একজন যোদ্ধা চীৎকার করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দেখা গেল দূরে একটা বাঁশবন থেকে সেই বুনো হাতিটা বেরিয়ে আসছে।
ভালথর উডকে সাবধান করে দিল, হাতিটা আকারে বিরাট এবং একেবারে বুনো। ও এই দিকেই আসছে। একটুও ভয় নেই। তুমি সাবধানে এগোবে, রক্ষীরা যাই বলুক বেশি এগোবে না ওর কাছে তাহলে সংযত করতে পারবে না তোমার হাতিকে।
উড বলল, এত বড় হাতি আমি কখনো দেখিনি।
ভালথর বলল, আমিও না। ওর দাঁতটা আবার কালো।
উড বলল, এখন আমাদের কি করতে হবে? কিভাবে ওকে বশ করা হবে আমি ত তার কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।
ভালথর বলল, কয়েকটা মেয়ে হাতিকে ওর আশে পাশে পাঠিয়ে ওকে ভুলিয়ে নগরদ্বারের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।
এমন সময় বুনো হাতিটা ওদের দেখে তার গুঁড়টা তুলে কুদ্ধভাবে গর্জন করতে লাগল। যে অফিসার ওদের নেতৃত্ব দান করছিল সে কয়েকজন ক্রীতদাসকে তাদের মেয়ে হাতি নিয়ে বুনো হাতিটার কাছে। যেতে বলছিল।
কিন্তু বুনো হাতিটা মেয়ে হাতিদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অফিসার যে পুরুষ হাতিটার পিঠে চেপে ছিল সেই পুরুষ হাতিটাকে আক্রমণ করল। হাতিটা পড়ে যেতে তার পিঠ থেকে অফিসারও পড়ে গেল। অফিসারের আর্ত চীৎকারের সঙ্গে বুনো হাতিটার গর্জন মিশে গেল। অফিসার ছুটে পালাতে লাগল।
ভালথর উডকে নিয়ে তাদের মেয়ে হাতি দুটোকে চালিয়ে বুনো হাতিটার দিকে যেতে লাগল। কিন্তু তারা তার কাছে যাবার আগেই বুনো হাতিটা ছুটতে থাকা অফিসারকে হুঁড় দিয়ে ধরে পা দিয়ে পিষে ফেলল।
তার ক্রোধের বস্তুটাকে ইচ্ছামত মেরে পিষে ফেলার পর শান্ত হয়ে লেজ নাড়ছিল বুনো হাতিটা। ঠিক তখনি ভালথর আর উড তাদের দুটো মেয়ে হাতি নিয়ে গিয়ে বুনো হাতিটার দুপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন আর পাগলামির চিহ্নমাত্র নেই তার মধ্যে।
এ্যাথনির লোকেরা হাতি ধরার সময় অনুচ্চ স্বরে এক ধরনের সুরের গান গাইত। সে গানের কোন বাণী ছিল না।
দুটো মেয়ে হাতির মাঝখানে বুনো হাতিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল নগরের দিকে। আর কোন দৌরাত্ম্য দেখাল না। অন্যান্যরা তাদের পিছু পিছু আসতে লাগল।
সকলেই ভালথরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে লাগল। উড তাকে বুনো হাতি ধরতে সাহায্য করায় তার কথা রাজপ্রাসাদে চলে গেল।
পরদিন একজন অফিসার এসে উডকে জানাল ফোরোস তাকে দেখতে চেয়েছে।
সূর্য কিছুক্ষণ আগে পশ্চিম আকাশটাকে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নিঃশব্দে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছিল থেনারের উপত্যকার উপরে। টারজান তখন একা ক্যাথনি থেকে এ্যাথনি নগরীর দিকে এগিয়ে আসছিল গনফালার খোঁজে।
টারজনের সহায়তায় যুড়ো ক্যাথনির সিংহাসনে বসার পর সে টারজানকে একা এ্যাথনিতে যেতে নিষেধ করে। জেমননও তাকে এ কাজ থেকে প্রতিনিবৃত্ত করার অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু কারও কথা শোনেনি টারজান। সঙ্গে কোন সেনাদল না নিয়েই একা যাবে এ্যাথনিতে।
যুডো তখন তাকে বলে, ঠিক আছে, তুমি যাও। কিছুদিনের মধ্যে ফিরে না এলে তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি এক সেনাদল পাঠাব।
টারজান বলল, আমি ফিরে না এলে বুঝবে আমি মরে গেছি।
যুডো বলল, ওরা তোমাকে মারবে না। ওদের নগরে এখন কাজের লোকের দরকার। তোমার মত চেহারার লোককে ওরা কিছুতেই মারবে না।
জেমনন বলল, হাতির পরিচর্যা না করিয়ে তোমাকে ওরা যুদ্ধের কাজে লাগাবে।
থেনারের উপত্যকায় অনেক সিংহ আছে বলে দিনেরবেলায় সেদিকে পথ চলত না টারজান। থেনারের উপত্যকার সিংহগুলো সাধারণ সিংহ নয়। তাদের বেশির ভাগই ক্যাথনি থেকে পালিয়ে মানুষ শিকারের জন্য প্রশিক্ষণ পাওয়া সিংহ। তাদের মানুষের মাংস খেতে দেয়া হত।
টারজান দেখল তার সামনে কিছুদূরে একটা পাহাড়ের উপর চাঁদ উঠেছে।
টারজান তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল। সে ডাক শুনে বুঝল মোট পাঁচটা সিংহ একসঙ্গে আসছে। সে আরও বুঝল সিংহগুলো তার পিছনে এক মাইল দূরে আছে আর তার সামনে যে বন আছে তার দূরত্ব সেখান থেকে তিন মাইল।
এবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল টারজান। কিন্তু বনের কাছে যেতেই দেখল সামনে একটা সিংহ তার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে তার পিছনে সেই পাঁচটা সিংহ এগিয়ে আসছে দ্রুত গতিতে। টারজান তখন তার বুকের ভিতর থেকে বাদর গোরিলাদের মত এক ভয়ঙ্কর শব্দ বার করে চীৎকার করে উঠতেই তার পথ থেকে সরে গেল সিংহটা। টারজান এক লাফে একটা গাছের ডালে গেল উঠে পড়ল। এদিকে সেই পাঁচটা সিংহ তাকে ধরার জন্য লাফ দিল একসঙ্গে।
টারজান গাছের অনেক উপরে তাদের নাগালের বাইরে উঠে গিয়ে গাছ থেকে পাতা আর শুকনো ডাল ফেলে সিংহগুলোর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে তাদের রাগিয়ে দিল আরও। তারপর সেখানে আর সময় নষ্ট না করে গাছের ডালে ডালে এ্যাথনির দিকে চলে গেল।
বাগানটার একদিকে একটা টিনের চালা ছিল। তার মাথায় উঠে দেখল সেদিকে প্রাচীরের ওপারেই একটা রাস্তা নগরের মধ্যে চলে গেছে। টিনের চাল থেকে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ল টারজান।
চাঁদের আলোয় পথঘাট সূব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। পথে কোন লোক ছিল না। পথের দু’ধারের বাড়িগুলোর সব দরজা বন্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সহসা টারজান দেখল একটা বাড়িতে জানালা খুলে একটা লোক তাকে প্রশ্ন করল, কে তুমি? এত রাতে এখানে কি করছ?
টারজান অনুচ্চ গলায় উত্তর করল, আমি ডাইমন।
