বলল, কোথায় সে? বলুন, কোথায় সে?
সবরভ ঢোক গিলে বলল, আমি জানি না। ঈশ্বরের নামে বলছি, আমি জানি না।
তাহলে মরুন। ব্রাউনের শক্ত মুঠি আরও চেপে বসল।
যে ঘটনাটা বলতে এত সময় লাগল সেটা কিন্তু ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই।
জেনও চুপ করে নেই। যে মুহূর্তে সে বুঝতে পারল যে ব্রাউন সবরভকে খুন করতে চাইছে, তখনই বর্শাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল। বর্শার তীক্ষ্ণ মুখটা ব্রাউনের বাঁদিকে পাঁজরের উপর বসিয়ে বলল, ওকে ছেড়ে দাও ব্রাউন, নইলে এই বর্শা আমি তোমার হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দেব।
ধীরে ধীরে ব্রাউনের মুঠি আলগা হয়ে গেল। সবরভকে ছেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। বলল, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন মিস। আপনার বিচার সব সময়ই সঠিক। কিন্তু বেচারী আনেৎ-এই ইঁদুরটা সম্পর্কে কাল রাতে সে আমাকে যা বলেছিল তাতেই আমার মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল।
সে কি বলেছিল? জেন শুধাল।
ওই লোকটা কাল রাতে আনেতের কাছ থেকে সেই পোড়া কাপড়ের টুকরোটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করেছিল; তারপর তাকে ভয় দেখিয়ে বলেছিল যে এ কথা কাউকে বললে তাকে খুন করবে। কাল যে আনেৎ চীৎকার করেছিল সেটা ওকে দেখে। সে বেচারি ওকে ভীষণ ভয় করত মিস।
এলেক্সিসের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভয়ে কাঁপছে। কোন রকমে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, না। আমি শুধু কাপড়টা চেয়েছিলাম। সেটা আমার কিনা তাই দেখতে, আর অপনি আমাকে বিপদে ফেলার জন্যই ও চেঁচিয়ে উঠল।
জেন বলল, দেখুন, এভাবে কিছুই বোঝা যাবে না। আপনারা সকলেই যে যেখানে আছেন থাকুন, আমি একবার চারদিকে ঘুরে পায়ের ছাপগুলো দেখে আসি। সকলে ঘোরাঘুরি শুরু করলে কোন ছাপ। থাকলেও তা চাপা পড়ে যাবে।
জেন মুহূর্তকাল দাঁড়াল। প্রথমে পায়ের ছাপের দিকে তাকিয়ে পরে মাথার উপরকার গাছের ডালের দিকে তাকাল। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে একটা ডাল ধরে ঝুলে সেই গাছে চড়ে বসল।
ব্রাউন ছুটে এসে শুধাল, কিছু কি দেখতে পেলেন মিস?
জেন উত্তর দিল, একটা মানুষ তো হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না। আনেৎ পায়ে হেঁটে এই গাছের নিচ পর্যন্ত এসেছে; এখানেই তার পায়ের ছাপ শেষ হয়েছে; অথচ সে শিবিরেও ফিরে যায় নি। তাহলে একটিমাত্র স্থানেই সে যেতে পারে, আর সেটা হচ্ছে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি।
ব্রাউন বাধা দিয়ে বলল, কিন্তু সে তো আপনার মত লাফিয়ে ওখানেই উঠতে পারে নি; সেটা তার পক্ষে সম্ভবই নয়।
জেন বলল, সে লাফ দিয়ে ওঠে নি। তা করলে পায়ের ছাপ দেখেই বোঝা যেত। তাকে উপরে তুলে আনা হয়েছিল।
উপরে তুলে নিয়েছে! হায় ভগবান! কে তুলে নিয়েছে? ব্রাউনের গলা আবেগে কাঁপছে।
নিঃশব্দে কিছু মুখে দিয়ে সকলে আবার সেই ব্যর্থ অভিযানে পা বাড়াল। কারও মুখে কথা নেই।
সেদিন রাতের জন্য আবার তারা নদীর ধারে যাত্রাবিরতি ঘটাল। সঙ্গে সঙ্গে সবরভ ও টিবস মাটির উপর ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিল। জেন ও ব্রাউন শিকারে বের হল রাতের খাবারের সন্ধানে।
সন্ধ্যা নাগাদ জেন ও ব্রাউন ফিরে এল একটা ছোট হরিণ মেরে। টিবস্ সেটাকে কেটে-কুটে আগুনে ঝলসাতে শুরু করে দিল। অন্যরা চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
সকলেই অল্পস্বল্প পেটে দিয়ে আগুনের পাশে শুয়ে পড়ল। জেগে রইল কেবল টিবস্। স্থির হল, পুরুষরাই একের পর এক রাত জেগে পাহারা দেবে।
ভোর চারটের সময় পাহারার দ্বিতীয় পালা শেষ করে টিবস্ ডেকে দিল এলেক্সিসকে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে সবরভ ধুনিতে আরও কাঠ চাপিয়ে দিল। তারপর সেদিকে পিছন ফিরে রাতের অন্ধকারে চোখ রাখল।
ভয় পেয়ে জঙ্গলের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে ঘুমন্ত সঙ্গীদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। ব্রাউনের পাশে রাখা হাত-কুড়ালটার দিকে নজর পড়ল। সেখান থেকে দৃষ্টি সরে গেল জেনের উপর। কি অপরূপ সুন্দরী।
হঠাৎ এলেক্সিসের মনে হল, এই লোকটা যদি মারা যেত তাহলে তার নিজের জীবন নিরাপদ হত-তার আর জেনের মাঝখানে দাঁড়াবার কেউ থাকত না।
উঠে পায়চারি করতে করতে সে বারে বারে ব্রাউন ও তার কুড়ালটার দিকে তাকাতে লাগল।
টিবসের কাছে গিয়ে কান পাতল। লোকটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জেন ঘুমিয়ে পড়েছে। ব্রাউনও।
ব্রাউন যদি মারা যেত। হঠাৎ একটা সংকল্প স্বরভের মনের মধ্যে শানিত হয়ে উঠল। চুপি চুপি এগিয়ে গেল ঘুমন্ত ব্রাউনের দিকে। তারপর এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসল। খুব সাবধানে তার একটা হাত এগিয়ে গেল কুড়ালটার দিকে।
হঠাৎ টিবসের ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, উদ্যত কুড়াল হাতে সবরভ ব্রাউনের উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। চীৎকার করে সে লাফিয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে সবরভ টিবসের দিকে চোখ ফেরাল। আর তাতেই ব্রাউনের জীবন রক্ষা পেল।
টিবসের চীৎকার শুনে জেনও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্রাউন মনস্থির করার আগেই সবরভ কুড়ালটা তুলে নিয়ে জঙ্গলের দিকে দৌড় দিল।
ব্রাউন তার পিছু নিতেই জেন বাধা দিয়ে বলল, ওর পিছু নিও না। কি লাভ হবে? এমনিতেই তো ওর হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেলাম; ও আর ফিরে আসার সাহস পাবে না। বরং তুমি ওর পিছু নিলে আমরা সংখ্যায় কমে যাব।
ব্রাউন ঘুরে দাঁড়াল। হয়তো আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু মৃত্যুই ওর পাওনা ছিল।
এই জঙ্গলে একলা থাকলে সেটা ও এমনিতেই পাবে। জেন যেন ভবিষ্যদ্বাণী করল।
তিনজন আবার পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করল। ঠিক সেই সময় সামান্য দূরের একটা গাছের পাতার আড়াল থেকে একজোড়া চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে; দুটি মিটমিটে শয়তানী চোখ দুটি পুরুষের উপর থাকলেও তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে জেনের উপর।
