এটা জেমননের কাছ থেকে শিখেছিল সে। জেমনন অকে বলেছিল এ্যাথনির লোকেরা বিশ্বাস করে ডাইমন নামে এক প্রেতাত্মা রাত্রিতে ঘুরে বেড়ায় এবং ইচ্ছামত যে কোন মানুষের জীবন নাশ করতে পারে। তাই হঠাৎ কারো মৃত্যু ঘটলে বা রাত্রিতে কেউ মারা গেলে তারা বলে ডাইমন তাকে নিয়েছে।
টারজনের মুখ থেকে ‘ডাইমন’ নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল সেই লোকটা।
ছায়াচ্ছন্ন সেই রাস্তাটা দিয়ে এগিয়ে নগরের মাঝখানে রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি এসে পড়ল টারজান। সে শুনেছিল এ্যাথনির রাজপ্রাসাদের উত্তর ও দক্ষিণদিকের দরজাতেই দিনরাত পাহারা থাকে।
প্রাসাদের চারদিকে যে প্রাচীর ছিল, পশ্চিম দিকে গিয়ে সেই প্রাচীরের উপর উঠে পড়ল। টারজান উঠে দেখল তার গায়ে একটা সুন্দর সাজানো বাগান রয়েছে। সেই বাগানে নেমে সে একটা বড় বাড়ির কাছে চলে গেল। সে বুঝল এটাই রাজপ্রাসাদ। দেখল বাড়িটার মধ্যে অনেকগুলো ঘরে তখনো আলো জ্বলছে।
সেই সব ঘরগুলোর মধ্যে একটা ঘরে দেখল ভোজসভার অনুষ্ঠান চলছে। প্রশস্ত ঘরখানার মাঝখানে একটা বিরাট লম্বা টেবিলের চারদিকে প্রায় একশোজন তোক খাওয়ার পর ঝিমোচ্ছে। বেশির ভাগ লোকই অতিরিক্ত মদ খেয়ে মাতাল হয়ে উঠেছে। অনেকে কথা বলছে, হাসছে, আবার মারামারি করছে।
লোকগুলোকে দেখে ক্যাথনির সামন্তদের মত ভদ্র বলে মনে হলো না টারজনের। এই ভোজসভার যে প্রধান সে টেবিলের সামনে বসে ছিল। লোকটাকে একটা পশু বলে মনে হচ্ছিল। সে কেবল ভৃত্য ও ক্রীতদাসদের হুকুম করছিল। এই লোকটিই হলো রাজা ফোরোস।
এক সময় সেই গৃহস্বামী লোকটা টেবিল চাপড়ে একজন ক্রীতদাসকে বলল, আমি তাকে নিয়ে আসার জন্য বলিনি তোকে?
ক্রীতদাসটি বলল, কাকে হুজুর?
কেন, সেই মেয়েটিকে।
কোন্ মেয়েটিকে?
ক্রীতদাসটি ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, আমি আনতে পারব না। মেনোফ্রা তাহলে আমার পিঠের চামড়া তুলে নেবে।
ফোরোস বলল, মেনোফ্রা জানতে পারবে না। সে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফোরোসের পাশে যে একটা লোক বসেছিল সে কিন্তু অন্যান্যদের মত মাতাল হয়নি। সে ফোরোসকে পরামর্শ দিল, কাউকে পাঠিও না মেয়েটাকে আনার জন্য। ওকে আনতে হবে না। মেনোফ্রা তাহলে যে আনতে যাবে তার ও তোমার হৃৎপিণ্ড উপড়ে নেবে।
ফোরোস তখন চীৎকার করে বলে উঠল, তাহলে রাজা কে?
অন্য লোকটি বলল, মেনোফ্রাকে জিজ্ঞাসা করো একথা।
ফোরোস জোর গলায় বলল, আমি রাজা।
এই বলে সে একজন ক্রীতদাসকে ডাকল। কিন্তু ক্রীতদাসটা অন্য দিকে তাকিয় থেকে না শোনার। ভান করল। ফোরোস তখন একটা মদের পেয়ালা ছুঁড়ে দিল লোকটার দিকে। একটুর জন্য বেঁচে গেল। তার মাথাটা।
ফোরোস গর্জন করে বলল, যাও, মেয়েটাকে নিয়ে এস।
ক্রীতদাসটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে ফোরোস বলল, মেনোফ্রা যদি তার কাজে নাক গলাতে আসে তাহলে সে তাকে ছেড়ে দেবে না।
এই বলে জোরে হাসতে গিয়ে ফোরোস পড়ে গেল মাটিতে। এমন সময় সকলেই ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে মুখ তুলে তাকাল।
ঘরখানার বাইরে পিছন দিক থেকে সব দেখছিল ও শুনছিল টারজান। সারাক্ষণ নীরবে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল সে। তবে ফোরোসের কথা শুনে বুঝতে পারল না যে মেয়েটিকে সে আনতে বলল সে। মেয়েটি কে।
ঘরের সকলে দরজার দিকে মুখ তুলে তাকাতেই টারজানও সেদিকে তাকাল। সে দেখল, উঁচু পুরুষালি চেহারার একটি মেয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। টারজান দেখল মেয়েটার গালপাট্টা আর নাকের নিচে স্পষ্ট মোচের রেখা রয়েছে।
টারজান বুঝল এই মেয়েটাই ফোরোসের স্ত্রী মেনোফ্রা।
মেনোফ্রা সোজাসুজি ফোরোসকে জিজ্ঞাসা করল, এই অসময়ে তুমি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছ কেন?
ফোরোস অবাক হয়ে গেল। সে ভয় পেয়ে গেল।
ফোরোস বলল, আমরা এই উৎসবে যোগদান করার জন্য তোমাকে ডাকছিলাম।
মেনোফ্রা ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, কিসের উৎসব?
ফোরোস তার পাশের লোককে বলল, কিসের উৎসব ক্যান্ডো?
ক্যান্ডো কি উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে জিব দিয়ে ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নিতে লাগল।
মেনোফ্রা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আমার কাছে মিথ্যা কথা বলো না। আসলে তুমি আমাকে নয়, অন্য কোন মেয়েকে ডেকে পাঠিয়েছিলে।
এরপর যে ক্রীতদাস তাকে ডাকতে গিয়েছিল তার দিকে ঘুরে মেনোফ্রা বলল, বল আমাকে আনতে গিয়েছিল কি ও পাঠিয়েছিল তোমায়?
ক্রীতদাসটি নতজানু হয়ে বলল, হে মহীয়সী রানীমা, আমি ভেবেছিলাম উনি আপনাকেই আনতে।
ওকে কি বলেছিল তোমায়?
উনি বলেছিলেন, মেয়েটিকে নিয়ে এস। আমি যখন ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন্ মেয়েটি? তখন উনি বললেন এ্যাথনিতে ত একটিই মেয়ে আছে।
মেনোফ্রা এবার ভ্রূকুঞ্চিত করে বলল, এবার বুঝেছি কোন্ মেয়ে। সেই বিদেশী মেয়েটা যাকে দুটো লোকের সঙ্গে ধরা হয়েছিল। অনেকদিন থেকেই তুমি এটা চাইছিলে। কিন্তু সাহস পাওনি।
এরপর মেনোফ্রা উপস্থিত সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল ঘর থেকে। বলল, যত সব শুয়োরের দল। বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।
এই বলে সে সোজা ফোরোসের কাছে গিয়ে তার একটা কান ধরে বলল, এই রাজামশাই, তুমি এবার আমার সঙ্গে এস ত।
টারজান এবার সেই ঘরের বাইরে জানালা থেকে সরে গিয়ে দোতলার দিকে তাকাল। তার মনে হলো দোতলার কোন একটা ঘরেই শুয়ে আছে গনফালা। চুপ করে উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে তার তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তির দ্বারা উপর তলার ঘর থেকে আসা গন্ধের শ্রেণীবিশ্লেষণ করে দেখতে লাগল সে। নাক ডাকার শব্দে সে বুঝতে পারল সে ঘরে কেউ একজন ঘুমোচ্ছে। সে ঘরটা ছিল একেবারে অন্ধকার।
