বলল, বটে! ওগলির সঙ্গে পালাচ্ছিলে তার সঙ্গিনী হবার আশায়। তোমার জন্যই সে তার শপথ ভাঙতে যাচ্ছিল।
জেনের ঠোঁট ঘৃণায় বেঁকে গেল। বলল, ওগলি হয়তো তাই ভেবেছিল।
তুমিও তো তার সঙ্গী হয়েছিলে।
হয়েছিলাম, তবে জঙ্গল পর্যন্ত; তারপর হয় পালাতাম, নয়তো তাকে খুন করতাম।
প্রধান পুরোহিত বলল, কেন? তোমারও কোন শপথ আছে নাকি?
আছে- আনুগত্যের শপথ।
সাগ্রহে ঝুঁকে পড়ে প্রধান পুরোহিত বলল, কিন্তু সে শপথ তো ভাঙতে পারতে-ভালবাসার জন্য; আর তা না হলে মুক্তিপণ হিসেবে।
জেন মাথা নাড়ল। কোন কিছুর জন্যই নয়।
আমি কিন্তু আমার শপথ ভাঙতে পারি। এক সময় ভাবতাম কোনক্রমেই এ শপথ ভাঙ্গা যায় না, কিন্তু, তোমাকে দেখার পর থেকে-কাবান্দাবান্দা থামল, তারপর হঠাৎ বলল, কাবান্দাবান্দা হয়েও আমি যদি আমার শপথ ভাঙাতে পারি, তাহলে তুমিও তো তোমার শপথ ভাঙতে পার। তার জন্য যে মূল্য তুমি পাবে তার জন্য যে কোন নারী তার আত্মাকেই বেচে দিতে রাজী হবে- সে মূল্য অনন্ত যৌবন, শাশ্বত সৌন্দর্য।
