সমস্ত ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে কালো মানুষগুলো তাকে বাঁধা দেবার সময়টুকুও পেল না। টারজান প্রায় ফটকের কাছে পৌঁছে যাবে এমন সময় একটা কিছু এসে তার মাথায় সজোরে আঘাত করল।
জ্ঞান ফিরে এলে সে বুঝল, দুর্গন্ধ ভরা একটা ঘরের মধ্যে সে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে সব কথাই তার মনে পড়ে গেল।
রাতের অন্ধকারে একটি মূর্তি নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে অন্ধকারে বেরিয়ে এল। ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সভয়ে চারদিকে তাকাল।
সব চুপ। ভৌতিক ছায়ার মত মূর্তিটি নিঃশব্দে গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলল।
একটু আগেই টারজনের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘরের দরজাটা যাতে দেখা যায় সেইভাবে টারজান পাশ ফিরল। সেখানে দেখা দিল একটি ছায়া-মূর্তি। কে যেন ঘরে ঢুকছে।
অন্ধকারে পথ হাতড়ে ছায়া-মূর্তি আরও কাছে এগিয়ে এল। হঠাৎ টারজান প্রশ্ন করল, কে তুমি?
স্-স্-শ! অত জোরে কথা বলো না। আমি ওঝা গুপিংগু।
কি চাও?
তোমাকে মুক্তি দিতে এসেছি। তোমার দেশে ফিরে যাও কাভুরু; সেখানে গিয়ে তোমার লোকজনদের বলো যে গুপিংগু তোমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। বিনিময়ে তারা যেন গুপিংগুর কোন ক্ষতি না করে, পর মেয়েদের হরণ না করে।
টারজান হাসল। অন্ধকারে সে হাসি দেখা গেল না। বলল, তুমি বুদ্ধিমান গুপিংগু; এবার আমার বাঁধন কেটে দাও।
আর একটা কথা, গুপিংগু বলল।
কি?
উদালো বা আর কাউকে বলো না যে আমি তোমাকে মুক্তি করে দিয়েছি।
আমার কাছ থেকে তারা কিছুই জানতে পারবে না; আমাকে শুধু বলে দাও তোমার দেশের লোফরা কি কাভুরুদের দেশে যাবার পথ চেনে?
ওঝা বলল, আমি চিনি-কিন্তু কাউকে সেখানে নিয়ে যাব না বলে কথা দিয়েছি।
আচ্ছা বল তো, সে দেশের পথে কেমন করে যাওয়া যায়; তবে তো বুঝব সে পথ তুমি চেন কি না।
আমাদের গ্রামের উত্তর দিক থেকে আরও উত্তরে গেলে একটা পুরনো হাতি চলার পথ আছে। পথটা খুব ঘোরানো, তবে কাভুরুদের দেশের দিকেই চলে গেছে।
আমার বাঁধন কেটে দাও, টারজান বলল।
নিজের ছুরি বের করে গুপিংগু বন্দীর হাত-পায়ের শক্ত বাঁধন কেটে দিল। আমি ঘরে না পৌঁছা পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা কর, বলে সে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে গেল।
টারজান উঠে দাঁড়িয়ে শরীরটাকে ঝাঁকি দিল। তারপর হাঁটুর উপর বসে হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সর্দারের কুটিরের কাছে এসে থামল। অস্ত্রশস্ত্রগুলোর জন্য খুব লোভ হচ্ছে। কুটিরের মধ্যে একটা অস্পষ্ট আলো দেখা যাচ্ছে। দরজার কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখল, সৈনিকটির অদূরেই ধুনির পাশে তার অস্ত্রশস্ত্রগুলো পড়ে আছে।
সতর্ক পদক্ষেপে ভিতরে ঢুকে সে ঘুমন্ত দেহটাকে পেরিয়ে গেল। প্রথমেই তুলে নিল তার মূল্যবান ছুরিটা; তারপর তীরপূর্ণ তুণীরটাকে ডান পিঠে ঝুলিয়ে বাঁ কাঁধে জড়িয়ে নিল দড়িটা। ছোট বর্শা ও ধনুটাকে এক হাতে নিয়ে আবার দরজার দিকে ঘুরল।
সারাটা দিন টারজান গুপিংগুর নির্দেশ মত হাতিদের পথ ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে গেল। বিকেলের দিকে একটা জন্তুকে মেরে ভোজন-পর্ব সমাধা করে সেখানেই রাতটা কাটিয়ে দিল।
পরদিন নিঃশব্দে চলতে চলতে একটা দমকা হাওয়া তার নাকে পৌঁছে দিল একটা বিচিত্র গন্ধ। টারজান থেমে গেল। গন্ধটা একজন টার্মাঙ্গানির, অথচ এ গন্ধ তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। তার সঙ্গে এসে মিশেছে একটি পরিচিত গন্ধ-সিংহ নুমার গন্ধ। এই দুটি গন্ধ একত্র হওয়া মানেই বিপদের সংকেত।
টারজান মানুষটিকেই প্রথম দেখতে পেল। লোকটি শ্বেতকায়; কিন্তু যত সাদা মানুষ সে এতকাল দেখেছে এ লোকটি তাদের চাইতে কত আলাদা। তার পরনে একটি মাত্র কটিবাস; তার কব্জি ও গোড়ালি ব্রেসলেটে ভর্তি মানুষের দাঁতের সাত-নহরী হার ঝুলছে তার গলায়; হাড়ের বা হাতির দাঁতের সরু নল আড়াআড়ি ঢুকে আছে তার নাকের ডগায়; দুই কানে ঝুলছে ভারী ভারী আংটা। কপাল থেকে গলার পিছন পর্যন্ত প্রসারিত একগুচ্ছ চুল ছাড়া গোটা মাথাটা কামানো; আর সেই চুলের সঙ্গে বাঁধা পালকগুলো বীভৎসভাবে বিচিত্র মুখের উপর ঝুলছে।
একটি গাছে হেলান দিয়ে লোকটি বসে আছে। দেখলেই বোঝা যায় একটা সিংহের উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন।
তাহলে এই অপরিচিত লোকটি তো কাভুরু হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করার আগেই একটু দূরের একটা গর্জন টারজনের কানে এল।
সঙ্গে সঙ্গে শ্বেতকায় বর্বরটি উঠে দাঁড়াল। এক হাতে তুলে নিল ভারী বর্শা, অন্য হাতে একটা আদিম ছুরি।
ঝোপের ভিতর থেকে সিংহটা পূর্ণ বিক্রমে তেড়ে এল। গাছে উঠে আত্মরক্ষা করার সময়টুকু পর্যন্ত লোকটি পেল না। অতি দ্রুত তার হাতের বর্শা পিছনে সরে গিয়েই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেল লক্ষ্যের দিকে। তার হস্তে নিক্ষিপ্তবর্শা লক্ষ্যচ্যুত হল। সঙ্গে সঙ্গে টারজান গাছের ডাল থেকে লাফিয়ে পড়ল সিংহটাকে লক্ষ্য করে।
শুরু হল দুই জানোয়ারের যুদ্ধ। মানুষের গর্জন ও গর-গর শব্দ এক হয়ে মিশে যাচ্ছে সিংহের গর্জনের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত গর্জন থেমে গেল; মৃত্যু-যন্ত্রণায় শেষবারের মত নড়ে উঠেই পশুরাজের দেহটা মাটিতে এলিয়ে পড়ল।
টারজান লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শত্রুর লাশের উপর একটা পা রেখে আকাশে মুখ তুলে বিজয়ী গোরিলার মত হুংকার দিতে লাগল।
