টারজান দেখল বোলগানি বা গোরিলাটা যে পথে ছুটছিল সেই পথের ধারে একটা গাছে একটা বড় অজগর রয়েছে। প্রাণ ভয়ে পালাতে গিয়ে সাপটাকে দেখতে পায়নি গোরিলাটা। এখন গোরিলাটা ডালপালা ভেঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করতে করতে ছুটতে থাকায় অজগরটা তাকে কাছে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। গোরিলাটা তার কুণ্ডলি থেকে নিজেকে মুক্ত করার যতই চেষ্টা করতে লাগল সাপটা ততই জোরে চেপে ধরল তার দেহটাকে।
এমন সময় স্টিম্বল আর টারজান একই সময়ে হাজির হলো সেখানে। টারজান দেখল একজন শ্বেতাঙ্গ শিকারী রাইফেল তুলে ধরে একই সঙ্গে গোরিলা আর অজগর সাপটাকে মারতে যাচ্ছে।
টারজান যখন দেখল শ্বেতাঙ্গ শিকারী স্টিম্বলই গোরিলাটার এই অবস্থার জন্য দায়ী তখন সে স্টিম্বলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ফেলে দিল মাটিতে। স্টিম্বল উঠে দাঁড়াবার আগেই টারজান তার ছুরিটা কেড়ে নিয়ে সাপটার কাছে গিয়ে আঘাত করতে লাগল তাই দিয়ে। সাপটার গায়ে ছুরিটা আমূল বসিয়ে দিতেই সাপটা গোরিলাটাকে ছেড়ে টারজানকে জড়িয়ে ধরতে লাগল। টারজান সাপটার গলাটা টিপে ধরে ক্রমাগত তার গায়ের বিভিন্ন জায়গায় ছুরিটা বসাতে লাগল। অবশেষে তার মাথাটা কেটে দিল।
গোরিলাটা জোর আঘাত পেয়েছিল। সে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। টারজান তাকে বলল, আমি বাঁদর-দলের টারজান। তোমাকে হিন্তা অর্থাৎ সাপের কবল থেকে বাঁচালাম।
গোরিলাটা ভেবেছিল টারজান এবার তাকে মারবে। সে ভয়ে ভয়ে টারজানকে বলল, তুমি আমাকে বধ করবে না?
টারজান বলল, না আমরা এখন বন্ধু।
গোরিলাটা তখন বলল, আমাদের পিছনে যে টারমাঙ্গানীটা রয়েছে সে আমাদের দু’জনকেই ঐ বজ্র ভরা লাঠিটা দিয়ে হত্যা করবে।
টারজান বলল, না, ওকে আমি এখান থেকে তাড়িয়ে দেব।
স্টিম্বল এতক্ষণ সবকিছু দেখছিল দাঁড়িয়ে। গোরিলাটার সঙ্গে টারজনের যে সব কথা হচ্ছিল তা সে বুঝতে পারছিল না। টারজান তার কাছে ফিরে এলে সে বলল, তুমি সরে যাও, এবার আমি গোরিলাটাকে বধ করব।
স্টিম্বল আর গোরিলাটার মাঝখানে এসে দাঁড়াল টারজান। বলল, তোমার রাইফেল নামাও।
স্টিম্বল বলল, মোটেই না, আমি কি শুধু শুধুই এতক্ষণ ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিলাম? তুমি জান আমি কে? আমি হচ্ছি উইলবার স্টিম্বল। স্টম্বল এ্যান্ড কোম্পানি, নিউইয়র্ক-এর মালিক।
টারজান বলল, আমার এই দেশে কি করছ?
স্টিম্বল বলল, তোমার দেশ! তুমি কে?
টারজান তখন স্টিম্বলের নিগ্রো যোদ্ধাদের পানে তাকিয়ে বলল, আমি হচ্ছি টারজান। এই শ্বেতাঙ্গ এ দেশে কি করছে? এরা সংখ্যায় কত?
নিগ্রোরা তখন বলল, আমরা তোমাকে চিনি বড় বাওয়ানা। এরা সংখ্যায় আছে দু’জন। আমরা এদের কাছে কাজ করি। এরা শিকার করে বেড়ায়। এই লোকটা বড় খারাপ ব্যবহার করে আমাদের সঙ্গে। এখানে শিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কালই ওরা চলে যাবে এখান থেকে।
টারজান আবার জিজ্ঞাসা করল, এদের শিবিরটা কোথায়?
নিগ্রোরা বলল, এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
টারজান এবার স্টিম্বলকে বলল, তোমাদের শিবিরে ফিরে যাও। আমি সন্ধ্যার সময় তোমাদের শিবিরে গিয়ে কথা বলব তোমাদের সঙ্গে। এখন শুধু খাবার মত শিকার করে নিয়ে চলে যাও।
স্টিম্বলের যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু টারজনের ব্যক্তিত্ব আর তার কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে ভয় হলো তার। টারজান চলে গেলে সে তার লোকদের বলল, আজ সারা দিনটাই মাটি হয়ে গেল। লোকটা কে?
নিগ্রোরা বলল, মালিক ও হচ্ছে টারজান, এই বনের রাজা। ওর কথাই হলো আইন। ওকে রাগিও না।
শিবিরে ফিরে এসে স্টিম্বল বলল, কিন্তু সেই বাঁদর লোকটা যখন আমার স্বরূপটা বুঝতে পারবে তখন আর সে উইলবার স্টিম্বলের ব্যাপারে নাক গলাতে আসবে না।
ব্লেক বলল, সে আমাদের এখানে আসবে। তাই হবে, তার সঙ্গে দেখা হবে। তার কথা আমি অনেক শুনেছি।
স্টিম্বল বলল, এই যে আমাদের লোকরা এসে গেছে।
সে তখন নিগ্রো কুলীদের লক্ষ্য করে বলতে লাগল, আমরা এবার থেকে দু’জনে ভাগ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের মালপত্র সব ভাগ হয়ে গেছে। আমি পশ্চিম দিকে গিয়ে কিছুদিন শিকার করার পর সমুদ্র উপকূলে যাব। ব্লেক কোন দিকে যাবে তা আমি জানি না। তোমাদের মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক লোক ব্লেকের সঙ্গে যাবে আর বাকি অর্ধেক আমার সঙ্গে যাবে। যারা ব্লেকের সঙ্গে যেতে চাও তারা তার কাছে গিয়ে দাঁড়াও।
এমন সময় হঠাৎ টারজান সেখানে এসে উপস্থিত হলো। শিবিরে যে আগুন জ্বলছিল তার আভায় ব্লেক টারজনের চেহারাটা দেখতে পেল।
স্টিম্বল বলল, সেই বুনো মানুষটা এসেছে।
ব্লেক টারজানকে বলল, তুমিই বাঁদর-দলের টারজান ত?
টারজান বলল, হ্যাঁ, তুমি?
ব্লেক বলল, আমি হচ্ছি নিউইয়র্কের জিম ব্লেক।
টারজান বলল, শিকার করে বেড়াচ্ছ?
ব্লেক বলল, আমার সঙ্গে সচল ছবি তোলার একটা ক্যামেরা আছে। আফ্রিকার বন্য জীবনের কিছু চলমান ছবি তুলতে চাই।
টারজান বলল, তোমার সঙ্গী একটা রাইফেল ব্যবহার করছিল।
ব্লেক বলল, তার কাজের জন্য আমি দায়ী নই।
টারজান বলল, আমি তোমাদের কথাবার্তা শুনেছি। নিগ্রোরা তোমার সঙ্গী সম্বন্ধে আমাকে কিছু কথা বলেছে। তোমরা দুজনে একমত হতে পারছ না বলেই পৃথকভাবে যেতে চাইছ। তাই নয় কি?
ব্লেক বলল, হ্যাঁ।
টারজান বলল, তোমরা কে কোনদিকে যেতে চাও?
