টারজান বলল, যাদের হাতে মশাল আর বর্শা আছে তারা সামনে এগিয়ে এস।
এই বলে সে নিজে একটা মশাল ধরে কয়েকজনকে মশাল নিয়ে তার সঙ্গে সিংহগুলোর মুখের কাছে যেতে বলল। অন্যান্য জন্তুদের মত সিংহরাও আগুনকে ভয় করে। মুখের কাছে জ্বলন্ত মশালের আঁচ পেয়ে সিংহগুলো পিছিয়ে যেতে লাগল। তাদের রক্ষীরাও পিছু হটতে লাগল।
জনতা এবার অধৈর্য হয়ে প্রাসাদের মধ্যে ঢুকতে চাইল। টারজান তাদের বলল, থাম, সিংহগুলোকে আগে চলে যেতে দাও। তারপর আমি আলেক্সটার আর তোমার কাছে যাব।
ফোবোগ এগিয়ে এসে বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
টারজান জনতাকে বলল, আমরা সামনের গেট দিয়ে নয়, পিছনের দরজা দিয়ে যাব। তোমরাও। আমাদের সঙ্গে চল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে টারজান দেখল একটি ঘরের মধ্যে রাজা আলেক্সটার কয়েকজন। সামন্তের সঙ্গে নৈশভোজন করছে। বিক্ষুব্ধ জনতার ধ্বনি ক্রমাগত শুনতে শুনতে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। তার উপর শিকারী সিংহরা জ্বলন্ত মশালের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছে শুনে আরো ভয় পেয়ে গেছে সে। তোমো। তাকে বোঝাচ্ছিল সিংহরা পালালেও প্রাসাদের যোদ্ধারা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেবে।
আলেক্সটার বলল, তোমার জন্যই এমন হলো তোমো। সব তোমারই দোষ। তুমি ঐ বুনো লোকটাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে বলেছিলে। তার ফলে কি হলো দেখ। জনগণ আমাকে সিংহাসনচ্যুত ও হত্যা করতে চাইছে। এখন কি করব?
আলেক্সটারের মত তোমোও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জনতাও তার মৃত্যু চায়-এই ধ্বনি সে নিজের কানে শুনেছে।
তোমো তাই একটা পরিকল্পনা খাড়া করে বলল, ঠিক আছে, বুনো লোকটাকে এখানে আনাও। তাকে মুক্তি দিয়ে কিছু টাকা দিয়ে দাও। তারপর জনতাকে একথাটা জানিয়ে দাও লোক মারফৎ।
আলেক্সটার সেইমত আদেশ দিল তার লোকদের।
তোমো বলল, তারপর অবশ্য আমরা এক কাপ মদ পান করতে দিতে পারি লোকটাকে।
সঙ্গে সঙ্গে টারজানকে উপরতলা থেকে আনার জন্য একজন সামন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরোতেই সে দেখল টারজান দাঁড়িয়ে আছে। সে তাদের কথা শুনছিল।
সামন্ত ফিরে এসে ঘরে ঢুকে আলেক্সটারকে জানাল, টারজান এসে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে টারজান ঘরে ঢুকে পড়ল। তার পিছু পিছু ফোবেগ ও জনতার একটি অংশ ঘরে ঢুকে পড়ল।
তাদের দেখে আলেক্সটার, তোমা ও সামন্তরা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আলেক্সটার ও তোমো দু’জনে পালাবার চেষ্টা করছিল ভিতরের দরজা দিয়ে। কিন্তু টারজান এগিয়ে গিয়ে ধরে ফেলল তাদের।
কোন সামন্তই তরবারি কোষমুক্ত করে এগিয়ে এল না আলেক্সটারের সাহায্যে। তারা সকলেই তাকে ছেড়ে চলে গেল।
আলেক্সটার টারজনের সামনে নতজানু হয়ে তার জীবন ভিক্ষা করতে লাগল। সে বলল, তুমি বিশ্বাস করো, কিছুক্ষণ আগেই আমি আদেশ দিয়েছি তোমাকে মুক্ত করে দেবার জন্য। তোমাকে এখানে এনে অনেক ধনরত্নও দিতাম। তোমার জন্য একটি প্রাসাদ, দাসদাসী এবং অনেক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দিতাম।
টারজান বলল, এ কথা সেই সিংহপ্রান্তরে তোমার ভাবা উচিত ছিল। তোমার দান আমি গ্রহণ করি বা না করি, জনগণ অন্তত এভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠত না।
আলেক্সটার বলল, তাহলে এখন আমাকে নিয়ে কি করতে চাও তোমরা?
টারজান বলল, তোমার প্রজারা কি করবে তা জানি না, তবে যুডোকে যদি তারা রাজা না করে তাহলে ভুল করবে।
টারজান জানত সামন্তদের মধ্যে যুডোই রাজা হবার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। সে অভিজাতবংশীয়। দ্র, উদার এবং মার্জিত স্বভাব। জনগণ তাকে ভালবাসে।
টারজনের মুখ থেকে যুডোর নাম শুনে তার নামে সমর্থনের ধ্বনি দিতে লাগল জনগণ।
তা শুনে আলেক্সটারের মুখখানা ভয়ে সাদা হয়ে গেল। সে তখন ধীর পায়ে তোমোর কাছে গিয়ে বলল, তুমিই আমার এই সর্বনাম করলে। আমার বোনের আমলে তুমি আমাকে চক্রান্ত করে বছরের পর বছর ধরে কারাগারে বন্দী করে রাখ। তুমিই আমার বোনের জীবন মাটি করে দাও। আমার জীবনকেও কুপরামর্শ দিয়ে মাটি করে দিয়েছ। তোমার জন্যই আমি সিংহাসন হারালাম। কিন্তু আর তুমি কারো সর্বনাশ করতে পারবে না।
এই বলে সে মুহূর্তের মধ্যে খাপ থেকে তরবারি খুলে এত তাড়াতাড়ি এবং এত জোরে তোমোর মাথায় মারল যে তার মাথাটা দু’ফাঁক হয়ে গেল চোখের নিমেষে।
তার বোন নেমোনি যেমন একদিন পাগল হয়ে গিয়েছিল, তেমনি আলেক্সটারও পাগল হয়ে গেল। তোমোকে হত্যা করার পর সে এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সেই তরবারিটা নিজের বুকে ঢুকিয়ে দিল।
তারপর পড়ে গেল।
এইভাবে ক্যাথনির রাজবংশের শেষ রাজা আলেক্সটারের জীবনের অবসান ঘটল।
ক্যাথনি থেকে যে পথটা এ্যাথনি নগরের দিকে চলে গেছে সেই পথ দিয়ে যেতেই এ্যাথনির দক্ষিণ দিকের নগরদ্বার পাওয়া যায়। নগরদ্বারের সামনে আছে এক বিস্তীর্ণ সমতল প্রান্তর। সেখানে যোদ্ধারা
হাতিদের প্রশিক্ষণ দেয়। নগরের উত্তর দিকে আছে প্রচুর চাষের জমি। সেখানে ক্রীতদাসরা চাষের কাজ করে।
তখন বিকাল বেলা। নগরদ্বারের উপরে যে পর্যবেক্ষণের ঘর ছিল সেখানে প্রহরীরা দিনরাত পাহারা দেয়।
সহসা একজন প্রহরী বলে উঠল, দক্ষিণ দিক থেকে একটা লোক আসছে।
পাশা খেলতে খেলতে অন্যান্য প্রহরীরা বলল, কত জন?
বললাম ত একজন।
তাহলে বিপদসূচক ঘণ্টা বাজাবার দরকার নেই। কিন্তু একা এ্যাথনিতে কে আসবে? ও কি ক্যাথনির লোক?
