টারজান দেখল মিছিলটা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, তার মধ্যে প্রাণ নেই। জনতার মধ্যে নেই কোন উল্লাস বা হর্ষধ্বনি।
টারজান আর ভালথরকে শৃংখলিত অবস্থায় পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বধ্যভূমির দিকে। তাদের দেখে জনতার ক্ষোভ বেড়ে যাচ্ছিল। ক্রীড়াঙ্গন নয়, যেন এক বধ্যভূমির দিকে নীরব নিষ্প্রাণ একটা মিছিল এগিয়ে চলেছিল ধীর গতিতে।
রাজপথের উপর দিয়ে গিয়ে দক্ষিণ দিকের নগরদ্বারে গিয়ে পৌঁছল শোভাযাত্রাটা। অবশেষে নগরদ্বার পার হয়ে পূর্ব দিকে ঘুরে ক্রীড়াঙ্গনে মিছিলটা যেতেই টারজান আর ভালথরকে শোভাযাত্রা থেকে বার করে কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। ঢোকার মুখে অনেক সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা ছিল।
আরো অনেক বন্দীকে টারজানদের কাছে আনা হলো। ভালথর টারজানকে বলল, এরা হচ্ছে সেই সব সামন্ত যারা এরিথরাদের দলে যোগদান করেনি। ফোরোস আর মেনোফ্রা মনে করে সব সামন্ত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করে তারা নিষ্কণ্টক হয়ে উঠবে। তাদের বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না। কিন্তু এভাবে শত্রুর শেষ করা যায় না। শত্রুর শেষ করতে গিয়ে আরো শক্ত বাড়াচ্ছে।
কুস্তিখেলা অর্থাৎ নিধনযজ্ঞ শুরু হলো। হাতির পিঠ থেকে নেমে মেনোফ্রা প্রজার জন্য নির্মিত মঞ্চে গিয়ে বসল।
টারজান ভালথরকে বলল, মোটা লোকটাকে সহজেই মারতে পারত ও।
পরের প্রতিযোগী ছিল একজন বৃদ্ধ লোক আর একটা সিংহ। বৃদ্ধের হাতে ছিল শুধু একটা ছোরা।
টারজান বলল, সিংহটাও বুড়ো। তার অনেকগুলো দাঁত নেই।
ভালথর বলল, তবু লোকটাকে মেরে ফেলার মত শক্তি ওর আছে।
সেই রক্ষীটি তখন টারজনের পাশ থেকে বিদ্রুপের সুরে বলল, তুমি কি সিংহটাকেও মেরে ফেলতে পারবে নাকি?
টারজান বলল, সম্ভবত পারব।
এ কথা শুনে হো হো শব্দে হেসে উঠল রক্ষীটি।
সিংহটার হাতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু ঘটল বৃদ্ধটির। এরপরই হায়ার্কের সঙ্গে টারজনের লড়াই এর অনুমতি দিল মেনোফ্রা। অফিসার অনুমতি পেয়ে ঘোষণা করল, একদিনের মধ্যে দুটো লোককে মারতে পারলে হায়ার্ককে ক্যাপ্টেন করবে রানী মেনোফ্রা।
সেই রক্ষী তখন অফিসারকে বলল, এই বুনো লোকটা বলছে সিংহটাকেও মারতে পারবে ও।
অফিসার বলল, তার আগে হায়ার্কই ত ওকে মেরে ফেলবে। তাহলে কি করে বুঝব ও সিংহ মারতে পারবে।
টারজান চীৎকার করে বলল, একই সঙ্গে হায়ার্ক আর সিংহটাকে সঙ্গে লড়াই করব অবশ্য হায়ার্ক যদি সিংহ দেখে ভয় না পায়।
অফিসার উৎসাহিত হয়ে বলল, তাহলে ত খুব ভাল কথা। এখনই অনুমতি নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে মেনোফ্রার অনুমতি নিয়ে এল অফিসার।
হায়ার্কের কিন্তু এ প্রতিযোগিতায় মন ছিল না। সে মেনোফ্রাকে জানাল তার স্ত্রী অসুস্থ। তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে তখনি। কিন্তু মেনোফ্রা বলল, সে যদি বুনো লোকটার সঙ্গে লড়াই না করে তাহলে তাকে সে খুন করবে।
টারজানকে একটা ছোরা দেয়া হলো। লড়াই শুরু হয়ে গেল। একটা সিংহকে ছেড়ে দেয়ার জন্য, লোক চলে গেল। হায়ার্ক ভাবল সিংহটা আসার আগেই টারজানকে মেরে ফেলতে পারলে তার আর কোন ভয় থাকবে না। তাই সিংহটা আসার আগেই সে তার বর্শাটা সজোরে ছুঁড়ে দিল টারজনের খোলা বুকটা লক্ষ্য করে।
কিন্তু টারজান এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বর্শার বাটটা ধরে ফেলল। তারপর বর্শাটাকে একধারে ছুঁড়ে ফেলে দিল। হায়ার্ক তখন তার তরবারিটা বার করতে গেল। কিন্তু আগেই টারজান লোহার মত শক্ত হাত দিয়ে তাকে ধরে বন্বন্ করে ঘোরাতে লাগল। দর্শকরা হর্ষধ্বনি করে অভিনন্দন জানাল টারজানকে।
এমন সময় সিংহটা টারজনের দিকে আসতে লাগল। টারজান তার ছোরাটা আগেই ঢুকিয়ে রেখেছিল তার কৌপীনের মধ্যে। তাতে দর্শকরা আরো আশ্চর্য হয়ে যায়।
টারজান তার পরিকল্পনা মত হায়ার্ককে ধরে সিংহের দিকে ছুঁড়ে দিল। হায়ার্ক উঠেই প্রাণভয়ে ছুটতে লাগল। টারজান জানত ছুটন্ত লোককে আগে ধরে সিংহরা। হলোও ঠিক তাই। হায়ার্ক যদি একপাশে দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে সিংহটা টারজানকেই ধরতে যেত। হায়ার্ক সিংহটার সঙ্গে ছুটে পেরে উঠল না। এক লাফে তাকে ধরে তার মাথাটা চিবোতে লাগল সিংহটা। মেনোফ্রার মঞ্চের কাছেই হায়ার্ক ধরা পড়ে সিংহের হাতে।
টারজান এবার ফেলে দেয়া বর্শাটা কুড়িয়ে নিয়ে সিংহটার কাছে নির্ভয়ে চলে গেল। সিংহটা তখন হায়ার্কের মৃতদেহটাকে খাচ্ছিল। তার কাছে গিয়ে টারজান হাত থেকে বর্শাটা ফেলে দিয়ে সিংহটার কেশর আর তার পিঠের আলগা চামড়া ধরে তাকে মৃতদেহটা সমেত শূন্যে তুলে ফেলল। তারপর তার অতি মানবিক শক্তির সাহায্যে সিংহটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে মেনোফ্রার মঞ্চের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। চেয়ারসমেত উল্টে পড়ে গেল মেনোফ্রা। কিন্তু তার কোন ক্ষতি হলো না। কারণ সিংহটা ভয়ে আর্তনাদ করছিল। সে উঠেই মুক্তির জন্য পালাতে লাগল।
চারদিকের তুমুল চীৎকার ও হৈচৈ স্তব্ধ হয়ে গেলে ভারপ্রাপ্ত অফিসার টারজনের কাছে এসে জানাল, তুমি সিংহটাকে মেনোফ্রার চেয়ারের উপর ফেলে না দিলে মেনোফ্রা তোমাকে মুক্তি দিত। এখন ও তোমাকে অবিলম্বে মারার জন্য আদেশ দিয়েছে। তোমাকে হাতির পায়ের তলায় পিষে মারা হবে।
রঙ্গভূমির কেন্দ্রে টারজান আর ভালথরকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাতিটা প্রথমে ওদের দেখতে পায়নি। সে পালাবার পথ খুঁজছিল।
