টারজান সেই জানালা দিয়ে উপর তালায় উঠে গরাদহীন জানালার ভিতর দিয়ে দোতলার অন্ধকার ঘরটায় পড়ল।
একটা ঘর থেকে জোর বাক-বিতণ্ডার শব্দ আসছিল। টারজান বুঝল ফোরোস আর মেনোফ্রার মধ্যে। জোর ঝগড়া হচ্ছে। হঠাৎ সেই ঘরের মেঝের উপর একজনের পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। তারপরই সব চুপ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফোরোস দরজা খুলে একটা রক্তমাখা তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে। আসতে লাগল।
টারজান তখন সেই অন্ধকার ঘরখানার মধ্যে দরজটা অর্ধেক খুলে তার পাশে লুকিয়ে রইল। সে দেখল ফোরোস সেই বারান্দাটার শেষ প্রান্তে গিয়ে আর একটা বারান্দায় গিয়ে পড়ল। টারজান অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগল।
তারপর দেখল ফোরোস চাবি বার করে একটা ঘরের তালা খুলে তার মধ্যে ঢুকে পড়ল। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করল না। টারজানও দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে নিঃশব্দে এমনভাবে ঢুকে পড়ল যে ফোরোস তা টের পেল না। চর্বি দিয়ে জ্বালানো একটা প্রদীপের আলোয় স্বল্প আলোকিত ছিল ঘরখানা।
সেই ঘরের এক কোণে হাত পা বাঁধা অবস্থায় গনফালা শুয়ে ছিল। আর এক কোণে সেইভাবে শুয়েছিল স্ট্যালিন উড।
ফোরোস হঠাৎ তরোয়ালটা নিয়ে গনফালার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সে তরোয়ালটা ধরে গনফালাকে হত্যা করার জন্য তুলতেই টারজান সেটা পিছন থেকে কেড়ে নিয়ে ফোরোসকে ফেলে দিল মেঝের উপর।
টারজান চাপা গলায় বলল, চুপ করে থাকবে, তা না হলে তোমায় খুন করব।
ফোরোস দেখল নগ্নপ্রায় এক দৈত্যাকার মূর্তি তারই তরোয়ালটা তার বুকের উপর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ফোরোস বলল, কে তুমি? বল কি চাও? তুমি যা চাও তাই দেব, শুধু আমাকে প্রাণে মেরো না।
টারজান বলল, আমি যা চাই তা আমি ঠিক নেব, তুমি নড়বে না।
এই বলে সে প্রথমে উডের ও তারপর গনফালার বাঁধন কেটে দিল। এরপর উডকে বলল, ফোরোসকে বেঁধে ফেল। তার মুখটাও বেঁধে দাও যাতে চেঁচাতে না পারে।
উড তাই করলে টারজান তাকে বলল, এখানে কি করে এলে?
উড বলল, আমি গনফালার খোঁজ করতে করতে এই নগরে এসে পড়ি। তারপর ওরা বন্দী করে আমায়। স্পাইক স্ট্রোলকেও ওরা বন্দী করে রেখেছে। তাদের কাছ থেকে গনফালটাও নিয়ে নিয়েছে।
এরপর তিনজনেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সহসা বারান্দায় কার পায়ের শব্দ শুনতে পেল ওরা। সঙ্গে সঙ্গে দরজা ঠেলে দরজার সামনে একবার দাঁড়িয়ে তাদের দেখে নিল মেনোফ্রা। তার মাথা ও কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছিল তখনো। তার পোশাকটা রক্তে ভিজে গেছে।
মেনোফ্রা কিছু না বলে দরজাটায় তালা দিয়ে রক্ষীদের ডাকতে গেল।
উড বলল, আমরা বেশ ফাঁদে পড়লাম।
গনফালা বলল, কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য! উড বলল, রক্ষীরা ছুটে আসছে।
বারান্দায় মেনোফ্রার সঙ্গে রক্ষীদের কথাবার্তা হচ্ছিল।
মেনোফ্রা দরজা খুলে রক্ষীদের বলল, একটা বুনো লোক ঢুকে বন্দীদের মুক্ত করে দিয়েছে আর রাজাকে বেঁধে রেখেছে। ওরা রাজাকে মেরে ফেলতে পারে। আমি সেটা চাই না। আমি নিজের হাতে রাজাকে মারতে চাই। তোমরা বিদেশীদের বন্দী করে রাজাকে আমার কাছে নিয়ে এস।
টারজান দরজার কাছে গিয়ে রক্ষীদের বলল, যদি তোমরা আমার বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢোক তাহলে রাজাকে আমি হত্যা করব।
রক্ষীরা মুস্কিলে পড়ল। কি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল মেনোফ্রার সঙ্গে।
উড ফোরোসকে বলল, রানী তোমাকে পেলে মেরে ফেলবে।
কিন্তু মুখ বন্ধ থাকায় ফোরাস কোন কথা বলতে পারল না।
টারজান বলল, ভালথর আমাদের কোনভাবে সাহায্য করতে পারে না?
উড বলল, তাকে ওরা ক্রীতদাস করে রেখেছে।
টারজান বলল, আমি ক্যাথনিতেই এসব শুনেছিলাম। তাই এখানে এসে ভালথরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম।
এমন সময় দরজায় কারা ঘা দিল।
টারজান বলল, কি চাও তোমরা?
রক্ষীরা দরজা খুলে বলল, রাজাকে রানীর হাতে তুলে দাও। তাহলে তোমাদের মুক্তি দেয়া হবে। কোন ক্ষতি করা হবে না।
টারজান তখন উডকে রাজার মুখের বাঁধন খুলে দিতে বলল।
ফোরোস কাতর মিনতির সুরে বলল, আমাকে তোমরা রানীর হাতে তুলে দিও না। ও আমাকে খুন করবে।
টারজান বলল, আমরা তাহলে একটা চুক্তি করতে পারি।
ফোরোস বলল, যে কোন শর্ত আমি মেনে নেব।
টারজান বলল, আমাদের মুক্তি দিয়ে প্রহরীসহ থেনার উপত্যকা পার করে দিতে হবে।
ফোয়োস বলল, কথা দিচ্ছি তাই হবে।
উড বলল, হীরের তালটাও দিতে হবে।
হ্যাঁ, তাই দেয়া হবে।
টারজান বলল, কি করে জানব তুমি তোমার কাজ করবে? আমরা তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। তারপর ছেড়ে দেব।
ফোয়োস বলল, আমি তোমাদের সব দাবি মেনে নেব। শুধু রানীর হাতে আমাকে তুলে দিও না।
টারজান বলল, আর একটা কথা। ভালথরকে মুক্তি দিতে হবে।
সে দাবিও মঞ্জুর করলাম!
উড টারজানকে বলল, ফোরোসকে তুমি নগরের বাইরে নিয়ে গেলেই ওরা অন্য কাউকে রাজা করবে।
এরপর সে ফোরোসকে বলল, রক্ষীরা তোমার কথা শুনবে ত?
ফোরোস বলল, তা ত জানি না। ওরা সবাই রানীকে ভয় করে।
টারজান এবার ফোরোসের বাঁধন খুলে বলল, আমার সঙ্গে দরজার সামনে চল।
ফোরোস মেনোফ্রাকে বলল, আমার কথা শোন।
মেনোফ্রা বলল, কোন কথা শুনব না, খুনী কোথাকার। আমি শুধু তোমাকে একবার আমার হাতে পেতে চাই।
ফোয়োস বলল, আমার কথা শোন। ক্যান্ডোকে ডেকে পাঠাও। তাকে সব কথা বল।
মেনোফ্রা রক্ষীদের বলল, কাপুরুষদের দল, দেখছ কি? তাদের টেনে বার করে আন ঘর থেকে।
