ওগলি বিরক্ত গলায় জেনকে মই বেয়ে উঠতে বলল। ছাদে পোঁছে বাড়িটার এমন সব লক্ষণ জেনের চোখে পড়ল যাতে এটা একটা কিভা সে বিষয়ে কোন সন্দেহ রইল না-ছাদের উপর একটা ছোট চতুষ্কোণ মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে আর একটা মইয়ের প্রথম ধাপ।
সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে ওগলি হুকুম করল, নিচে নেমে যাও। সেখানেই তুমি থাকবে। পালাবার চেষ্টা করো না। তাতে আরও খারাপ হবে।
জেন নিচের দিকে তাকাল। কিছুই চোখে পড়ল না-শুধুই একটা অন্ধকার গহ্বর।
জলদি! ওগলি ধমক দিল।
মইয়ের প্রথম ধাপে পা রেখে জেন ধীরে ধীরে নামতে লাগল সেই রহস্যময় অন্ধকার মহাশূন্যতার মধ্যে। তার মনে তখন একটিমাত্র চিন্তা ও কাভুরুদের গ্রামে কোন নারীকে সে দেখে নি। এই যোদ্ধারা যে সব মেয়েকে হরণ করেছে তাদের কি হয়েছে? তারাও কি নেমে গেছে এই অন্ধকার অতল গহ্বরে?
ওয়াজিরিদের নিয়ে মুভিরো বনের শেষ প্রান্তে হাজির হল। তাদের সামনে পাহাড়ের সানুদেশে একটি খোলা প্রান্তর।
একজন ওয়াজিরি আঙুল বাড়িয়ে বলল, উঁচু পাহাড়ের কোলে একটা গ্রাম দেখতে পাচ্ছি।
ভুরুর উপর হাত রেখে মুভিরো মাথা নেড়ে বলল, ওটা নিশ্চয় কাভুরুদের গ্রাম। শেষ পর্যন্ত তাহলে খুঁজে পেলাম। বুইরাকে আমরা হয়তো পাব না, কিন্তু কাভুরুদের এমন শিক্ষা দিয়ে যাব যে আর কোনদিন ওয়াজিরি মেয়েদের গায়ে তারা হাত তুলবে না।
এগিয়ে চল, বলে মুভিরো সদলে কাভুরুদের গ্রামের দিকে অগ্রসর হল। হঠাৎ সে থামল। বলল, ওটা কি?
ওয়াজিরিরা কান পাতল। একটা অস্পষ্ট একটানা শব্দ ক্রমেই উচ্চ হতে উচ্চতর হতে লাগল। সৈনিকরা নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকাল।
একজন বলল, ঐ তো সেই জিনিস। একটা উড়ন্ত নৌকা। ওয়াজিরিদের দেশের উপর দিয়ে আগেও আমি একটাকে উড়ে যেত দেখেছি। সেই একই শব্দ।
একটু পরেই উড়োজাহাজটা দৃষ্টিগোচর হল। তিন-চার হাজার ফুট উপরে সেটা পাক খেতে লাগল। ক্রমে মাটি থেকে শ’ খানেক ফুট উপরে নেমে এল। কিন্তু তখনও পাক খেতে খেতে ঘুরতে লাগল। বিমান চালক নামবার মত একটা জায়গা খুঁজছে। দু’ঘণ্টা ধরে সেই ব্যর্থ চেষ্টাই করে চলেছে।
অতটা নিচে নেমে আসার দরুণ চালক ওয়াজিরিদের দেখতে পেল। মাথায় সাদা পালক গোঁজা লোকগুলো বন থেকে বেরিয়ে আসছে। ওদিকে আদিবাসীরা বেরিয়ে আসছে তাদের গ্রাম থেকে। চেহারায় ও পোশাকে দুই দলের মধ্যে বিস্ময়কর পার্থক্য। সে বিমানটাকে আরও নিচে নামিয়ে আনল।
কক-পিট থেকে তার সঙ্গী একটা চিরকুট লিখে তাকে দিল, ওরা কারা? আমার তো সাদা মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
চালক লিখল, ওরা সাদা মানুষই বটে।
সমস্ত প্রান্তর জুড়ে ইতস্তত ছড়ানো বড় বড় পাথরের চাঁই ও ঝর্ণা থাকার জন্য নিরাপদে নামবার মত জায়গা পাওয়াই ভার। তারই মধ্যে দুটো মাত্র জায়গা অপেক্ষাকৃত ভাল- একটা গ্রামের ঠিক সামনে, আর অপরটি বনের কাছাকাছি। সেখানে ওয়াজিরিরা হাজির হয়েছে দেখে চালক স্থির করল গ্রামের কাছে সাদা মানুষদের পাশেই নামবে। কী মারাত্মক ভুল!
মুভিরো সদলে এগিয়ে চলেছে গ্রামের দিকে। তখন দেখতে পেল, দু’জন আরোহী কক-পিট থেকে নামছে, আর কাভুরু গ্রামের খোলা ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসছে অসভ্য সাদা যোদ্ধার দল।
মুভিরো দেখেই বুঝতে পারল, ওরা শত্রুপক্ষ। সে বুঝতে পেরেছে যে ওরাই কাভুরু। বর্শা উঁচিয়ে চীৎকার করতে করতে ওরা ছুটে যাচ্ছে দুই বিমানযাত্রীকে লক্ষ্য করে। যতদূর মনে হয়, ওয়াজিরিদের উপস্থিতিটা ওরা তখনও টের পায়নি।
নিচু গলায় সঙ্গীদের কি সব বলে মুভিরো সদলবলে এগোতে লাগল। তারা মাত্র দশজন; কাভুরুরা। সংখ্যায় অনেক বেশি, প্রতি একজনে দশজন; তবু তারা সাহস হারায় নি।
বিমানযাত্রীরা যখন বুঝতে পারল, যে আদিবাসীরা তাদের আক্রমণ করতে আসছে, তখন তারাও বিমানের দিকে ফিরে চলল। একজন কাভুরুদের মাথার উপর দিয়ে একটা গুলি ছুঁড়ল; তাতেও কাভুরুরা থামল না দেখে আবার গুলি ছুঁড়ল; এবার একজন কাভুরু মাটিতে পড়ে গেল। তবু তারা এগোতেই লাগল।
এবার দুই বিমানযাত্রীই গুলি ছুঁড়তে লাগল কিন্তু কাভুরুরা থামল না। অচিরেই তারা দুজন শত্রুর বর্শার আওতার মধ্যে যাবে। একটা সাময়িক আশ্রয়ের আশায় দু’জনই পিছন ফিরে তাকাল; কিন্তু যা দেখল তাতে তারা প্রমাদ গুণল- একদল কালো সৈনিক সার বেঁধে নিঃশব্দে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা ততক্ষণে হয়ে গেছে- ওয়াজিরিরা এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেবার আগেই কাভুরুরা তাদের আরও কাছে এসে পড়ল। দু’জনের পিস্তলের গুলিতে কাভুরুদের আরও কয়েকজন ধরাশায়ী হল। তবু এগোতে লাগল। এক সময় কাভুরু ও ওয়াজিরি দুই দলই তাদের কাছে এসে পড়ল।
কাভুরুদের হাতের বর্শা উড়তে লাগল। বুকে বর্শা বিধে নবাগতদের একজন পড়ে গেল। এবার বর্শা। ছুঁড়তে লাগল ওয়াজিরিরা। সাময়িকভাবে কাভুরুদের গতিরোধ করা গেল।
কিন্তু সে তো মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার তারা বর্শা ছুঁড়তে লাগল। এবার দ্বিতীয় বিমানযাত্রীও পড়ে গেল। সেই সঙ্গে পড়ল তিনজন ওয়াজিরি তারপরেই কাভুরু ও ওয়াজিরিদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি যুদ্ধ।
ওয়াজিরিরা এখন সংখ্যায় সাত। সাহসে ভর করে তারা যুদ্ধ করছে। কিন্তু সংখ্যার অনেক বেশি কাভুরুদের সঙ্গে তারা এঁটে উঠতে পারবে কেন? যুদ্ধ চালাতে চালাতেই মুভিরো ও তার অন্যতম সঙ্গী বালান্দো মৃত বিমানযাত্রীদের পিস্তল ও গুলি হাতিয়ে নিল। এবার মুখোমুখি যুদ্ধে পিস্তলের পাল্লাই ভারি হয়ে উঠল; কাভুরুরা হকচকিয়ে গেল; সেই সুযোগে মুভিরো ও তার দলের লোকেরা একটা আশ্রয় খুঁজে নেবার মত সময় পেয়ে গেল। এখন তারা দলে মাত্র চারজন-মুভিরো, বালান্দো ও আর দু’জন।
