এই বিপদ এড়াবার কোন পথ নেই? জেনের কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু চোখ দুটি ভয়গ্রস্ত। পেট্রল-গ্যাস কি সত্যি খুব নেমে গেছে ব্রাউন?
দেখুন, ব্রাউন ড্যাস-বোর্ডের কাটাটা দেখাল। বড় জোর আর ঘণ্টাখানেক চলবে। যেমন করে হোক, আধঘণ্টার মধ্যে কোথাও নামতেই হবে। শুধু ভয় হচ্ছে, একটা পাহাড়ের উপর না আছড়ে পড়ি।
কয়েকটি নিঃশব্দ মুহূর্ত কেটে গেল। হঠাৎ জেন হর্ষধ্বনি করে উঠল। দেখ ব্রাউন গাছা! আমরা অনেকটা নেমে এসেছি। আর কতটা গ্যাস আছে।
পনের-বিশ মিনিট চলার মত আছে।
নিচে তাকিয়ে হতাশ গলায় জেন বলল, কিন্তু নিচে যে শুধু বন আর বন; উড়োজাহাজ নিয়ে নামবার মত একটা জায়গাও নেই।
একটা কোন ফাঁক পেয়ে যাব। অন্তত পক্ষে গাছের উপরে তো নামতে পারব। তাতে আর যাই। হোক, সকলে মিলে মারা পড়ব না।
ডালপালা ভাঙার খটমট শব্দ আর কাপড় ঘেঁড়ার খসখস শব্দের মধ্যে উড়োজাহাজটা বৃষ্টি-ভেজা, আন্দোলিত বনের মাথায় খাড়া নেমে গেল। ঝড়ের শব্দ আর উড়োজাহাজের ধাক্কার শব্দকে ছাপিয়ে শোনা গেল কেবিন-বন্দী যাত্রীদের আর্তনাদ আর গালমন্দ।
শেষ পর্যন্ত তাও থামল। উড়োজাহাজটা স্থির হয়ে গেল।
তারপর কয়েকটি ভয়ঙ্কর মুহূর্ত ভয়ে শুধুই নিস্তব্ধতা।
ব্রাউন পিছনে কেবিনের দিকে তাকাল। সেফটি বেল্টে বাঁধা অবস্থায় চার যাত্রী চার ভঙ্গীতে ঝুলে আছে। ব্রাউন শুধাল, পিছনের সকলে ভাল তো? আনেৎ, তুমি কেমন আছ?
ফরাসী মেয়েটি আবার কেঁদে উঠল। হয় মনডিউ! আমি বোধ হয় মরেই গেছি।
প্রিন্সেস সবরভ আর্তকণ্ঠে বলল, ওঃ কী ভয়ঙ্কর! কেউ আমার জন্য কিছু করছে না কেন? কেউ আমাকে একটু সাহায্য করছে না কেন? আনেৎ! এলেক্সিস! তোমরা কোথায়? আমি যে মরতে চলেছি।
এলেক্সিস গর্জে উঠল, সেটাই তোমার প্রাপ্য। যত সব পাগলের কাণ্ড-কারখানা! আমরা যে মরে যাইনি সেটাই আশ্চর্য। একজন ফরাসী পাইলট থাকলে এ রকমটা ঘটত না।
জেন বাধা দিয়ে বলল, বাজে কথা বলবেন না। ব্রাউন চমৎকারভাবে উড়োজাহাজটাকে নামিয়েছে।
তারপর নিজের বেল্টটা খুলে জেন কেবিনে উঠে গেল।
ওদিকে টারজান ও তার ওয়াজিরি সঙ্গীরাও ঝড় থামার অপেক্ষায় রইল।
কিছুক্ষণের জন্য ঝড়ের সঙ্গে একটা উড়োজাহাজের মোটরের শব্দ টারজান শুনতে পেয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল যে জাহাজটা ঘুরপাক খাচ্ছে; তারপর সে শব্দটা কমতে কমতে মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল।
মুভিরো বলল, বাওয়ানা, ঝড়ের মাথায় চড়ে কি মানুষ এসেছিল?
টারজান জবাব দিল, হ্যাঁ, অন্তত একজন তো বটেই, তবে ঝড়ের মাথায় কি ভিতরে তা জানি না।
ক্রমে আকাশ পরিষ্কার হল। সূর্য দেখা দিল।
টারজান উঠে দাঁড়িয়ে সিংহের মত শরীরটা ঝাড়া দিল। বলল, এবার আমি উকেনা যাত্রা করব; সেখানে যদি আমাকে না পাও তো জানবে যে আমি কাভুরু ও বুইরার খোঁজে গেছি। তোমাদের সাহায্যের দরকার হলে নকিমাকে পাঠিয়ে দেব তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে।
আর কোন কথা না বলে টারজান একটা জলে ভেজা ডাল ধরে ঝুলে পড়ে পশ্চিম দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তৃতীয় দিন সকালে সে হাজির হল বুকেনাদের সর্দার উদাতলার গ্রামে।
একটা বাচ্চা বানর কাঁধে তার দীর্ঘ শরীর দেখেই গ্রামের ফটকে তার চারপাশে অনেক লোকের জটলা শুরু হয়ে গেল। তাদের দিকে কোনরকম নজর না দিয়ে টারজান সোজা গিয়ে উঠল তাদের সর্দার উদালোর ঘরে।
তাকে দেখে উদালো মোটেই খুশি হল না; বলল, আমরা তো ভেবেছিলাম বড় বাওয়ানা চলেই গেছে, আর ফিরবে না; আবার ফেরা হল কেন?
উদাতলার সঙ্গে কথা বলতে।
উদালোর সঙ্গে তো আগেই কথা হয়ে গেছে। উদালো যা জানে সবই তো তাকে বলেছে।
এবার উদালো তাকে আরও কিছু বলবে। কাভুরুদের দেশ কোথায় সে কথাও বলবে।
বুড়ো বিরক্ত হল। উদালো তা জানে না।
তারা এই সব কথা বলতে বলতেই গ্রামের বর্শাধারী সৈনিকরা এসে তাদের ঘিরে ধরল।
চারপাশে সমবেত সৈনিকদের দেখিয়ে টারজান বলল, এ সবের অর্থ কি উদালো? আমি তো শান্তিতেই এসেছি ভাই হিসেবে তোমার সঙ্গে কথা বলতে।
গলা খাকারি দিয়ে উদালো বলল, তুমি এখান থেকে চলে যাবার পরে এখানে অনেক রকম কথা হয়েছে। কাভুরুদের সম্পর্কে শোনা গল্পগুলো এখানকার লোকেরা ভোলে নি। শোনা যায়, তারাও নাকি তোমার মতই সাদা মানুষ, আর উলফঙ্গ হয়ে চলে। তোমার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আমার লোকেরা অনেকেই মনে করে যে তুমিও একজন কাভুরু, গুপ্তচরের কাজ নিয়ে এখানে এসেছ সুযোগ মত চুরির জন্য মেয়েদের বেছে রাখতে।
ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। আমাদের আর কোন মেয়েকে তুমি চুরি করতে পারবে না। বলতে বলতে সে সজোরে হাততালি দিল, সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকরা টারজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
টারজান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকে উদ্যত বর্শা; সে জানে, এই মুহূর্তে পালাতে চেষ্টা করলে এক ডজন বর্শা তাকে গেঁথে ফেলবে।
সঙ্গে সঙ্গে কালো মানুষগুলোর মধ্যে তর্ক বেঁধে গেল। একদল বলল, ওকে মেরে ফেল; আর একদল। বলল, ওকে বন্দী কর; আবার আর একদল বলল, কাভুরুদের খুশি করতে ওকে ছেড়ে দাও।
তর্কাতর্কির ফলে সামনের সারির বর্শাধারীরা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। টারজান বুঝল, এই পালাবার সুযোগ। বিদ্যুৎ গতিতে সে পাশের সৈনিকটির উপর লাফিয়ে পড়ল; বর্মের মত তাকে সামনে ধরে সে মানব ব্যুহ ভেদ করে ছুটতে লাগল। এত দ্রুত সে এদিক-ওদিকে মোড় নিয়ে চলতে লাগল যে তাদের সঙ্গী কালো মানুষটার জীবনকে বিপন্ন না করে টারজানকে লক্ষ্য করে বর্শা ছোঁড়া একেবারেই অসম্ভব।
