সবরভ দ্রুত চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। জেন বলল, এখানে কিছু নেই।
এলেক্সিস বলল, টিবসের বিছানাতেও কিছু পেলাম না। কিন্তু আনে, তুমি হয় তো ব্রাউনের বিছানাটা ভাল করে দেখ নি। আমি একবার দেখছি।
এক পা এগিয়ে আনেৎ বলল, কি হবে তাতে? ওখানে কিছু নেই; বৃথা সময় নষ্ট হবে।
তবু আমি একবার দেখব, এলেক্সিস বলল।
সবরভ নিচু হয়ে ঘাসের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল। বেশি সময় লাগল না। বলে উঠল, এই তো পেয়েছি। তুমি যে কি খুঁজেছ আনেৎ তা তুমিই জান।
ঘাসের ভিতর থেকে টাঙ্গিটা বের করে প্রিন্স সকলের চোখের সামনে তুলে ধরল। টাঙ্গিটা রক্তমাখা।
বলল, এবার সন্তুষ্ট হলেন তো জেন?
জেন বলল, ব্রাউনের বেলায় এটা আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
দেখুন, এ কাজ কে করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণ তো পেলেন। এবার বলুন, কি করবেন? লোকটাকে এখনই শেষ করে দেয়া উচিৎ।
ব্রাউন শক্ত গলায় বলল, কাকে শেষ করে দেয়া উচিৎ? সে আর টিবস্ তখন দরজায় দাঁড়িয়ে।
জেন বলল, টাঙ্গিটা তোমর বিছানার নিচে পাওয়া গেছে ব্রাউন। সেটা প্রিন্সের হাতেই তাছে। দেখতেই পাচ্ছ টাঙ্গিটা রক্তমাখা।
ওঃ, তাহলে তুমিই ওটাকে আমার বিছানার নিচে রেখে দিয়েছিলে, তই না ব্যাটা হতচ্ছাড়া বেঁটে বামন? আমাকে গাড়ায় ফেলার চেষ্টা?
সপ্রশ্ন চোখে ব্রাউন একে একে সকলের দিকেই তাকাল। তবে কি এরা বিশ্বাস করেছে যে আমি এ কাজ করেছি? সে বুঝতে পারছে, যত তুচ্ছই হোক প্রমাণটা তারই বিরুদ্ধে।
বলল, কিন্তু একথা মনেও এনো যে তোমরা আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারবে।
জঙ্গলের পথে চলতে চলতে এক জায়গায় টারজান ঘুমন্ত অবস্থায় ওঝা গুপিংগুর মেয়ে নৈকাকে দেখতে পেয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে হাজির হল বুকেনাদের গ্রামে।
নৈকা আনন্দে হাততালি দিতে লাগল। টারজান বলল, নৈকা, এবার তুমি নিরাপদ। নির্ভয়ে ফিরে যাও; সেখানে সকলকে বলল যে অরণ্যরাজ টারজান তাদের শত্রু নয়।
বলেই সে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু তার আগেই দুটি ছোট চোখের দৃষ্টিকে সে এড়াতে পারল না। নৈকা যখন আনন্দে চেঁচাতে চেঁচাতে গ্রামের ফটকের দিকে ছুটে গেল, তখনই ছোট্ট নকিমা ডালে-ডালে দোল খেতে খেতে এক সময় লাফিয়ে পড়ল তার মনিবের কাঁধে।
হঠাৎ টারজনের কানের কাছে কিচির-মিচির করতে করতে নকিমা তার কাঁধের উপর লাফাতে শুরু করল।
টারজান বলল, আমার কানের কাছে নকিমার এত দাপাদাপি কেন? কি হয়েছে?
নকিমা চেঁচিয়ে বলল, ওয়াজিরি! ওয়াজিরি!
টারজান চকিতে মুখ ফেরাল। ওয়াজিরি কি? তারা তো এখানে নেই।
নকিমা বলল, তারা ওখানে আছে। গোমাঙ্গানিদের গায়ে। তাদের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। যে ঘরে টারজানকে রেখেছিল তাদেরও সেখানেই রেখেছে। গোমাঙ্গানিরা তাদের মেরে খেয়ে ফেলবে।
টারজান চমকে উঠল। ফিফিস্ করে বলল, টারজান যাবে উদালোর গাঁয়ে।
দু’জন গ্রামের পিছন দিকে মাটিতে নামল। গ্রামবাসীরা সকলেই তখন ভিড় করেছে সর্দার উদালোর বাড়ির সামনের রাস্তায়। গ্রামের পিছনটা তাই অন্ধকার ও নির্জন।
এক লাফে বেড়া ডিঙিয়ে ছায়ার মত নিঃশব্দে দু’জন সর্দারের বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
সর্দারের কুটিরের পিছনে টারজান মাটিতে নামল।
যে ঘরে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল দ্রুত সেখানে পৌঁছে ভিতরে ঢুকে পড়ল। নাকই তাকে বলে দিল ওয়াজিরিরা সেখানেই আছে। ফিফিসিয়ে বলল, চুপ। আমি টারজান। ওরা তোমাকে নিতে আসছে। আমি তোমাদের বাঁধন কেটে দিচ্ছি। ওরা আসামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের অস্ত্র কেড়ে নিতে হবে; মুখে কাপড় খুঁজে দিয়ে ওদের বেঁধে ফেলতে হবে, যাতে কুঁ শব্দটি না করতে পারে। তারপর টারজনের পিছন পিছন ওদের নিয়ে যাবে সর্দারের কুটিরের পিছনে।
কথা বলতে বলতেই সে নিজের কাজ শেষ করল। তিনটি বুকেনা সৈনিক যখন বন্দীদের নিয়ে যেতে ঘরে ঢুকল তখন ওয়াজিরিরা সকলেই মুক্ত; নিঃশব্দে তারা অপেক্ষা করে আছে।
স্বপ্নেও ভেবো না যে তোমরা আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে। ব্রাউনের কণ্ঠস্বরে একটা চ্যালেঞ্জের আভাষ।
জেন বলল, আমরা কাউকে ফাঁসিতে ঝোলাব না। আইনকে আমরা নিজেদের হাতে নিতে পারি না। যতদিন কোন উপযুক্ত আদালতে আমাদের দোষ বা নির্দোষিতা প্রমাণিত না হচ্ছে ততদিন আমরা সকলেই সমান সন্দেহভাজন।
টিবস্ বলল, আপনার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত মিলেডি।
বাধা দিল এলেক্সিস, কিন্তু আমি একমত নই। এই জনহীন পথে একজন খুনিকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলা মোটেই নিরাপদ নয়। তার বিরুদ্ধে সব সাক্ষীকে লোপাট করে দিতে সে অনায়াসে আমাদের সবাইকে খুন করতে পারে।
তাহলে আপনি কি করতে বলেন? জেন প্রশ্ন করল।
খুনিকে এখানে রেখে আমরা নিকটবর্তী থানায় গিয়ে সব ব্যাপারটা জানাই; তারপর তারা এসে অপরাধীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাক।
জেন মাথা নাড়ল। কিন্তু কে খুনি তা তো আমরা জানি না।
ব্রাউন বলল, আমি ওসবের মধ্যে নেই। এই সব বিদেশী বন্দরে বিচারের ঝুঁকি নিতে রাজী নই। নিঃসম্বল একজন মার্কিন একজন কোটিপতি প্রিন্সের বিরুদ্ধে যুঝবে কিসের জোরে? না মিস, ফাঁসির। দড়িতে গলা বাড়িয়ে দিতে আমি পারব না।
জেন সরাসরি প্রশ্ন করল, তাহলে তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে না ব্রাউন? সত্যি, তুমি বড় বোকা।
আমি বোকা হতে পারি মিস, কিন্তু কোন বিদেশী আদালতের ঝুঁকি আমি নেব না। একটা ইংরেজ আদালত হলে তবু কথা ছিল।
