তোলোগ শেখকে বলল, বন্দীর একটা পোষা শয়তান আছে। সে হাতির রূপ ধরে এসে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
সব কিছু শুনে অনেক ভেবে শেখ বলল, কাল সকালেই আমরা শিবির গুটিয়ে উত্তর দিকে রওনা হব।
পরদিন সকালে কোনরকমে প্রাতরাশ সেরেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শিবির গুটিয়ে ফেলল ওরা। আরবরা ঘোড়ায় চাপল। ক্রীতদাসরা মালপত্র নিয়ে হেঁটে যেতে লাগল। আতিজা আর জায়েদ ঘোড়ায়। চড়ে পাশাপাশি যাচ্ছিল।
তিন দিন ধরে আরবরা উত্তর দিকে হাবাসের পথে এগিয়ে যেতে লাগল ধীরে গতিতে। এদিকে টারজানও তিন দিন ধরে জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রইল। হাতিটা। সর্বক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে লাগল। তিন দিন কোন খাদ্য বা একটু জল পর্যন্ত খেতে পায়নি। টারজান।
এই কদিনের মধ্যে মনু বা ছোট ছোট বাঁদরদের ডেকেছিল তার বাঁধনগুলো খুলে দেবার জন্য কিন্তু তারা কেউ তা পারেনি।
চতুর্থ দিন সকাল হতেই হাতিটা অশান্ত হয়ে উঠল। হাতিটা এই কদিন টারজানকে ফেলে দূরে। কোথাও যায়নি। কাছাকাছি ঘাসপাতা যা পেয়েছে তাই খেয়েছে। আজ সে তাই টারজানকে নিয়ে দূরে কোথাও যেতে চাইল।
কিন্তু টারজান সেখান থেকে যেতে চাইল না। কারণ সে ভাবল, বাঁদর-গোরিলারা যেখানে থাকে এই জায়গাটা হলো তার কাছাকাছি। নিশ্চয়ই এই পথে একদল বাঁদর-গোরিলা আসবে এবং তাদের মধ্যে দু একজন ঠিক টারজানকে চিনবে এবং দাঁত দিয়ে তার বাঁধনগুলো কেটে দেবে।
হাতিটা টারজানকে পিঠের উপর চাপিয়ে নিতেই টারজান বলল, আমাকে নামিয়ে দাও ট্যান্টর তুমি আমাকে দূরে নিয়ে গেলে আমার বাঁধন খোলার কাউকে পাব না।
তার কথা বুঝে হাতিটা তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
টারজান যা ভেবেছিল তাই হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল বাঁদর-গোরিলা ঘুরতে ঘুরতে টারজান যেখানে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিল সেখানে হাজির হলো।
টারজান বাঁদর-গোরিলাদের ভাষায় তাদের বলল, আমি হচ্ছি বাঁদরদলের টারজান। তোমাদের বন্ধু। টারমাঙ্গানীরা আমাকে ধরে আমার হাত পা বেঁধে রেখে দেয়। তোমরা এসে আমার বাঁধন খুলে দাও।
একটা গোরিলা বলল, তুমি হচ্ছ টারমাঙ্গানী।
টারজান আবার বলল, না আমি বাঁদরদলের রাজা টারজান।
গাছের উপর থেকে একটা মনু বা ছোট বাঁদর বলল, হ্যাঁ, ও টারজানই বটে। গোমাঙ্গানী আর টারমাঙ্গানীরা মিলে ওকে ধরে নিয়ে বেঁধে ফেলে। আজ চারদিন হলো ও এইভাবে বাঁধা আছে।
সহসা গাছের আড়াল থেকে একটা গোরিলা এগিয়ে এসে বলল, আমি জানি টারজানকে।
টারজান বলল, আগে আমার বাঁধনগুলো খুলে দাও।
মোয়ালাৎ টারজনের হাত ও পায়ের বাঁধনগুলো খুলে দিল। মুক্ত হয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াল টারজান। এমন সময় বাঁদর-গোরিলা দলের রাজা তোয়াৎ এসে হাজির হলো সেখানে। সে টারজানকে দেখেই মাটিতে ঘুষি মেরে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তার শক্তির আস্ফালন করতে লাগল। দলের রাজা হিসেবে যুদ্ধে আহ্বান করতে লাগল টারজানকে। মোয়ালাৎ বলল, ও হচ্ছে মাঙ্গানীদের বন্ধু।
তোয়াৎ বলল, না, ও হচ্ছে টারমাঙ্গানী ও মাঙ্গানীদের শত্রু। ওকে মেরে ফেলো।
গয়াৎও মোয়ালাতের দলে এসে বলল, আমি যখন ছোট ছিলাম এই টারজানই আমাকে সিংহের কবল থেকে বাঁচায়। ও আমাদের বন্ধু।
বাঁদর-গোরিলারা একটা বিষয় নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামায় না। তোয়াৎ যখন দেখল অনেক গোরিলা এক এক করে টারজনের দলে এল তখন সে আহারের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেল। টারজান সেই বাঁদর দলেই রয়ে গেল তাদের বন্ধু হিসেবে।
জেমস হান্টার ব্লেক নামে এক ধনী আমেরিকান যুবক উইলবার স্টিম্বল নামে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে সঙ্গে করে অভিযানে বার হয় আফ্রিকা জঙ্গলে। আফ্রিকার যত সব ভয়ঙ্কর জীব-জন্তুগুলোকে যতদূর সম্ভব চলচ্চিত্রের ক্যামেরায় ধরে রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
তাদের সঙ্গে কিছু নিগ্রো আদিবাসী ছিল; তারা মালপত্র বহন করত, যাবতীয় কাজকর্ম করত। তারা সাবই স্টিম্বলের নির্দেশে চলত। কিন্তু স্টিম্বলের মেজাজটা ছিল বড় রুক্ষ্ম। কথায় কথায় সে ঝগড়া করত যার তার সঙ্গে। একদিন তার দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে চলচ্চিত্রের ক্যামেরাম্যান দল ছেড়ে চলে যায়। ফলে আফ্রিকার অরণ্য জীবনের সচিত্র ছবি তোলার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
দুপুরে এক জায়গায় শিবির স্থাপন করতে বলল ব্লেক। ঠিক হলো ব্লেক শিবিরেই থাকবে আর স্টিম্বল একদল নিগ্রো যোদ্ধাকে নিয়ে শিকারে যাবে।
স্টিম্বল শিকারে চলে গেল। মাইলখানেক যাবার পর একটা বিরাটকায় বাঁদর-গোরিলা দেখতে পেল সে। গোরিলাটা সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্টিম্বল তাকে পিছন থেকে গুলি করল। গুলিটা লাগল না তার গায়ে। গোরিলাটা গাছের আড়ালে আড়ালে পালাতে লাগল। কিন্তু তাকে দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলি করতে লাগল স্টিম্বল। সে তার নিগ্রো যোদ্ধাদের জিজ্ঞাসা করল, ওটা কি জন্তু?
তারা বলল, গোরিলা।
স্টিম্বল বলল, ওটাকে আমি ধরে নিয়ে যাব।
এদিকে টারজান তখন কাছাকাছি একটা গাছের উপর স্টিম্বলের গুলির আওয়াজ শুনতে পায়। সে গাছের উপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখল, একটা বাঁদর-গোরিলা গুলির ভয়ে গাছপালা ভেঙ্গে ছুটে পালাচ্ছে আর তার পিছনে বন্দুক হাতে একজন শ্বেতাঙ্গ তাকে মারতে যাচ্ছে।
