মুভিরো একটা উঁচু এ্যানিট পাথরের উপর উঠে গেল; তার একমাত্র সঙ্গী বালালো। মুভিরো গুলি চালিয়ে কাভুরুদের আটকাতে লাগল। আর সেই সুযোগে বালান্দো উঠে গেল একেবারে চূড়োয়। তারপর সে গুলি চালাতে লাগল, আর মুভিরো পাহাড় বেয়ে উঠে গেল তার পাশে।
ফলে কাভুরুরা রণে ভঙ্গ দিয়ে গ্রামের দিকে ফিরে গেল। গোধূলির আলোয় মুভিরো স্পষ্ট দেখতে পেল, তারা সকলেই সার বেঁধে গ্রামের ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।
দুঃখিত মনে মুভিরো ও বালান্দো পাহাড়ের আশ্রয় থেকে নিচে নেমে এল। এবার রাতের মত একটা আশ্রয় দরকার।
গাছে উঠে চলতে চলতে হঠাৎ একটা গন্ধ এসে টারজনের নাকে লাগল। যে দিক থেকে গায়ের গন্ধ আসছিল টারজান সেই দিকেই দ্রুত এগোতে লাগল। নাকই তাকে বলে দিল এ গন্ধ দুটি সাদা পুরুষের। একটি নারীর দেহ-গন্ধের আশায় বৃথাই সে শ্বাস টানতে লাগল।
টারজান এবার গতি কমিয়ে দিল। এগোতে লাগল নিঃশব্দে। অবশেষে দেখতে পেল, দুটি মানুষ ক্লান্ত পদক্ষেপে তার নিচেকার পথ ধরেই চলেছে।
এক সময় দু’জনই বসে পড়ল। উপরে ঘাপটি মেরে বসে টারজান তাদের সব কথাই শুনতে পেল। কোন কথাই বাদ গেল না।
টিবস্ বলল, মিঃ এবুলমিস আনেৎকে তুলে নিয়ে চলে গেল, অথচ আনেৎ চীৎকার করল না, এটা তো হতে পারে না।
ব্রাউন বলল, আনেৎ হয় তো ভয়ে চীৎকার করে নি। লোকটাকে সে ভীষণ ভয় করত।
লেডি গ্রেস্টোক তো তাকে ভয় করত না। তাহলে সে কেন সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকল না?
টিবস বলল, তোমার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। লেডি গ্রেস্টোক একটি অসাধারণ মহিলা। আমি তো এখনও আশা রাখি তাকে খুঁজে পাব।
কিন্তু আনেতের কি হল? সে কথা যদি কেউ বলতে পারত।
টারজান তখন নিঃশব্দে গাছ থেকে নেমে তাদের দু’জনের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সে বলল, আমি বলতে পারি।
তার গলা শুনে দু’জনই ঘুরন্ত চাকার মত ঘুরে দাঁড়াল। দু’জনই বিস্ময়ে বিমূঢ়।
একটু পরেই ব্রাউন বলল, কে তুমি? আর কোত্থেকেই বা এখানে উদয় হলে? আর কি বলতে পার তুমি?
বলতে পারি কিভাবে তোমাদের দুটি স্ত্রীলোক উধাও হয়ে গেছে।
কি বলছ তুমি? এ যে এক আজব দেশরে বাবা। এখানে যখন-তখন মানুষ উধাও হয়ে যায়। আর তুমি হওয়ার ভিতর থেকে লাফিয়ে নেমে এলে একটা জ্যান্ত ভূতের মত। তুমি কে? বন্ধু না
বন্ধু, টারজান জবাব দিল।
এরকম বিনা পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? ব্রাউন জানতে চাইল; তোমার কি জামা-কাপড় নেই, না কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই?
আমি বানররাজ টারজান।
আচ্ছা! তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুশি হলাম; আমি নেপোলিয়ান। কিন্তু এবার হড়হড় করে বলে ফেল তো আনেৎ সম্পর্কে কি জান-দুটি মহিলার কথাই বল। কে তাদের নিয়ে গেছে? সবরভ কি? অবশ্য তুমি তো সবরভকে চেনই না।
টারজান বলল, সবরভকে আমি চিনি। তোমাদের বিমান দুর্ঘটনার কথাও জানি। আমি জানি যে প্রিন্সেস সবরভ খুন হয়েছে। আর লেডি গ্রেস্টোক ও আনেতের কি হয়েছে সেটাও জানি বলেই মনে হয়।
ব্রাউন অবাক। বলল, এত কথা তুমি জানলে কেমন করে? এবার চটপট বল, মহিলা দুটির কি হয়েছে।
তারা কাভুরুদের হাতে ধরা পড়েছে। তোরা এখন কাভুরুদের দেশে।
কাভুরু কারা? ব্রাউন প্রশ্ন করল।
অভস্য সাদা মানুষদের একটি উপজাতি। অদ্ভুতভাবে তারা মেয়েদের চুরি করে হয় তো কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাদের বলি দেয়।
কোথায় থাকে তারা?
তা জানি না। তাদের গ্রামের খোঁজে এসেই তোমাদের বিমান-দুর্ঘটনার কথা জানতে পারি। আমার বিশ্বাস, শীঘ্রই সেটাকে খুঁজে পাব। কাভুরুদের এমন কতকগুলো গুপ্ত ব্যাপার আছে যাকে তারা লুকিয়ে রাখতে চায়; কাজেই তাদের গ্রামের ত্রিসীমায় কাউকে ঘেঁসতে দেয় না।
কিসের গুপ্ত ব্যাপার? ব্রাউন প্রশ্ন করল।
লোকের বিশ্বাস, তারা একরকম অমৃত আবিষ্কার করেছে যা খেলে বুড়ো মানুষ আবার যুবক হতে পারে।
ব্রাউন শিস দিয়ে উঠল। বটে! আমরাও তো সেই খোঁজেই এসেছি। অবিশ্বাসের সুরে টারজান বলল, তোমরা খুঁজছ কাভুরুদের?
ব্রাউন বলল, বৃদ্ধ মহিলাটি সেই অমৃতের খোঁজেই এসেছিল; আমিও তাই-হঠাৎ সে থেমে গেল। রাগে তার মুখ কালো হয়ে উঠল। চীৎকার করে ডাকল, সবরভ!
বাঁকটা ঘুরেই ব্রাউনকে দেখে প্রিন্স থমকে দাঁড়াল। আমেরিকানটি এগিয়ে গেল তার দিকে।
সবরভ টারজানকে লক্ষ্য করে বলল, ওকে থামাও।
এক লাফে এগিয়ে গিয়ে টারজান ব্রাউনের হাত চেপে ধরল। হুকুমের ভঙ্গীতে বলল, থাম!
নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ব্রাউন বলল, আমাকে যেতে দাও মুখখু কোথাকার। নিজের চরকায় তেল দাও গে। একটা বিরাশী সিক্কার ঘুষি বাগিয়ে সে টারজনের চোয়াল লক্ষ্য করে হাত তুলল। চকিতে সরে গিয়ে সে ব্রাউনকে চেপে ধরে দুই হাতে শূন্যে তুলে ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, নেপোলিয়ান হে, ওয়াটারলুর কথা বেমালুম ভুলে গেছ যে।
তার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে ব্রাউন বলল, সেটা এক আছাড়েই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি এখনও বুঝতে পারছি না সেই উকুনটাকে মারতে তুমি বাধা দিচ্ছ কেন।
কারণ তোমাদের ঝগড়াটা এখন বড় কথা নয়, আসল কথা হচ্ছে লেডি গ্রেস্টোকের পাত্তা করা।
আর আনেতের, ব্রাউন যোগ করল।
ঠিক, টারজান বলতে লাগল। তোমাদের তিনজনকে সভ্য জগতে ফেরৎ পাঠানোও দরকার। তোমরা কেউ জঙ্গলের লোক নও। তবু বোকার মত জঙ্গলে এসে নিজেরাও বিপদে পড়েছ, আর অন্যদেরও বিপদ ঘটিয়েছ।
