জেন বলল, আমাদের দলে লোক এত কম, আর আমাদের অস্ত্রপাতি এতই যৎসামান্য যে আমাদের একসঙ্গে চলাই উচিত।
বিমান-চালক বলল, আপনাদের বিপদের মুখে ফেলে আমি যাব না মিস; আনেৎ ও আপনি যতক্ষণ নিরাপদ না হচ্ছেন ততক্ষণ আমি আপনাদের সঙ্গেই থাকব।
আমি জানতাম তুমি থাকবে, কিন্তু এবার আমাদের আর একটা কর্তব্য পালন করতে হবে-বড়ই অপ্রীতিকর কর্তব্য। প্রিন্সেসকে সমাধিস্থ করতে হবে।
মৃতদেহকে কবরে শুইয়ে দেয়া হল। সকলে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। আনেৎ কেবলই কাঁদতে লাগল। দুঃখে বুক ফেটে গেলেও জেনের চোখে জল নেই। তার সামনে অনেক কর্তব্য; ব্যক্তিগত দুঃখে সময় কাটানো তার চলবে না।
সে বলল, সব তো হয়ে গেল, এবার শিবির ভেঙে দেয়া হোক; এখানে কেউ আর থাকতে চাইবে না।
আনেৎ রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্য সকলেই যার যার জিনিস পত্তর গুছিয়ে নিতে গেল।
ধুনির কয়লায় মাংস ঝলসাতে দগ্ধাবশেষ কয়লার মধ্যে একটা জিনিস তার নজরে পড়ল। ধুনির কিনারায় এক টুকরো পোড়া কাপড়–তাতে তিনটে বোতাম লাগানো। একটা লাঠি দিয়ে সে কাপড়টা উল্টে দিল। কাপড়ের যে দিকটা নিচে ছিল সে দিকটা পোড়ে নি-রং ও নক্সা ঠিক আছে।
কাপড়টা যেন পরিচিত মনে হল; চিন্তা করতে গিয়ে তার চোখ দুটো অর্ধেক বুজে এল।
ব্রাউন এসে হাজির হল। বলল, রান্নার বাকিটা আমি শেষ করছি, তুমি বরং ততক্ষণে তোমার জিনিসপত্তর গুছিয়ে নাওগে।
আনেৎ বলল, ঠিক আছে; তুমি বরং এটা একবার ভাল করে দেখো। হাতের লাঠি দিয়ে সে ধুনির পাশের কাপড়ের টুকরোটা দেখাল।
ব্রাউন টুকরোটা তুলে ভাল করে দেখল। তার পর প্রিন্স এলেক্সিস্ স্বরভের দিকে তাকিয়ে একটা শিস্ দিল। তাকে খুব খুশি দেখাচ্ছে।
সকলকে ডেকে বলল, আপনারা আসুন। সব তৈরি।
সকলে এসে আগুনের পাশে বসল। ধুনির পাশে গাছের পাতা পেতে ব্রাউন মাংসের টুকরোগুলো সাজিয়ে রেখেছে।
ব্রাউন বলল, সকলে আরও ঘন হয়ে বসুন।
এলেক্সিস্ মাংসের একটা টুকরোয় কামড় দিয়েই বলল, কী সাংঘাতিক! এর তো একটা দিক পুড়ে গেছে। আরেকটা দিক কাঁচাই আছে। এ রকম রান্না আমার পেটে সহ্য হবে না। আমি খাব না।
ব্রাউন বলল, তা খেতে হয় খান। কিন্তু গ্র্যান্ড ডিউককে আমি একটা প্রশ্ন করছি। দেখতেই পাচ্ছি তিনি কোটটা বদলেছেন। কাল রাতে খুব সুন্দর একটা কোট তিনি পরেছিলেন। ভাবসাব দেখ মনে হচ্ছে সেটা তিনি আর পরবেন না। তার কাছ থেকে আমি সেটা কিনে নিতে চাই।
এলেক্সিস্ দ্রুত চোখ তুলল, মুখটা ম্লান। বলল, পুরনো পোশাক আমি বিক্রি করি না। পরা শেষ হলে তোমাকে দান করে দেব।
ব্রাউন বলল, সে তো আপনার কৃপা। কোটটা একবার দেখতে পারি কি? গায়ে দিয়ে দেখতাম মাপে ঠিক হয় কি না।
এখন তো হবে না বাবা; অন্য সব জিনিসের সঙ্গে সেটাও প্যাক করা হয়ে গেছে।
সবটা? ব্রাউন প্রশ্ন করল।
সবটা? কি বলছ? সবটা তো বটেই।
তাই বুঝি? কিন্তু একটা টুকরো প্যাক করতে যে ভুলে গেছেন মিস্টার। ব্রাউন তিন-বোতামওয়ালা অংশটা তুলে ধরল।
স্বরভের মুখটা ভূতের মত সাদা হয়ে গেল। দুই চোখ বড় বড় করে কাপড়ের টুকরোটাকে দেখতে লাগল।
বলল, এ যে দেখছি মার্কিনী তামাসার আর এক নমুনা। ও টুকরোটা আমার কোটের নয়।
ব্রাউন বলল, কাল রাতে যে কোটটা আপনি পরেছিলেন এটা হুবহু সেই রকম দেখতে। আনেতেরও তাই ধারণা। তবে টিবসের এটা চেনা উচিত; সে তো আপনার খানসামা। কি হে টিবস, এটা আগে। কখনও দেখেছ?
টিবস্ এগিয়ে এসে কাপড়ের টুকরোটা উল্টে পাল্টে দেখল; আঙ্গুল দিয়ে ছাইটা ঝেড়ে ফেলল।
শেষ কখন সেটা দেখেছ? ব্রাউন জোর গলায় প্রশ্ন করল।
আমি-সত্যি-সভয়ে সে সুবরভের দিকে তাকাল।
প্রিন্স চীৎকার করে উঠল। তুমি মিথ্যেবাদী টিবস্। ও রকম কোট কোন কালে আমার ছিল না। কোন দিন চোখেও দেখি নি। বল, ওটা আমার নয়।
ব্রাউন বলল, টিবস্ কিছুই বলে নি। এটা যে আপনার কোটেরই টুকরো তাও বলে নি। কিন্তু এবার বলবে। কি বল টিবস্?
টিবস্ বলল, এটা সেইরকম দেখতে।
এলেক্সিসের মুখের উপর চোখ রেখে ব্রাউন বলল, মিসেসের মাথায় আঘাত করার সময় নিশ্চয় ফিকি দিয়ে রক্ত ছুটে কোটটাকে ভিজিয়ে দিয়েছিল।
এলেক্সিস্ আর্তকণ্ঠে বলল, খবরদার! ঈশ্বরের দোহাই, খবরদার। আমি বলছি, তার গায়ে আমি হাতও দেই নি।
ব্রাউন বলল, এ কথা জজকেই বলবেন। আনেৎ, তুমি এই সাক্ষীই দিও; জজ নিশ্চয় এটার কথাই জানতে চাইবেন।
ততক্ষণে এলেক্সিস্ আবার আত্মসংযম ফিরে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি বলল, এটা আমার কোটই ছিল; আমার সামনের ভিতর থেকে কেউ চুরি করেছে।
জেন বলল, পুরো ব্যাপারটাই আদালতের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক।
ব্রাউন মাথা নেড়ে বলল, বরাবরের মত এবারও আপনার কথাই ঠিক মিস।
খুব ভাল কথা। সকলের খাওয়া শেষ হয়ে থাকলে এবার আমরা যাত্রা করব। আমাদের শিবিরের গায়ে আমি একটা চিরকুট লটকে রেখে এসেছি। তাতে এই দুর্ঘটনা, আমাদের গতিবিধি এবং দলের সকলের নাম লিখে দিয়েছি। যদি কখনও কোন শ্বেতকায় শিকারীর দল এই পথে আসে তাহলে তারা এ খবরটা বাইরে পৌঁছে দিতে পারবে। সকলে প্রস্তুত?
এলেক্সিস্ বলল, প্রস্তুত।
তিন বুকেনা সৈনিক হামাগুড়ি দিয়ে কুটিরে ঢুকতেই টারজান সর্বশেষ সৈনিকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার কঠিন আঙুলগুলো সৈনিকটির গলায় ফাঁসের মত চেপে বসল। প্রায় একই সময়ে মুভিরো ও তার দলবল অপর দু’জন সৈনিককেও মাটিতে ফেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে তিনজনেরই হাত-পা বেঁধে ফেলা হল।
