সেই বীভৎস ভৌতিক হুংকার শুনে শ্বেতকায় বর্বরটি কুঁকড়ে পিছিয়ে গিয়ে নিজের ছুরির হাতলটাকে সজোরে চেপে ধরল।
হুংকারের শব্দ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল। বুকেনাদের ভাষায় বর্বরটি প্রশ্ন করল, কে তুমি?
আমি অরণ্যরাজ টারজান। আর তুমি?
আমি ইয়েনি, কাভুরু।
টারজান খুশি হল। এবার সে হয়তো কাভুরুদের পরিচয় জানতে পারবে।
মাথা নেড়ে ইয়েনি বলল, তোমার মত লোক আমি আগে কখনও দেখিনি। তুমি কালো মানুষ নও, আবার কাভুরুও নও! তুমি কি?
আমি টারজান। কাভুরুদের গ্রামের খোঁজ করছি। তুমি তো আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পার। তোমাদের সর্দারের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।
ইয়েনি মাথা নেড়ে বলল, মরবার ইচ্ছা না হলে কেউ কাভুরুদের গ্রামে যায় না। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ, তাই আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব না। বা তোমাকে মারবও না। তুমি তোমার পথে চলে যাও টারজান।
বিমানের দলটি মাটিতে নেমে নিজেদের কাজে লেগে গেল। ছোট ঝর্ণাটার ধারে জেন খানিকটা খোলা জায়গা খুঁজে পেল। একটা বেড়া ও কিছু থাকার মত ঘর বানাবো শুরু হয়ে গেল।
বিকেল নাগাদ একটা বড় ঘর তৈরির কাজ শেষ হল। তাতে কোন রকমে দুটো ঘরের ব্যবস্থা করা হল, একটা মেয়েদের জন্য, আর একটা ছেলেদের।
ওদিকে জেন তখন অন্য এক ধরনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কিটি অনেকক্ষণ ধরে বসে বসে কাজ দেখল। তারপর আর কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এসব কি করছ ভাই?
অস্ত্র তৈরি করছি- একটা ধনুক, তীর আর একটা বর্শা।
বাঃ, কী সুন্দর তোমার হাতের কাজ! এগুলো নিয়ে খেলা করে আমাদের সময় বেশ কেটে যাবে।
জেন মুখ তুলে বলল, আমি যা তৈরি করছি তা দিয়ে আমাদের খাবার সংস্থান হবে, আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হবে।
একটা ধনুক ও ছ’টা তীর বানিয়ে নিয়ে জেন উঠে পড়ল। ঘর ও বেড়ার ব্যবস্থা দেখে বলল, বাঃ বেশ হয়েছে। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ডান হাতের ব্যবস্থা করতে। ব্রাউন, তোমার ছুরিটা দাও।
পাশের ঝর্ণাটার উপর নজর রেখে জেন নিঃশব্দে গাছের ডালে ডালে এগিয়ে চলল। এই সব ঝর্ণাতে জল খেতে জীবজন্তুরা অবশ্যই আসবে।
একটা অস্পষ্ট গন্ধ নাকে আসায় সে খুশি হয়ে উঠল। সামনে শিকার এসেছে।
আরও সতর্কতার সঙ্গে সে এগোতে লাগল, যাতে গাছের একটা পাতাও না নড়ে। ঠিক সেই সময় ডালপালার ফাঁক দিয়ে হরিণটাকে দেখতেও পেয়ে গেল। বিদ্যুৎগতিতে ধনুকে তীর জুড়ে ছুঁড়ে মারল। তীরটা গম্ভীর হয়ে বিঁধল হরিণটার বাঁ কাঁধে। একটা লাফ দিয়েই সেটা মাটিতে পড়ে মরে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে জেন নিচে নেমে এসে মৃত শিকারের দিকে ছুটে গেল। পিছনে বেশ কাছেই ঝোপের ভিতরে কিসের যেন নড়াচড়ার শব্দ কানে এল। আচমকা একটা ক্রুদ্ধ গর্জনে বনভূমির স্তব্ধতা ভেঙে খাখা হয়ে গেল। বিশ পা পিছনে চিতাবাঘ শীতা লাফিয়ে পড়ল রাস্তার উপরে।
হরিণটাকে নামিয়ে রেখে জেন ধনুকে পূর্ণ জ্যা আরোপ করে তীর ছুঁড়ে দিল শীতার বুক লক্ষ্য করে। তীর বুকে বিঁধতেই যন্ত্রণায় ক্রোধে তীব্র আর্তনাদ করে শীতাও পাল্টা আক্রমণ করল।
আশ্রয় শিবিরে বসে সকলেই সে আর্তনাদ শুনল। তাদের মনে হল যেন মানুষের কণ্ঠস্বর।
আনেৎ বলল, মদিউ, ওটা যে নারী-কণ্ঠের আর্তনাদ!
ব্রাউন শংকিত গলায় বলল, লেডি গ্রেস্টোক!
ব্রাউন ছোট হাত-কুড়ালটা নিয়ে শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল।
টিবস্ পকেট থেকে গুলিহীন পিস্তলটা বের করল। বলল, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব মিঃ ব্রাউন। মিলেডির কোন বিপদ ঘটতে আমরা দেব না।
যে দিক থেকে আর্তনাদটা এসেছিল ব্রাউন ও টিবস্ সেই দিকেই এগিয়ে চলল।
একটু এগিয়েই ব্রাউন জেনকে দেখতে পেল। একটা চিতাবাঘের মৃতদেহ থেকে তিনটের মধ্যে শেষ তীরটা টেনে বের করছে। একটু দূরেই পড়ে আছে একটা হরিণের ক্ষত-বিক্ষত দেহ।
জেন বলল, সবে এই হরিণটাকে মেরেছি, এমন সময় শীতা এসে সেটাকে নিয়ে পালাতে যাচ্ছিল।
যে আর্তনাদ শুনে আমরা এসেছি সেটা কর-আপনার, না ওর?
শীতার। তেড়ে আসতেই ছুঁড়লাম তীর। সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার!
কপালের ঘাম মুছে ব্রাউন বলল, কি জানেন মিস, আমার ইচ্ছা করছে আপনার সামনে টুপি খুলে দাঁড়াই।
তার চাইতে বরং হরিণটাকে শিবিরে নিয়ে চল। তাতে অনেক বেশি কাজ হবে।
খুব হৈ-চৈ করে হরিণের মাংস দিয়ে ভোজন-পর্ব শেষ হল। তখন টিবস্ বলল, যদি অভয় দেন মিলেডি তো একটা কথা শুধাই। এখান থেকে আবার সভ্য জগতে ফিরে যাব কেমন করে তা বলুন।
জেন বলল, এ নিয়ে আমিও অনেক রকম ভাবছি। কি জান, আমরা সকলেই যদি সুস্থ সবল থাকতাম তাহলে ঝর্ণাটার তীর বরাবর এগিয়ে হয়তো একটা বড় নদীতে পড়তাম এবং এক সময় হয় তো একটা আদিবাসী গ্রামও পেয়ে যেতাম। সেখানে খাওয়া জুটত, গাইড পাওয়া যেত। তারপর তাদের সাহায্যে একটা ইউরোপীয় উপনিবেশ খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত হত না।
চমৎকার ব্যবস্থা মিলেডি; চলুন, এখনই রওনা হই।
না; আগে একজন কি দু’জন বেরিয়ে গিয়ে ব্যবস্থা করবে; বাকিরা এই শিবিরেই থাকবে।
ব্রাউন শুধাল, কিন্তু কে যাবে? আমি আর টিস?
এই নিয়ে শুরু হল আর এক দফা তর্কাতর্কি, কথা কাটাকাটি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, জেন একাই যাবে সাহায্যের ব্যবস্থা করতে।
জঙ্গলের বুকে নেমে এল নিস্তব্ধ রাত।
এক সময় জেন উঠে পড়ল, আমি এবার শুতে চললাম। কাল সকালেই উঠতে হবে। শুভ রাত্রি।
