তার কাঁধে হাত রেখে জেন ফিসফিসিয়ে বলল, কাবান্দাবান্দার অনুমতি চাইবে তো?
ওগলি মুখ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল; কিন্তু জেনের ঠোঁটে খুশির হাসি ফুটল। সে বুঝতে পেরেছে যে তারই জয় হয়েছে।
জেনকে হাজির করা হল কাবান্দাবান্দা মন্দিরের প্রশস্ত কেন্দ্রীয় কক্ষে। কক্ষটি বড়। গাছের গুঁড়ির উপর বসানো নিচু ছাদ। কাঠের মেঝেতে পালিশ। প্রতিটি স্তম্ভের উপরে একটা করে দাঁতবিহীন মাথার খুলি সাজানো। চাঁদের মাঝখানে ঘরের একটি মাত্র খোলা জায়গা দিয়ে প্রচুর সূর্যের আলো এসে পড়েছে। চিতাবাঘের চামড়ায় মোড়া বেদীর উপর স্থাপিত প্রকাণ্ড সিংহাসনে উপবিষ্ট একটি মূর্তি।
সিংহাসনে উপবিষ্ট লোকটির দিকে প্রথম দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেন বিস্ময়ে ঢোক গিলল। লোকটি সুদর্শন।
এই তো কাবান্দাবান্দা, অথচ তার কল্পনার মূর্তির চাইতে কত আলাদা। এই তো সত্যিকারের রাজা; শুধু রাজা নয়, একাধারে ত্রিশক্তি-কাভুরুদের রাজা, ওঝা ও ঈশ্বর। সিংহাসনের দুই পাশে দুটি চিতাবাঘ ছাড়া বেদীর উপরে সে একাই আসীন। তার নিচে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাভুরু সৈনিকরা; আর আছে মোটা-সোটা ক্রীতদাসরা।
সঙ্গিনী দুটিকে বেদীর কাছে এনে ওগলি নতজানু হল; কর্কশ গলায় তাদেরও নতজানু হতে হুকুম করল। আনেৎ ভয়ে ভয়ে হুকুম পালন করল, কিন্তু জেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নির্ভীক চোখে সিংহাসনারূঢ় লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটি যুবক; চওড়া কটি-বন্ধনী ও নানা অলংকার ছাড়া প্রায় নগ্নদেহ। মানুষের দাঁতের হার গলা থেকে নেমে বুক পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে কটি-বস্ত্রের কাছে নেমে এসেছে। কব্জিতে, বাহুতে, গোড়ালিতে ধাতু, কাঠ ও হাতির দাঁতের নানা অলংকার। কিন্তু জেনের দৃষ্টি সে সবের দিকে নেই; সে স্থির দৃষ্টিতে দেখছে যুবকটির দেবোপম মুখ ও সুগঠিত দেহখানিকে।
এক দৃষ্টিতে জেনের দিকে তাকিয়ে থেকে লোকটি রাজকীয় ভঙ্গীতে আদেশ করল, নতজানু হও!
জেন জানতে চাইল, কেন? কেন আমি তোমার সামনে নতজানু হব?
আমি কাবান্দাবান্দা।
সেজন্য একটি ইংরেজ মহিলা তোমার সামনে নতজানু হবে কেন?
যুবকটি বলল, তুমি নতজানু হবে না?
নিশ্চয় না।
দুটি ক্রীতদাস জেনের দিকে এগিয়ে গেল। কাবান্দাবান্দা হাতের ইশারায় তাদের সরে যেতে বলল। বিচিত্র ভঙ্গীতে তার ঠোঁট দুটো বেঁকে গেল। সেটা খুশিতে, না ক্রোধে তা বুঝতে পারল না জেন।
ওগলি ও জেনকে উঠে দাঁড়াতে বলে যুবক জেনের দিকে ফিরে বলল, তুমি কে? আর কাভুরুদের দেশে কেন এসেছ?
আমি জেন ক্লেটন, লেডি গ্রেস্টোক। উড়োজাহাজে লন্ডন থেকে নাইরোবি যাবার পথে আমরা মাঝখানে নামতে বাধ্য হই। সঙ্গীদের নিয়ে উপকূলে পৌঁছবার পথে তোমার সৈনিকরা এই মেয়েটিকে ও আমাকে অপহরণ করে। আমি চাই, তুমি আমাদের মুক্তি দিয়ে নিকটবর্তী কোন বন্ধু গ্রামে পৌঁছে দাও।
কাবান্দাবান্দার ঠোঁটে একটু বাঁকা হাসি খেলে গেল। বলল, তাহলে তোমরাও একটা দানব পক্ষির পিঠে চড়ে এসেছ। আরও দু’জন এসেছে কাল। দানব পক্ষিটার পাশেই তাদের মৃতদেহ পড়ে আছে। আমার লোকজন দানব পক্ষিটাকে ভয় করে। কিছুতেই তার কাছে যাবে না। বলতো, সেটা কি ওদের কোন ক্ষতি করবে?
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওদের এই কুসংস্কারকে কাজে লাগাবার জন্য জেন বলল, ওটা থেকে দূরে থাকাই ভাল। ও রকম দানব পক্ষি আরও অনেক আসবে। তারা যদি দেখে তোমরা আমার বা সঙ্গিনীদের কোন ক্ষতি করেছ, তোমার এই গ্রাম ও লোকজনদের তারা ধ্বংস করে ফেলবে। আমাদের নিরাপদে পাঠিয়ে দাও; আমরা তাদের বলে দেব, যেন তোমাদের কোন ক্ষতি না করে।
যুবক জবাব দিল, তোমরা যে এখানে আছ তারা তা জানতেই পারবে না। কাভুরুদের গ্রামে অথবা কাবান্দার মন্দিরে কি ঘটে কেউ জানতে পারে না।
তুমি আমাদের ছেড়ে দেবে না?
না। এ গ্রামের ফটক দিয়ে একবার যে ঢোকে সে আর বের হতে পারে না-আর তুমি তো পারবেই না। অনেক মেয়ে আমার কাছে এসেছে, কিন্তু তোমার মত কেউ আসে নি।
তোমার তো অনেক মেয়ে আছে। তাহলে আমাকে চাইছ কেন?
আধ-বোঝা চোখে জেনের দিকে তাকিয়ে সে বলল, আমি জানি না। ওগলি এদের নিয়ে যাও তিন সাপের ঘরে।
আনেৎ বলে উঠল, তিন-সাপের ঘর! সে ঘরে কি তিনটে সাপ থাকে?
যেতে যেতে জেন বলল, যে সব ঘর পার হয়ে যাবে তার দরজার উপরে চোখ রেখো। তাহলেই তোমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে। একটা দরজার মাথায় আছে শুয়োরের মাথা। আর একটাতে আছে দুটো মানুষের খুলি। একটাতে আছে চিতার মাথা। এইভাবেই এরা ঘরের নামকরণ করে থাকে, ঠিক আমরা যেমন হোটেলের ঘরে সংখ্যা লিখে দেই।
মন্দিরের তিন তলায় উঠে ওগলি তাদের নিয়ে যে ঘরটায় ঢুকল, সত্যি তার দরজার উপরে তিনটে সাপের মাথা খোদাই করা।
ওগলি বলল, পালাবার চেষ্টা করো না, তাতে কোন লাভ হবে না।
জেন বলল, মোটেই সে চেষ্টা করছি না। তুমি সাহায্য না করলে আমাদের পক্ষে পালানো অসম্ভব। তুমিই আমাদের একমাত্র বন্ধু।
হঠাৎ লোকটি প্রশ্ন করল, কাবান্দাবান্দা কিভাবে তোমাকে দেখছিল সেটা কি তুমি লক্ষ্য করেছ?
না তো, জেন বলল।
আমি করেছি; আগে কখনও কোন বন্দীর দিকে ওভাবে তাকাতে তাকে আমি দেখি নি। কিন্তু সে যদি এ কাজ করতে চেষ্টা করে, তাহলে আমি বারান্দায় কিসের শব্দ শুনে ওগলি চুপ করে গেল। দরজা খুলে ঘরে ঢুকল একটি ক্রীতদাস। সে পাশে সরে দাঁড়াতেই প্রকাশ পেল কাবান্দাবান্দার মূর্তি।
