জেন চলে গেলে হাতের ঘড়ি দেখে ব্রাউন বলল, নটা বাজে। টিবস্ তুমি মাঝ রাত পর্যন্ত পাহারা দিয়ে আমাকে ডেকে দিও, আমি তিনটে পর্যন্ত জাগব তারপর জাগবে আমাদের মহামান্য ডিউক সকাল পর্যন্ত।
সবরভ শিবিরের মুখেই বসেছিল। ব্রাউনকে দেখে বলল, তোমাদের সব কথা আমি শুনেছি। তিনটেয় আমাকে ডেকে দিও। তখন আমি পাহারায় থাকব। এখন শুতে চললাম।
মাঝ রাতে টিবস্ যখন তাকে জাগিয়ে দিল তখন মনে হল, সে একটুও ঘুমোয় নি।
কয়েক মিনিট পাহারা দেবার পরেই আনেৎ এসে তার পাশে বসল।
ব্রাউন বলল, আচ্ছ, এত ভোরে তুমি কি করতে এখানে এলে?
আনেৎ বলল, আধঘণ্টা আগে কিসে যেন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, আর ঘুম এল না। সেটা যে কি তা জানি না, কিন্তু আমি চমকে জেগে উঠলাম; শুধু মনে হল, কে যেন ঘরের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। জানেন তো, দরজার পর্দাটা নামিয়ে দিলে ভিতরটা খুব অন্ধকার হয়ে যায়।
তাহলে নির্ঘাৎ তুমি স্বপ্ন দেখেছ গো মেয়ে, ব্রাউন বলল।
মেয়েটি বলল, হয় তো তাই হবে; কিন্তু একটা কোন অস্বাভাবিক শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছিল, কারণ আমার ঘুম খুব গাঢ়। তাছাড়া একটু পরেই আমি কারও গলাও শুনেছিলাম।
ব্রাউন বলল, তুমি বরং ঘরে গিয়ে আর একবার ঘুমোবার চেষ্টা কর গে।
সত্যি বলছি মিঃ ব্রাউন, এখানে আর ঘুম আসবে না। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে যে ঘরের মধ্যে একটা ভয়ংকর কিছু ঘটেছে; আমার খুব ভয় করছে। আপনার কাছে যদি একটু বসি তাতে আপনার কোন আপত্তি নেই তো মিঃ ব্রাউন?
আপত্তির কি আছে? এ দলে তুমি আর লেডি গ্রেস্টোকই তো একমাত্র মানুষ। আর সবই তো বাজে লোক।
একটু চুপ করে থেকে ব্রাউন বলল, কখনও যদি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারি সে হঠাৎ থেমে গেল।
তাহলে কি? মেয়েটি প্রশ্ন করল।
ব্রাউন ইতস্তত করতে লাগল। ধুনিতে আর একটা কাঠ ফেলে দিয়ে বলল, ভাবছিলাম, এমনও তো হতে পারে যে তুমি আর আমি- মানে হতেও তো পারে
হ্যা; তারপর? মেয়েটি ঘন ঘন নিঃশ্বস ফেলতে লাগল।
ধর, আমাকে যদি মিঃ ব্রাউন বলে আর ডাকতে না হয়।
তাহলে কি বলে ডাকব?
বন্ধুরা আমাকে চি বলে ডাকে।
কী মজার নাম। এ রকম নাম আমি কখনও শুনিনি। এ নামের অর্থ কি?
যে শহর থেকে আমি এসেছি এটা তারই সংক্ষেপ।
কোন শহর?
চিকাগো?
মেয়েটি হেসে উঠল, ওহো, আপনি তাহলে বানান করেন C-h-i-, S-h-i নয়। কি বলেন মিঃ ব্রাউন
উঁহু। বল চি।
বটে! আমার আসল নাম নীল।
খুব সুন্দর নাম।
আনেৎও সুন্দর। আনেৎ নামে তো আমি পাগল।
নামটা তোমার পছন্দ?
হ্যাঁ, আর মেয়েটিকেও-তাকে আমার খুব ভাল লাগে। ব্রাউন হাত বাড়িয়ে আনেকে কাছে টানল।
তিনটে বেজে যাবার অনেক পরে ব্রাউনের খেয়াল হল যে সবরভকে ডেকে দিতে হবে। প্রিন্স যখন আগুনের পাশে এসে বসল তখন তাকে কেমন যেন অস্বস্তিকর মনে হল।
ব্রাউন ও আনেৎ শিবিরের দিকে এগিয়ে গেল। আনেৎ কাঁপা গলায় বলল, ওখানে ফিরে যেতে মন চাইছে না।
ব্রাউন বলল, কোন ভয় নেই। আমি বরং একটা চোখ খোলা রেখেই ঘুমব। কিছু শুনতে পেলেই আমাকে ডেকো।
পাশের ঘরে একটা তীব্র আর্তনাদে ব্রাউনের যখন ঘুম ভেঙে গেল তখন দিনের আলো দেখা দিয়েছে।
টিবস বলল, ওটা কি? ব্রাউন ততক্ষণে মেয়েদের ঘরের দিকে ছুটছে। সে দেখল, সবরভ ধুনির পাশে দাঁড়িয়ে আছে; সকালের আলোয় তাকে কেমন যেন ছাই-ছাই দেখাচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েদের ঘরের দিকে।
দরজায়ই আনেতের সঙ্গে দেখা। সে চীৎকার করে বলল, ও নীল, কাল রাতে একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে। কিটি সবরভ মারা গেছে; তার মাথার খুলিটা দু’ভাগ হয়ে গেছে।
জেন শুধাল, প্রিন্স কোথায়?
তিনি তো পাহারায় ছিলেন। আমি যখন ভিতরে ঢুকি তখন তিনি আগুনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাকে একটা খবর দিতে হবে, জেন বলল।
আমার তো মনে হয় তার কাছে এটা কোন খবর নয়, ব্রাউন বলল।
জেন চোখ তুলল। সবিস্ময়ে বলল, না, তিনি এ কাজ করতে পারেন না।
তাহলে কে পারে? বিমান-চালকের প্রশ্ন।
টিবস্ বলল, মিঃ লেডি যদি বলেন তো আমি হিজ হাইনেসকে খবর দিতে পারি।
তাই দাও টিবস্।
টিবসকে দেখে প্রিন্স বলল, ব্যাপার কি? আনেৎ হঠাৎ চীৎকার করল কেন?
হার হাইনেস-মানে তিনি-তিনি মারা গেছেন।
কি?-কে?- না, এ সম্ভব নয়। কাল রাতে যখন শুতে যায় তখনও সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।
টিবস্ বলল, তাকে খুন করা হয়েছে ইয়োর হাইনেস। উঃ, কী ভয়ংকর!
খুন! বলে প্রিন্স সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। শিবির থেকে বেরিয়ে এল জেন ও ব্রাউন।
জেন বলল, কি ভয়ঙ্কর কাণ্ড এলেক্সিস। এ কাজ কে করেছে, কেন করেছে তা তো আমি ভেবেই পাচ্ছি না।
প্রিন্স শুধাল, কি দিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে?
জেনকে বিচলিত বোধ হল। বলল, তা–তা, নিশ্চয়ই একটি টাঙ্গি দিয়ে। সে টাঙ্গিটা কোথায় গেল?
সবরভ বলল, টাঙ্গিটা খুঁজে বার করুন, তাহলেই খুনিও ধরা পড়বে। তিনটে থেকে আমি এখানে পাহারায় আছি। এ কাজ যেই করে থাকুক টাঙ্গিটাকে লুকিয়ে ফেলেছে।
জেন বলল, ঠিক আছে তাহলে আপনারা পুরুষরা চলে যান মেয়েদের ঘরটা খুঁজতে; আমি আর আনেৎ খুঁজে দেখি পুরুষদের ঘর।
সবরভ বলল, ও ঘরে আমি যেতে পারব না।
খুঁজবার বিশেষ কিছু নেই। শুধু যে ঘাস-পাতা বিছিয়ে বিছানা তৈরি করা হয়েছে সেগুলো উল্টে পাল্টে দেখা।
জেন খুঁজল এলেক্সিসের বিছানা। এলেক্সিসের হাত পড়ল টিবসের বিছানায়। আর আনেৎ খুঁজতে লাগল ব্রাউনের বিছানা। ঘাসের তলায় শীতল ও শক্ত একটা কিছু আনেতের হাতে লাগল, আর আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেল। শিউরে উঠে সে হাত সরিয়ে নিল। মুহূর্তের জন্য কি যেন ভেবে উঠে দাঁড়াল। বলল, এখানে কিছু নেই।
