আলেক্সটার আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল একবার টারজান সিংহটার পিঠে আর একবার সিংহটা টারজনের পিঠে চেপে দু’জনেই গড়াগড়ি দিতে লাগল। তবে টারজান বারবার ছুরিটা বসাতে লাগল সিংহটার ঘাড়ে।
এদিকে রাজার দেহরক্ষীরা লড়াইরত টারজান ও সিংহটাকে চারদিকে ঘিরে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু টারজানকে বাদ দিয়ে সিংহটার গায়ে বর্শা দিয়ে আঘাত করার কোন সুযোগই পাচ্ছিল না তারা।
অবশেষে আপনা থেকে অবশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সিংহটা। টারজান তার মৃতদেহের উপর একটা পা রেখে আকাশের দিকে মুখ তুলে বাঁদর-গোরিলাদের মত এমন অদ্ভুতভাবে চীৎকার করল যা শুনে ভয় পেয়ে গেল আলেক্সটার। আগে সে সিংহটাকে ভয় করছিল এখন তার ভয় এই লোকটাকে। তার মনে হলো এ লোক সিংহের থেকেও ভয়ঙ্কর। এ নিশ্চয় তাকে একদিন খুন করবে।
একজন সামন্ত আলেক্সটারকে জিজ্ঞাসা করল, এখন কি করব একে নিয়ে?
আলেক্সটার বলল, ওকে নিয়ে যাও। ওকে মেরে ফেল।
সামন্ত বলল, কিন্তু ও আপনার জীবন রক্ষা করেছে।
আলেক্সটার বলল, এখন নিয়ে যাও। ঘরে আটক করে রাখ। পরে যা হয় করা যাবে।
সামন্ত রক্ষীদের টারজানকে আবার সেই কারাকক্ষে নিয়ে যেতে বলল। আলেক্সটারের কথায় সে নিজেই লজ্জিত হলো। সেও বন্দী টারজনের সঙ্গে প্রাসাদের দিকে যেতে লাগল। পথে সে টারজানকে বলল, তুমি যা করেছ তার জন্য এর থেকে অনেক বড় পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল।
টারজান বলল, আমি নিজে শুনেছি রাজা বলেছিল সিংহটাকে কেউ মারতে পারলে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে তাকে। সে যা চাইবে তাই দেয়া হবে।
হ্যাঁ আমিও শুনেছি।
আমার মনে হয় উনি তা ভুলে গেছেন।
কিন্তু তুমি কি চাইতে?
কিছুই না।
সামন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, সেকি! কিছুই না?
শত্রুর কাছ থেকে আমি কিছুই চাই না।
সামন্ত বলল, আমার কাছে বলতে পার, আমি ত তোমার শত্রু নই।
আমি সকাল থেকে কোন খাদ্য বা পানীয় পাইনি।
তুমি দুটোই পাবে।
টারজানকে এবার রাজপ্রাসাদের অন্য একদিকের দোতলায় রাস্তার দিকের একটি ঘরে রাখা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন যোদ্ধা দরজা খুলে ঘরে ঢুকে টারজানকে খাবার দিয়ে গেল।
যোদ্ধাটি বলল, সিংহের সঙ্গে তোমার লড়াই আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি রানী নেমোনির সামনে ফোবেগের সঙ্গে তোমার লড়াইও দেখেছিলাম। ফোবেগকে তুমি হারিয়ে দিয়েছিলে। তাকে তুমি তখন মেরে ফেলতে পারতে। জনতা তাকে মারবার জন্য বারবার উত্তেজিত করছিল তোমায়। তবু তাকে তুমি মারনি।
টারজান বলল, ফোবেগ এখনো বেঁচে আছে?
হ্যাঁ, সে এখন মন্দিরে রক্ষীর কাজ করছে।
তাকে আমার শুভেচ্ছা জানিও।
যোদ্ধাটি এবার টারজনের কাছে এসে তার কানে কানে বলল, কোন মদপান করবে না এখানে। আর কোন ঘরে ঢুকলে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াবে।
টারজান ভেবে দেখল যোদ্ধাটি তাকে ঠিক পরামর্শ দিয়েছে। মদের সঙ্গে ওরা বিষ মিশিয়ে দিতে পারে আর তাকে পিছন থেকে মারার জন্য কোন আততায়ীকে পাঠাতে পারে। সে বুঝল ক্যাথনির যোদ্ধাদের মধ্যে তার অনেক বন্ধু আছে।
টারজান দেখল, রাজপথের ওধারে একদল লোক জড়ো হয়ে কি বলাবলি করছে। তারা মাঝে মাঝে রাজপ্রাসাদের দিকে তাকাচ্ছে।
টারজান দেখল জনতার ভিড় ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। চারদিক থেকে বহু লোক এসে যোগ দিচ্ছে সেই জনতার সঙ্গে। তাদের মধ্যে অনেক যোদ্ধাও ছিল। অন্ধকার হয়ে উঠলে অনেকে মশাল হাতে ছোটাছুটি করতে লাগল। তারা প্রাসাদের সামনে এসে জড়ো হতে লাগল।
প্রাসাদ থেকে একজন সামন্তর অধীনে একদল যোদ্ধা. এসে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করল। কিন্তু জনতা চীৎকার করে বলে উঠল, টারজানকে ছেড়ে দাও। তাকে মুক্ত করে দাও।
বলিষ্ঠ চেহারার একজন লোক হাতের জ্বলন্ত মশালটা নাড়িয়ে চীৎকার করে উঠল, ধিক আলেক্সটারকে। তার লজ্জা হওয়া উচিত।
টারজান চিনতে পারল লোকটি হলো ফোবেগ।
এরপর রাজার যোদ্ধাদের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার মারামারি শুরু হয়ে গেল। অনেকের মাথা ভাঙ্গল। অনেকে আহত হলো। রাজার যোদ্ধারা হেরে গিয়ে প্রাণ নিয়ে কোনরকমে পালিয়ে গেল প্রাসাদের মধ্যে।
গোটা রাজপথ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ে। প্রাসাদের সামনে গেটের উপর করাঘাত করতে করতে জনতা ধ্বনি দিতে লাগল, তোমো নিপাত যাক। তোমার মৃত্যু চাই।
এমন সময় জনতার মধ্য থেকে একজন লোক বলল, আলেক্সটার শিকারী সিংহদের ছেড়ে দিয়েছে আমাদের মারার জন্য। আলেক্সটার নিপাত যাক।
টারজান দেখল প্রাসাদের আস্তাবল থেকে পঞ্চাশটা শিকারী সিংহকে দড়ি ধরে তাদের রক্ষীরা এগিয়ে আসছে জনতার দিকে। এদিকে জনতার ক্ষোভ তখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা তবু ছুটে পালাল না সিংহদের ভয়ে। তারা সমানে ধ্বনি দিতে লাগল টারজনের মুক্তির জন্য।
টারজান তখন আর চুপ করে থাকতে পারল না। তারই জন্য এতগুলো লোক জীবন বিপন্ন করে লড়াই করছে অথচ তাদের জন্য কিছুই করতে পারবে না সে। না, সে আর কিছুতেই দাঁড়িয়ে থাকবে না চুপ করে।
তাই সে গর্জন করে জানালার গরাদগুলো ভেঙ্গে দেখল, জানালার নিচে উঠোনটা একেবারে খালি। উঠোনের বাইরেই রাজপথ। রাজপথে সমবেত জনতার দিকে সিংহগুলোকে নিয়ে তাদের রক্ষীরা এগিয়ে। আসছে।
টারজান জানালা থেকে উঠোনটায় নেমে পিছনের দরজা দিয়ে সোজা জনতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জনতার মধ্য থেকে কয়েকজন তাকে চিনতে পেরে ধ্বনি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল।
