টারজান বলল, বুঝতে পারছি কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু কি তা জানি না।
শীঘ্রই সব বুঝতে পারবে। দেশের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক।
মানুষই হচ্ছে সব পশুদের মধ্যে জঘন্য এবং নিকৃষ্ট। আমি ত ভেবেছিলাম নেমোনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব অশান্তির অবসান ঘটেছে।
আমরাও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু আমাদের সে ধারণা ভুল। আলেক্সটার অকৃতজ্ঞ, কাপুরুষ এবং দুলমনা। রাজা হওয়ার পরই সে তোমোর প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফল কি হতে পারে তা জান তুমি। আমরা সকলেই তার কুনজরে পড়ে আছি। আসলে তোমোই হচ্ছে এ রাজ্যের প্রকৃত শাসক। তবু জনগণ আমাদের ভালবাসে বলে গণ-বিক্ষোভের ভয়ে আমাদের মেরে ফেলতে সাহস পায় না ওরা।
এরপর জেমনন বলল, কিন্তু তোমার খবর কি? তুমি আবার ক্যাথনিতে ফিরে এলে কি করে?
টারজান বলল, সে এক দীর্ঘ কাহিনী। একটি কুমারী মেয়ে আর তার প্রেমিক আমার হেফাজতে ছিল। তারা বাড়ির পথে রওনা হলে মেয়েটিকে দু’জন শ্বেতাঙ্গ চুরি করে নিয়ে যায়। আমি এ কথা জানতে পারার পর মেয়েটির খোঁজে বেরিয়েছিলাম।
জেমন বলল, আর তোমাকে বেশি খুঁজতে হবে না। আমি জানি মেয়েটি কোথায় আছে। তবে এখন তুমি তোমার বন্দী। সুতরাং তা জেনেও কোন লাভ হবে না তোমাদের কারো।
টারজান বলল, কি করে জানলে মেয়েটি কোথায় আছে?
জেমনন বলল, আলেক্সটার আমাকে প্রায়ই থেনার উপত্যকায় এ্যাথনির লোকদের আক্রমণ করার জন্য পাঠায়। যে সব সামন্তকে সে ভয় করে তাদেরও পাঠায় সে। সম্প্রতি আমি এই ধরনের এক অভিযানে গিয়েছিলাম। আমরা সংখ্যায় বেশি ছিলাম না বলে আমাদের অভিযান সফল হয়নি তেমন। শুধু শত্রুদের একটা মাথা নিতে পেরেছিলাম। আসার সময় পথে আমরা এ্যাথনির একদল লোককে হাতির পিঠে চড়ে আসতে দেখি। সেই সময় উপত্যকায় একদল লোককে দেখি। সে দলে দু’জন শ্বেতাঙ্গ, একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আর চার-পাঁচজন নিগ্রোভৃত্য ছিল। আমাদের দেখতে পেয়ে মেয়েটি ছুটে আসতে থাকে সাহায্যের জন্য। আমরা তাদের সকলকে হয়ত বন্দী করে আনতাম।
টারজান বলল, এখন তোমো আমাকে নিয়ে কি করবে?
তুমি অবশ্য একটা পরিকল্পনা খাড়া করতে পার।
টারজান বলল, আগে আমাকে তোমোর পরিকল্পনার কথা জানতে হবে। এখন আমার কথা হলো তুমি আমার ঘর থেকে চলে যাও এই মুহূর্তে। কেউ দেখে ফেলতে পারে।
জেমনন বলল আমি কি তোমার জন্য কিছুই করতে পারি না? তুমি আমার জন্য কত করেছিলে।
টারজান বলল, তুমি শুধু তোমার ছোরাটা আমাকে দিয়ে যাও। আমি আমার কৌপীনের নিচে সেটা লুকিয়ে রাখব।
জেমনন ঘর থেকে চলে গেলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল টারজান। বন্য পশুর মতই সকল অবস্থাতেই নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বিগ্ন সে।
টারজানকে মৃত্যুদণ্ড দান করেছে আলেক্সটার। তোমোর পরামর্শেই এই দণ্ডের বিধান করেছে সে।
তখন বেলা এগারটা বাজে। সূর্য উজ্জ্বলভাবে কিরণ দিচ্ছিল আকাশে।
টারজানকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় প্রহরীরা প্রাসাদ-প্রাঙ্গণ পার হয়ে রাজপথে নিয়ে গিয়ে থামল। রাস্তার দু’ধারে জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান থেকে এক মিছিল বার হয়ে নগরের বাইরের এক প্রান্তরে যাবে। মিছিলের সামনে ছিল রাজ্যের সামন্ত ও যোদ্ধারা, তারপর ছিল সিংহটানা রাজার রথ আর তারপরে কয়েকজন নিগ্রো একটা সিংহকে গলবদ্ধ অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছিল।
এ মিছিল আগেও একবার দেখেছিল টারজান। টারজানকে রাজার রথের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছিল শিকল দিয়ে।
সিংহপ্রান্তরে মিছিলটা পৌঁছলে টারজনের শিকল খুলে দেয়া হলো। শিকল বাঁধা শিকারী সিংহটাকে কখন খুলে দেয়া হবে, কখন সে সিংহ বন্দীর দেহটাকে ছিঁড়ে খাবে সে দৃশ্য দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল জনতা। রাজা আলেক্সটারের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। তার বয়স তিরিশের কাছাকাছি। টারজান দেখল মুখখানা নিষ্ঠুরতায় ভরা।
আলেক্সটার একসময় বলল, তাড়াতাড়ি করো, আমার ভাল লাগছে না।
রাজার আদেশে আসল অনুষ্ঠানের জন্য সবাই তাড়াহুড়ো করতে লাগল। তাড়াতাড়ি এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেল। শিকারী সিংহটাকে যে নিগ্রোটা ধরে ছিল হঠাৎ তার হাত থেকে শিকলটা পড়ে যায় আর সঙ্গে সঙ্গে সিংহটা গর্জন করতে করতে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বর্শাধারী যোদ্ধাদের আক্রমণ করল। নিরস্ত্র জনতা প্রাণভয়ে পালাতে লাগল।
চারদিকে বিরাট গোলমাল ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। সামন্তরা বিব্রত হয়ে পড়ল। তখন রথের উপর দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল আলেক্সটার। সে চীৎকার করে বার বার বলতে লাগল, যে এই সিংহটাকে মারতে পারবে তাকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে। সে যা চায় তাই দেয়া হবে।
কিন্তু সবাই তখন নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কেউ তার কথায় কান দিল না।
তার প্রধান পরামর্শদাতা তোমোও তখন পালিয়ে গেছে সেখান থেকে।
আলেক্সটার কিন্তু পালাতে পারল না।
সহসা মুখ ঘুরিয়ে রথের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আলেক্সটারকে লক্ষ্য করে ছুটে আসতে লাগল সিংহটা। এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল আলেক্সটার। অথচ পালাবার কোন উপায় নেই, কোন পথ নেই। ভয়ে হিম হয়ে গেল তার গায়ের রক্ত।
আলেক্সটারের কয়েকজন দেহরক্ষী শুধু সিংহটাকে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করল। আর সবাই পালিয়ে গেছে। আর আছে শুধু বন্দী টারজান।
এমন সময় বন্দী তার পরনের কৌপীনের ভিতর থেকে একটা ছোরা বার করে রথের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া সিংহটাকে আক্রমণ করল। সিংহটা তাকে লক্ষ্য করে একটা জোর লাফ দিতেই টারজান বসে পড়ে পিছন থেকে সিংহটার পিঠে চেপে পড়ে তার কেশর ধরে ফেলল। সিংহটার মত টারজান অদ্ভুতভাবে একধরনের গর্জন করতে লাগল। সে তার ছুরিটা সিংহটার বুকে পাঁজরে পিঠে বারবার বসিয়ে দিতে লাগল।
