সে ঘরে ঢুকতেই ওগলি নতজানু হল। আনেৎ তাকে অনুসরণ করল। কিন্তু জেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কাবান্দাবান্দা বলল, তোমরা উঠে দাঁড়াও। জেন নামক এই মেয়েটি ছাড়া বাকি সকলেই বারান্দায় বেরিয়ে যাও। আমি ওর সঙ্গে নির্জনে কথা বলতে চাই।
ওগলি সোজাসুজি কাবান্দাবান্দার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে; কাভুরুর পুরোহিতদের প্রধান পুরোহিত, আমি যাচ্ছি; কিন্তু আমি কাছাকাছিই থাকব।
মুহূর্তের জন্য কাবান্দাবান্দার মুখটা ক্রোধে লাল হয়ে উঠল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। সকলে বেরিয়ে গেলে একটা বেঞ্চি দেখিয়ে জেনকে বসতে বলে নিজে তার পাশে বসল। অনেকক্ষণ জেনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় বলল, তুমি খুব সুন্দর। তোমার চাইতে বেশি সুন্দর কাউকে আমি দেখি নি। বড়ই দুঃখের কথা; বড়ই দুঃখের কথা।
দুঃখের কথাটা কি? জেন জানতে চাইল।
প্রসঙ্গ চাপা দিতে যুবক বলে উঠল, কিছু মনে করো না। আমার চিন্তাটা একটু সরে হয়ে গেছে। সে আবার চুপ করল; কিসের চিন্তায় ডুবে গেল। পরে আবার বলতে লাগল, তোমাকে বলা যেতে পারে। তুমি বুদ্ধিমতী, তুমি বুঝতে পারবে-অবশ্য আমি যদি যথেষ্ট শক্তিমান হই। কিন্তু যখন তোমার দিকে তাকাই, ওই দুটি চোখের গভীরে যখন দৃষ্টি মেলে দিই, তখন আমি বড় দুর্বল হয়ে পড়ি। না, না! আমি কর্তব্য পালনে বিচলিত হবে না; জগৎ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, আমাকে কর্তব্য সাধন করতেই হবে।
তুমি কি বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, জেন বলল।
পারবে-পারবে। অনেক কাল আগে মৃত্যুহীন যৌবনের গুপ্ত কথা আমি জানতে পারি। কতকগুলো বিশেষ ফুলের রেণু, কতকগুলো গাছের শিকড়, চিতাবাঘের শিরদাঁড়ার মজ্জা, আর প্রধানত নারীর-যুবতী নারীর গ্রন্থি ও রক্ত-এমনি সব বস্তুর মিশ্রণে তৈরি হয় সেই যৌবন-রসায়ন। বুঝতে পেরেছ?
হা। জেন শিউরে উঠল।
চমকে উঠো না; মনে রেখো, এইভাবেই তুমি হবে জীবন্ত ঈশ্বরের অংশ। তুমি বেঁচে থাকবে চিরকাল গৌরবে দীপ্ত হবে তুমি।
কিন্তু এসব কিছুই তো আমি জানতে পারব না; তাহলে তাতে আমার কি লাভ?
আমি জানব যে তুমি আমার একটি অংশ। আর সেইভাবেই আমি তোমাকে পাব। সে আরও ঝুঁকল। কিন্তু তুমি যেমন আছ তেমনি তোমাকে রাখতে চাই আমি। জেনের কপোলে লোকটির গরম নিঃশ্বাস পড়ছে। কেন নয়? আমি কি প্রায় ঈশ্বর নই? ঈশ্বর কি ইচ্ছামত কাজ করতে পারে না? কে তাকে বাধা। দেবে?
জেনকে চেপে ধরে সে তাকে কাছে টানল।
অসহায় মেয়েটি কি করবে! আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিবশেই লোকটির ঠোঁটকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে চীৎকার করে ডাকল–ওগলি।
সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজা সপাটে খুলে গেল। কাবান্দাবান্দা জেনকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মেঝেটা পার হয়ে ওগলিও থামল। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মুহূর্তের জন্য কাবান্দাবান্দার মুখ ও গলা রাগে লাল হয়ে উঠল। তারপরেই মরার মত সাদা মুখে সে ওগলির পাশ দিয়ে ঘর থেকে চলে গেল। একটা কথাও বলল না।
সৈনিক অতি দ্রুত জেনের কাছে গিয়ে বলল, ও আমাদের দু’জনকেই খুন করবে। আমাদের পালাতেই হবে; তাহলেই তুমি আমার হবে। মন্দির চত্বর ও গ্রামের নিচ দিয়ে একটা গোপন সুড়ঙ্গ আমি চিনি। জড়ি-বুটির খোঁজে কাবান্দাবান্দা মাঝে মাঝে সেই পথ দিয়ে যায়। অনেক রাত হলে আমরা যাব।
রাগে লাল হয়ে কাবান্দাবান্দা যখন প্রাসাদের অলিন্দপথে হেঁটে যাচ্ছে তখন একজন বন্দীসহ ইদেনির সঙ্গে তার দেখা হল।
তোমার সঙ্গে ও কে?
ইদেনি নতজানু হয়ে বলল, এরও মাথায় দানো ঢুকেছে। তাই তোমার কাছে নিয়ে এসেছি।
প্রধান পুরোহিত হুংকার দিয়ে উঠল, এখান থেকে নিয়ে যাও। তালাবন্ধ করে রাখ। কাল সকালে নিয়ে এস।
সবরভকে নিয়ে তিন তলায় উঠে ইদেনি তাকে একটা অন্ধকার ঘরে ঠেলে দিল। এটা দুই-সাপের ঘর। পাশেই তিন-সাপের ঘর। বাইরে থেকে দরজায় খিল এঁটে ইদেনি চলে গেল।
পাশের ঘরে ওলি বলল, আমি যাচ্ছি। এখন আমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। পরে এসে তোমাকে নিয়ে যাব।
কিন্তু আনেৎ কোথায়?
পাশের ঘরে।
তাকেও সঙ্গে নেবে তো?
দেখি। তুমি কিন্তু পালাবার চেষ্টা করো না। গুপ্ত পথ ছাড়া অপর একমাত্র পথ চত্বরের ভিতর দিয়ে। সেখানে ঢুকলেই নিশ্চিত মৃত্যু। সাবধান!
বেরিয়ে যাবার আগে ওলি দরজাটা বন্ধ করে বাইরে থেকে খিল এঁটে দিয়ে গেল।
দুই-সাপের ঘরে অন্ধকারে সবরভ একা।
পাশের ঘরে অস্পষ্ট শব্দ শুনে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা দরজা পেল। তালাবন্ধ। বৃথাই সেটা টানাটানি করল।
পাশের ঘরে জেন সে শব্দ শুনে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ওগলি বলেছে, আনেৎ আছে পাশের ঘরে। তাহলে তো সেই শব্দ করছে।
জেন দেখতে পেল, তার দিকে দরজায় একটা ভারী হুড়কো লাগানো। খুব সাবধানে সে একটু একটু করে হুড়কোটা সরাতে লাগল। ওপার্শে আনেও তালা ধরে টানাটানি করছে। দু’জনের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। অস্পষ্ট আলোয় একটা মূর্তিকে ঘরে ঢুকতে দেখে জেন ফিসফিস্ করে ডাকল, আনেৎ!
কথা বলল একটা পুরুষ কণ্ঠ। সে মারা গেছে। ব্রাউন তাকে খুন করেছে। জেনকেও সেই মেরে ফেলেছে। তুমি কে?
এলেক্সিস! জেন চেঁচিয়ে বলল।
তুমি কে? সবরভ প্রশ্ন করল।
আমি জেন-লেডি গ্রেস্টোক। তুমি কি আমার গলা শুনে বুঝতে পারছ না?
তা পারছি, কিন্তু তুমি তো মৃত। কিটি কি তোমার সঙ্গে আছে? হা ঈশ্বর!
