ছোট্ট নকিমা হাত-পা নেড়ে জেগে উঠল। কিচির-মিচির করে টারজনের কাঁধে চড়ে বসে লোমশ হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
এই বৃহৎ অরণ্যে নিজের এলাকা ছেড়ে টারজান গিয়েছিল বহুদূরের এক অঞ্চলে। সেখান থেকেই সে ফিরে চলেছে।
নানা রকম অদ্ভুত গুজব কানে আসায় সে বিষয়ে তদন্ত করতেই সে গিয়েছিল। অরণ্যের অনেক অনেক ভিতরে এমন সব পথবিহীন পরিত্যক্ত অঞ্চল আছে যেখানে মানুষের পদার্পণ কদাচিৎ ঘটেছে, আর যারাই সেখানে গেছে তাদের মধ্যেও অনেকেই জীবন্ত ফিরে আসেনি। এই রকম রহস্যময় বিচিত্র গুজব তার কানে এসেছে। ইদানীং তরুণী মেয়েদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে। চৌদ্দ থেকে বিশ বছেরের মেয়েগুলো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। তাদের কোন খোঁজই মেলে না।
গাছ থেকে গাছে ঝুলতে ঝুলতে সে অনায়াসে এগিয়ে চলেছে। কখনও তার পাশে, কখনও বা মাথার উপরে, ছোট্ট নকিমা অনেক দূরে থেকেও মনিবকে অনুসরণ করে চলেছে।
এক সময় সে দেখল, তার মনিব থেমে পড়েছে; বাতাস শুঁকছে; কান পেতে আছে। ছোট্ট নকিমা নিঃশব্দে টারজনের কাঁধে লাফিয়ে পড়ল।
মানুষ, টারজান বলল।
পিছন দিক থেকে এগিয়ে টারজান খুব দ্রুত তাদের ধরে ফেলল। বলল, ওরা ওয়াজিরি।
গাছের উপর থেকেই টারজান ওয়াজিরিদের ভাষায় বলল, মুভিরো, আমার ছেলেরা তাদের দেশ থেকে এতদূরে কেন এসেছে?
মুভিরো বলল, ওঃ, বাওয়ানা, তুমি এসেছ ভালই হয়েছে। আমার মেয়ে বুইরা নিখোঁজ হয়েছে। একলা নদীর দিকে যাচ্ছিল; তারপর তাকে আর দেখা যায়নি।
মনে হয় এর পিছনে শয়তান আছে, রহস্য আছে বাওয়ানা। কাভুরুদের কথা শুনেছি। হয় তো এসব তাদের কাজ, আমরা তাদের সন্ধানেই বেরিয়েছি।
টারজান বলল, তাদের দেশ তো অনেক দূরে। তারই কাছের একটা জায়গা থেকে আমি এইমাত্র ফিরছি। সেখানকার লোকগুলো সব ভীরু। কাভুরুদের কোথায় পাওয়া যাবে ভয়ে তারা সে কথা জানলেও আমাকে বলতে চাইল না।
টারজান বলল, চোরদের কোন হদিস পেয়েছ কি?
মুভিরো বলল, কোন হদিস নেই। তাই তো বুঝতে পারছি যে এ সব কাভুরুদের কাজ; তারা কোন হদিস রেখে যায় না।
টারজান বলল, আমরা প্রথমেই যাব বুকেনাদের গ্রামে। তাদের মেয়েরাই হারিয়েছে সবটাইতে বেশি। আমি দ্রুততর ছুটতে পারি; কাজেই আমি আগে যাচ্ছি। চার দফা যাত্রা, কোথাও আটকে পড়লে হয় তো তিন দফা যাত্রায়ই তোমরা সেখানে হাজির হতে পারবে।
মুভিরো বলল, এবার বড় বাওয়ানা যখন আমাদের সহায় তখন আর ভয় নেই, কারণ আমি জানি এবার বুইরাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।
টারজান আকাশের দিকে মুখ তুলে বাতাস শুকল। বলল, একটা খারাপ ঝড় আসছে মুভিরো। সেই ঝড়ের মুখে তোমাদের চলতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়ল উষ্ণ গাছগুলোর মাথায়। মেঘের গর্জন তীব্রতর হতে লাগল। আঁধার নেমে এল বনের বুকে। চমকাতে লাগল বিদ্যুৎ। শুরু হলো নিদারুণ বর্ষণ।
আধ ঘণ্টা কেটে গেল। ঝড়ের বেগ কমল না। হঠাৎ টারজান উপরের দিকে কান খাড়া করল।
একজন সভয়ে জিজ্ঞাসা করল, আকাশে শোঁ-শোঁ আর্তনাদ করে ছুটে চলেছে ওটা কি বাওয়ানা?
টারজান বলল, অনেকটা বিমানের মত শব্দ; কিন্তু এখানে বিমান কি করতে এল তা তো বুঝতে পারছি না।
প্রিন্স এলেক্সিস বিমান-চালকের কামরায় মাথাটা বাড়াল। তার বিবর্ণ মুখে আতংকের আভাষ। বিমানের পাখার গর্জনকে ছাপিয়ে সে চীৎকার করে বলল, কোন বিপদ ঘটবে কি ব্রাউন?
চালক খেঁকিয়ে উঠল, ঈশ্বরের দোহাই, চুপ করুন। প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর একটা করে বোকা বোকা প্রশ্ন শোনা ছাড়াও আমার অনেক কাজ আছে।
পাশের আসনে বসা লোকটি ভীত কণ্ঠে তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল,—শ। হিজ হাইনেসের সঙ্গে ওভাবে কথা বলো না হে। কথাগুলো খুবই অশ্রদ্ধার।
ঘোড়ার ডিম, ব্রাউন মুখ ঝাটা দিল।
প্রিন্স স্খলিত পায়ে কেবিনে নিজের আসনে ফিরে এল।
প্রিন্সেস বলল, সেফটি বেল্টটা বেঁধে নাও লক্ষ্মীটি। যে কোন মুহূর্তে আমরা ডিগবাজি খেতে পারি। সত্যি বলছি, এ রকম ভয়ঙ্কর অবস্থায় কখনও পড়েছ কি? এখন মনে হচ্ছে না এলেই ভাল ছিল।
আমারও তাই মনে হচ্ছে, এলেক্সিস গজরাতে লাগল। একবার যদি মাটিতে পা রাখতে পারি, তাহলে আমার প্রথম কাজ হবে এই নির্লজ্জ বেয়াদব লোকটিকে গুলি করে মারা।
একটা বিদ্যুতের ঝিলিকে কালো মেঘগুলো ঝলসে উঠল। উড়োজাহাজটা মাতালের মত কাৎ হয়ে হঠাৎ নিচের দিকে নামতে লাগল। চীৎকার করে উঠল আনে; প্রিন্সেস সবরভ মূৰ্ছা গেল।
প্রিন্সেস সবরভ চেয়ারে বসেই ধাক্কা খেল। তার স্মেলিং সল্ট মেঝেতে ছিটকে পড়ল। টুপিটা নেমে এল একটা চোখের উপর; চুল এলোমেলো হয়ে গেল।
জেন বলল, তুমি বরং প্রিন্সেসকে দেখ আনে।
কোন জবাব নেই। ভাল করে লক্ষ্য করে জেন বুঝতে পারল, আনেৎ মূৰ্ছা গেছে।
জেন মাথা নাড়ল। ডেকে বলল, টিবস তুমি এখানে এসে প্রিন্সেসকে দেখ। আমি ব্রাউনের পাশে গিয়ে বসছি।
জেন বলল, শেষের ধাক্কাটা তুমি খুব সামলে নিয়েছ ব্রাউন। তোমার হাত খুব ভাল।
টিবস্ বলল, ধন্যবাদ। সকলে আপনার মত হলে কাজটা অনেক সহজ হত।
জেন বলল, উড়োজাহাজে সত্যি কোন গোলমাল দেখা দিয়েছে নাকি ব্রাউন?
টিবস্ জবাব দিল, হ্যাঁ। ঝড়ের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি; কোথায় এসেছি, কোন্ দিকে যাচ্ছি-কিছুই বুঝতে পারছি না। জানেন তো মিস, আফ্রিকায় অনেক পাহাড় আছে-বেশ উঁচু পাহাড়, যে কোন মুহূর্তে আমরা পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেতে পারি।
