স্টিম্বল বলল, আমি পশ্চিম দিকে গিয়ে উপকূলে পৌঁছতে চাই।
ব্লেক বলল, আমি উত্তর দিকে গিয়ে কিছু সিংহের ছবি তুলতে চাই। এখন যদি স্টিম্বলের সঙ্গে কোন লোক না যায় তাহলে আমাদের সঙ্গেই যেতে হবে এবং তাহলে ছবি না তুলেই সোজা উপকূলে চলে যাব।
টারজান স্টিলের কথায় কান না দিয়ে বলল, আগামীকাল রওনা হবে তোমরা। আমি ঠিক সময়ে আসব। সঙ্গের লোকেরা যাতে দু’দলে ভাগ হয়ে ঠিকমত যায় আমি তার ব্যবস্থা করব। তোমাদের কিছু ভাবতে হবে না।
এই কথা বলে বনের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল টারজান।
পরদিন সকালে মালপত্র গুছিয়ে যাবার জন্য রওনা হতেই টারজান এসে পড়ল।
টারজান নিগ্রোভৃত্যদের এক জায়গায় ডেকে বলল, আমি হচ্ছি টারজান, এই বনের অধিপতি। তোমরা এই শ্বেতাঙ্গদের আমার দেশে আমার লোকজনদের মধ্যে নিয়ে এসেছ। তারা আমার লোকজনদের মারে, বনের জীবজন্তু মেরে বেড়ায়। যাই হোক, তোমরা যদি নিরাপদে গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে যেতে চাও তাহলে আমার কথা শোন।
এরপর নিগ্রোভৃত্যদের সর্দারকে টারজান বলল, তুমি ব্লেকের সঙ্গে যাবে। তাকে বনের জীবজন্তুদের কিছু ছবি তোলার অনুমতি দিচ্ছি আমি। তোমার দল থেকে অর্ধেক লোক বাছাই করে দাও। তারা যাবে স্টিম্বলের সঙ্গে। তবে স্টিম্বল একমাত্র আহার ছাড়া কোন প্রাণী বধ করতে পাবে না।
এরপর ব্লেকের দিকে ফিরে বলল, তুমি আমার অতিথি। সুতরাং ইচ্ছা করলে শিকার করতে পার।
স্টিম্বল রেগে গিয়ে ব্লেককে বলল, তুমি এই বোকা শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে বলে দাও আমি কে এবং আমি কিছুতেই তার এই সব হুকুম মেনে চলব না।
সেদিকে কান না দিয়ে টারজান স্টিম্বলের দলের লোকদের বলল, দেখবে এই ব্যক্তি যেন আমার আদেশ মত চলে। না চললে ওর দলে তোমরা থাকবে না।
এই কথা বলে টারজান জঙ্গলের ভিতরে চলে গেল।
অন্ধকার নেমে এল সারা বনভূমি জুড়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। টারজান যে গাছটার তলায় দাঁড়িয়েছিল সেই গাছটা হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ে যেতে তার ডালপালায় আঘাত লেগে চাপা পড়ে গেল। সে অচেতন হয়ে পড়ল। অদূরে সেই বোলগানিটা দাঁড়িয়েছিল।
টারজনের বুকের উপর কান পেতে স্টিম্বল দেখল তার দেহে প্রাণ আছে, সে মরেনি। তখন টারজানকে হত্যা করার জন্য তার ছুরিটা বার করল। বোলগানি বা গোরিলাটা এতক্ষণ দেখছিল ব্যাপারটা। স্টিম্বল ছুরিটা টারজনের বুকের উপর তুলতেই বোলগানি এক লাফে সেখানে গিয়ে স্টিম্বলের গলার উপর একটা হাত রাখল। সে তার গলা টিপে হত্যা করতে যাচ্ছিল তাকে।
এমন সময় চেতনা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকাল টারজান। মুহূর্তমধ্যে সমস্ত ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরে বোলগানিকে বলল, ওকে যেতে দাও।
টারজান স্টিম্বলকে বলল, আমি এখানে ছিলাম দুটো কারণে। আমি লক্ষ্য করছিলাম তুমি আমার আদেশ মেনে চলছ কি না। আর দেখছিলাম তোমরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে আমার কোন ক্ষতি করছ কি না। কিন্তু তুমি আমায় হত্যা করতে যাচ্ছিলে। তোমাকে হত্যা করাই উচিৎ। তবু আমি তোমাকে মারব না।
এবার স্টিম্বলের নিগ্রো মালবাহকদের বলল, এই শ্বেতাঙ্গ যতক্ষণ আমার আদেশ মেনে চলবে ততক্ষণ এর সঙ্গে থাকবে। তবে দেখবে এ যেন কোন শিকার না করে।
এই কথা বলে চলে গেল টারজান।
স্টিম্বল যখন বুঝল টারজান আর আসবে না তখন সাহস পেয়ে আবার খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। তার নিগ্রোভৃত্যদের সঙ্গে। সে টারজনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একটা হরিণ শিকার করল অকারণে। তবে তার নিগ্রোভৃত্যরা রেগে গেল।
স্টিম্বল ভাবল সে এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর ব্লেকের সন্ধানে বার হবে। সে একটা সিগারেট ধরাল।
স্টিম্বল একটা গাছে ঠেস দিয়ে বসে ছিল। সহসা একটা শব্দ শুনে চমকে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঝোপের ওপারে কালো কেশর ওয়লা একটা সিংহ দেখতে পেল। স্টিম্বল ভয়ে একটা গাছের উপর চড়ল। সিংহটা লাফ দিয়ে স্টিম্বলকে ধরতে গেল, কিন্তু পারল না। স্টিম্বল গাছে ওঠার সময় রাইফেল আর খাবারের মোটটা গাছের তলায় ফেলে যায় কিন্তু স্টিম্বলকে না পেয়ে সিংহটা রেগে গিয়ে খাবারের পুঁটলিটা ছিঁড়ে খুঁড়ে সব খাবার নষ্ট করে দিল। তারপর মুখে করে রাইফেলটা তুলে নিয়ে চলে গেল।
স্টিম্বল গাছের উপর থেকে চীৎকার করতে লাগল।
কিন্তু সিংহটা রাইফেলটা মুখে করে সোজা একটা ঝোপের মধ্যে চলে গেল।
সে রাতটা গাছেই কাটাল স্টিম্বল। পরের দিন সকালে সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নেমে এল গাছ থেকে। তারপর ধীর পায়ে সে যখন ব্লেকের পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল। তার বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে।
এদিকে ব্লেক সেদিন তার একজন নিগ্রোভৃত্যকে নিয়ে সিংহের ছবি তোলার জন্য মূল দল থেকে কিছুটা দূরে চলে গিয়েছিল। বনে ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে তারা একটা জায়গায় একটা বড়ো সিংহ, একটা সিংহী আর চার-পাঁচটা বাচ্চা দেখতে পেল। কিন্তু তাদের দেখতে পেয়ে সিংহগুলো সরে গেল। তখন আকাশে কালো মেঘ থাকায় উপযুক্ত আলো না পেয়ে ছবি তুলতে পারল না ব্লেক।
তখন জনপদের আশায় আরো কিছুটা এগিয়ে গেলে পথের ধারে পাথরের আড়াল থেকে দু’জন নিগ্রো এসে তার পথরোধ করে দাঁড়াল।
তাদের কথাবার্তা থেকে ব্লেক জানতে পারল তাদের দুজনের মধ্যে একজনের নাম পিটার আর অন্যজনের নাম পল বোদকিন। পল বোদকিন তার সঙ্গীকে বলল, এই লোকটাকে দেখে সারাসীন জাতীয় বলে মনে হচ্ছে। এর ভাষা বুঝতে পারা যাচ্ছে না। একে আমাদের ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে চল।
