ব্রাউন চলেছে সকলের আগে। তার পিছনে টিবস্। তারপর চলেছে জেন। গাছের উপর থেকে নিঃশব্দে তাদের অনুসরণ করে চলেছে একটি ক্লান্তিহীন যাত্রী।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রাউন থামল। বলল, রাতের যাত্রাবিরতির পক্ষে এই জায়গাটাই বেশ ভাল মনে হচ্ছে।
ইংরেজটি টলতে টতে কোনরকমে মাটিতে এলিয়ে পড়ল। বলল, বড় ক্লান্ত!
ব্রাউন হেসে বলল, আমার অবস্থা কিন্তু অতটা শোচনীয় নয়। আরে তিনি কোথায়?
পিছনে তাকিয়ে টিবস্ বলল, তিনি তো আমার ঠিক পিছনেই আসছিলেন। এক সেকেন্ডের মধ্যেই এসে পড়বেন।
ব্রাউন যেন ভয় পেল। বলল, তার তো এতটা পিছিয়ে পড়ার কথা নয়। হাই, আপনি কোথায়! লেডি গ্রেস্টোক!
কোন সাড়া নেই। দু’জনেই সাগ্রহে পিছনের দিকে তাকাল। টিবস্ কোনরকমে উঠে দাঁড়াল। ব্রাউন আবার ডাকল। টিবস্ ব্রাউনের মুখের দিকে তাকাল। ভয়ে বিবর্ণ।
ব্রাউন পিছনের পথ ধরে দৌড়তে শুরু করল। টিবস্ টলতে টলতে দৌড়তে লাগল। ব্রাউন মাঝে মাঝে থামছে আর জেনের নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু কোন সাড়া নেই। ক্রমে রাতের আঁধার তাদের ঘিরে ধরল।
আতংকের মধ্যে নকিমার রাতটা কাটল। নকিমা ডালে ডালে লাফিয়ে টারজান ও ওয়াজিরিদের খোঁজে এগিয়ে চলেছে। ছোট একটা লাঠি তার হাতে; লাঠির মাথায় উড়ছে কাগজের একটা টুকরো।
কিছুদূর যেতেই মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। তার বুকের ভিতরটা টিপ্ টিপ্ করে উঠল। শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। সে জানে এ কণ্ঠস্বর টারজনের।
সত্যি তাই। গাছের উঁচু ডাল থেকে নেমে এল বন্ধুর কাঁধে। এক হাতে জড়িয়ে ধরল টারজনের গলা; অপর হাতের লাঠির ডগায় উড়ন্ত কাগজের টুকরোটা এসে গেল সোজা টারজনের চোখের সামনে। লেখাগুলোর উপর দৃষ্টি পড়তেই সে হাতের খেলা সে চিনতে পারল। এ যে অবিশ্বাস্য; ছোট্ট নকিমার হাতে জেনের হাতের লেখা চিঠি- এ কথা কল্পনা করাও যে ভয়ঙ্কর।
লাঠির মাথা থেকে টারজান চিঠিটা খুলে নিয়ে পড়তে লাগল।
মুভিরো বলল, নকিমা কি কোন খারাপ খবর এনেছে বাওয়ানা?
লেডি গ্রেস্টোকের চিঠি। একদল বন্ধুসহ সে বিমানসহ নামতে বাধ্য হয়েছে। কোন এক স্থানে তারা হারিয়ে গেছে। সঙ্গে না আছে খাবার, না আছে অস্ত্রশস্ত্র।
নকিমার দিকে ফিরে টারজান আবার বলল, এ চিঠি তোমাকে কে দিল?
কেউ এটা নকিমাকে দেয় নি। একটা ঝুপড়ির মধ্যে নকিমা এটা পেয়েছে।
টারজান বলল, সেটা কোথায়? মনে করতে চেষ্টা কর। আমাকে সেখানে নিয়ে চল।
অনেক-অনেক পথ ঘুরতে ঘুরতে দু’জন এগিয়ে চলল। সব পরিশ্রম এক সময় সার্থক হল-গাছ গাছালির ভিতর দিয়ে নকিমা তাকে সেই আস্তানায় নিয়ে গেল যেখানে পথহারা বিমানযাত্রীরা আশ্রয় নিয়েছিল।
এখানে টারজান এমন সব অভ্রান্ত প্রমাণ পেল যাতে পরিষ্কার বোঝা গেল যে সেই মন্দভাগ্য যাত্রীদলের মধ্যে জেনও ছিল; নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়ে গাছের ডালে ডালে সেই অজ্ঞাত দেশের। উদ্দেশ্যে সে যাত্রা করল যা তার জীবন-সঙ্গিনীকে গ্রাস করেছে।
সেদিন অপরাহ্নে টিবস্ ও ব্রাউনকে অনুসরণ করে গাছের ডালে ডালে ঝুলতে ঝুলতে জেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আর সেই ফাঁকে যে লোকটি জেনকে অনুসরণ করছিল, এবার জেনকে কাঁধে করে গাছ-পালার ভিতর দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলল।
ধীরে ধীরে স্বরাচ্ছন্ন ভাবটা কাটিয়ে জেন জেগে উঠল। বুঝতে পারল নিজের ভয়াবহ অবস্থার কথা।
জেন ইংরেজিতে শুধাল, তুমি কে?
লোকটি ঠোঁট বাঁকাল; বালু বুলিতে বলল, বুঝতে পারছি না।
জেন বান্টু বুলি জানে। সে তাই সোৎসাহে বলে উঠল, কিন্তু আমি তোমার কথা বুঝি। এবার বল তুমি কে, আর আমাকে কেনই বা এনেছ। আমি তোমাদের শত্রু নই; কিন্তু তুমি যদি আমাকে আটকে রাখ বা আমার ক্ষতি কর তাহলে আমার লোকরা এসে তোমাদের গ্রামকে ধ্বংস করে ফেলবে, তোমাদের অনেককে মেরে ফেলবে।
তোমার লোকরা আসবে না। কাভুরুদের গায়ে কেউ আসে না। কেউ এলেই তার জান চলে যায়।
আমাকে নিয়ে কি করবে?
কাবান্দাবান্দার কাছে নিয়ে যাব।
জেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরে বলল, আমাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দাও না। তাতে তোমারও সুবিধা। গাছের ভিতর দিয়ে চলার অভ্যাস আমার আছে।
একটু ইতস্তত করে লোকটি জেনকে নামিয়ে দিয়ে বলল, পালাবার চেষ্টা করো না। চেষ্টা করলেই মরবে।
হাত-পাগুলো ভাল করে টান-টান করে জেন লোকটিকে ভাল করে দেখল। আদিম অসভ্য মানুষের মতই দেখতে।
শুধাল, তোমার নাম কি?
ওগলি, সে জবাব দিল।
তুমিই নিশ্চয় সর্দার?
আমি সর্দার নই। মাত্র একজনই সর্দার। সে কাবান্দাবান্দা।
পরদিন দুপুর নাগাদ বনের পথ শেষ হয়ে গেল। সামনেই খোলা মাঠ। সম্মুখে একটা সুউচ্চ পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। পাহাড়ের গায়ে অনেকটা জায়গা পাথরের বেড়া দিয়ে শক্ত করে ঘেরা। খোলা জায়গাটাতে বড় বড় পাথরের চাই ইতস্তত ছড়ানো। তার ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছে অনেকগুলো ঝর্ণা।
ওগলি চেঁচিয়ে ডাকতেই পাথরের দেয়ালের গায়ে দুটো বড় ফটক সামান্য খুলে গিয়ে তাদের দু’জনকে ভিতরে ঢুকতে দিল। সংকীর্ণ রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট পাথরের বাড়ি।
চৌমাথায় পৌঁছে ওগলি জেনকে নিয়ে একটা গলি ধরে নিচু, বৃত্তাকার একটা বাড়িতে পৌঁছে গেল। বাড়িটার কোন জানালা নেই; আছে শুধু ছাদে উঠবার একটা কাঠের মই। তাহলে এটা নিশ্চয় একটা কিভা-মন্দিরের মৃত্যু-কুঠুরি।
