সর্দারের কুটিরের সামনে রাস্তায় তখন মাতাল আদিবাসীদের জমায়েত চলছে। তাদের দৃষ্টিকে এড়িয়ে টারজান ও অন্য ওয়াজিরিরা মিলে তিন বুকেনা সৈনিককে কাঁধে করে নিয়ে গেল সেই কুটিরের এক কোণে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাছের কাছে। তাদের একজনকে কাঁধে নিয়েই টারজান গাছে উঠে গেল। ধীরে ধীরে তাদের তিনজনকেই সমবেত নিগ্রোদের ঠিক মাথার উপরকার একটা চওড়া ডালে আরও ঘন পাতার আড়ালে নিয়ে শুইয়ে দিল।
তারপর তাদের মধ্যে একজনের গোড়ালির বেড়ির সঙ্গে নিজের দড়িটা বেঁধে তার মুখ থেকে কাপড়ের টুকরোটা বের করে নিয়ে মাথাটা নিচের দিকে রেখে টারজান তাকে মাটির দিকে নামিয়ে দিল। লোকটির মাথা পাতার আড়াল ভেদ কের নিচের নিগ্রোদের দৃষ্টিগোচর হবার আগেই টারজান-এর গলা থেকে বেরিয়ে এল গোরিলার সতর্ক-ধ্বনি। সঙ্গে সঙ্গে নাচ-গান থেমে গেল; নিগ্রোরা সভয়ে ইতস্তত তাকাতে লাগল।
চারদিকে নিস্তব্ধ। মাথার উপরকার পাতার ফাঁকে দেখা দিল তাদেরই একজনের মুণ্ড; ধীরে ধীরে তার দেহটাও নেমে এল। এ ধরনের রহস্যময় অলৌকিক ঘটনা তাদের জীবনে এর আগে কখনও ঘটে নি।
উপর থেকে ভেসে এল একটা গভীর কণ্ঠস্বর। আমি অরণ্যরাজ টারজান। ফটক খুলে আমার ওয়াজিরি লোকদের নিরাপদে যেতে দাও, নইলে টারজনের হাতে তোমাদের অনেকে মারা পড়বে।
এতক্ষণে ঝুলন্ত নিগ্রোটির মুখে কথা ফুটল, ফটক খুলে দাও; ওদের যেতে দাও; নইলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
নিগ্রোরা ইতস্তত করতে লাগল।
উদালো হুকুম দিল, ওয়াজিরিদের সব অস্ত্র এনে দাও; ফটক খুলে দাও; ওদের বেরিয়ে যেতে দাও।
টারজান বুকেনা সৈনিকটিকে টেনে তুলে তার সঙ্গীদের পাশেই শুইয়ে দিল।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক; তোমাদের কাউকে মারব না। এই কথা বলে মাটিতে নেমে টারজান ওয়াজিরিদের সঙ্গে যোগ দিল।
তারা নির্ভয়ে হেঁটে চলল। নিগ্রোরা সভয়ে তাদের জন্য পথ করে দিল।
উদালো বলল, আমার সৈনিক তিনজন কোথায়?
টারজান উত্তরে জানাল, তোমাদের ঘরের উপরকার গাছের ডালে তাদের তিনজনকেই জীবিত অবস্থায় পাবে। সর্দারের আরও কাছে গিয়ে বলল, দেখ উদালো, কোন বিদেশী যখন তোমাদের গাঁয়ে আসে, তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করো-বিশেষত টারজান ও ওয়াজিরিদের সঙ্গে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা বেড়ার ওপারের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ওঝা গুপিংগুর মেয়ে নৈকা হাততালি দিয়ে নাচতে নাচতে বলতে লাগল, এই তো সে! এই সাদা সৈনিকটিই তো আমাকে বাঁচিয়েছিল। সে যে দলবল নিয়ে চলে গেছে এতে আমি খুব খুশি হয়েছি।
পরদিন দুপুর। ওয়াজিরিরা শিবির ফেলেছে একটা নদীর ধারে। একটা গাছে হেলান দিয়ে টারজান কিছু তীর তৈরি করছে।
একসময় টারজান মাথাটা তুলে দক্ষিণ দিকে তাকাল। বলল, কে যেন আসছে।
অনেক দূরে লোকটিকে দেখা গেল। তার মাথায় ওয়াজিরিদের সাদা পালক উড়ছে; হাতে একটা লাঠি; তার একটা মাথা চিরে দু’ভাগ করে তার ফাঁকে একটা খাম বসানো হয়েছে।
লোকটি কাছে এসে খামটা টারজানকে দিল।
খাম খুলে পড়তে পড়তে টারজনের মুখে মেঘ নেমে এল।
মুভিরো শুধাল, কোন খারাপ খবর কি বাওয়ানা?
টারজান বলল, মেমসাব একটা বিমানে লন্ডন থেকে নাইরোবী যাত্রা করেছে; আর ঠিক সেই বড় ঝড়টার আগে। তোমার মনে আছে মুভিরো, ঝড়ের ঠিক পরে একটা উড়োজাহাজ আমাদের মাথার উপরে পাক খাচ্ছিল? আমরা তখনই ভেবেছিলাম যে জাহাজটা খুব বিপদে পড়েছে। হয় তো সেই। জাহাজেই মেমসাব ছিল।
মুভিরো বলল, একটু পরেই জাহাজটা চলে গেল। হয় তো সেটা নাইরোবী চলে গেছে।
টারজান বলল, তা হতে পারে। তবে ঝড়টা ছিল খুবই খারাপ, আর পাইলটও পথ হারিয়ে ফেলেছিল। কোন বিপদে পড়েই সে একটা নামবার মত জায়গা খুঁজছিল; নইলে ওভাবে পাক খেয়ে ঘুরত না।
মুভিরো প্রশ্ন করল, তুমি কি এখনই নাইরোবী ফিরে যাবে বাওয়ানা?
তাতে লাভ কি হবে? টারজান উত্তর দিল।
মুভিরো শুধাল, আমরা কি তাহলে আমার মেয়ে বুইরার খোঁজেই চলতে থাকব?
টারজান বলল, হ্যাঁ। সকলেই খুব ক্লান্ত।
চলতে চলতে বেলা পড়ে এল। টিস, এলেক্সিস ও আনেৎ খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাই একটা সুবিধামত জায়গায় পৌঁছে জেন সকলকে থামতে বলল রাতের মত। একটা ধুনি জ্বালিয়ে সকলে পালা করে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল কেউ পাহারায় নেই। আনেও চলে গেছে।
আনেৎ শিবিরে নেই। অভিযাত্রীরা সকলেই কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
জেন বলল, তার কি হতে পারে? আমি জানি সে জঙ্গলে বেড়াতে যায় নি। জঙ্গলকে সে ভয় করে।
ব্রাউন ধীরে ধীরে স্বরভের দিকে এগিয়ে চলল। তার মনে খুন চেপেছে; চোখে তারই স্ফুলিঙ্গ-দীপ্ত। বলল, আপনিই জানেন সে কোথায়। বলুন, তাকে কি করেছেন?
দুই হাত তুলে পিছনে সরে গিয়ে সবরভ বলল, আমি কিছু জানি না। আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম।
ব্রাউন বলল, আপনি মিথ্যেবাদী।
সবরভ চেঁচিয়ে বলল, দূরে সরে যাও। জেন, ওকে আর এগোতে দিও না; ও আমাকে মেরে ফেলবে।
ব্রাউন হুংকার দিয়ে উঠল, ঠিক বলেছেন; আমি আপনাকে খুন করব।
সবরভ মুখ ঘুরিয়ে দৌড়াতে শুরু করল।
ব্রাউন এক লাফে তার পিছু নিল। ডজন খানেক পা ফেলেই ভয়ার্ত লোকটিকে ধরে ফেলল। তার কাঁধ চেপে ধরল। বেপরোয়া হয়ে সবরভও আঁচড়ে-কামড়ে, ঘুষি মেরে তাকে বাধা দিতে লাগল। কিন্তু মার্কিনীটি তাকে মাটিতে ফেলে তার গলা চেপে ধরল।
