গনফালা দেখল সহসা আগন্তুক দলের একজন যোদ্ধা থমকে দাঁড়িয়ে উপত্যকার একদিকে হাত বাড়িয়ে কি দেখাল। তখন তাদের সকলেই তাদের পথ থেকে অন্য দিকে ছুটতে লাগল। চামড়ার দড়িবাঁধা সিংহটাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল তারা।
গনফালা ওদের পালাবার কারণ খুঁজতে গিয়ে যোদ্ধাটা যে দিকে হাত বাড়িয়ে দেখিয়েছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় একশোটা হাতির পিঠে কয়েকজন করে যোদ্ধাকে নিয়ে এই দিকেই এগিয়ে আসছে। এদিকে তার পায়ের কাছে তখন স্ট্রোল আর স্পাইক মারামারি ও ধস্তাধস্তি করছিল ভয়ঙ্করভাবে।
স্পাইকরা যেখানে তাদের পথ-প্রদর্শকদের ছেড়ে দিয়ে একটি পথ ধরে এগিয়ে চলতে থাকে স্ট্যানলি উড ছ’জন ওয়াজিরি যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে সেই পথই ধরে।
উড হতবুদ্ধি হয়ে গেল। ভাবল আজ টারজান থাকলে অনায়াসে পথ খুঁজে পেত।
এমন সময় হঠাৎ একজন ওয়াজিরি উডকে একদিকে দেখাল, একটা নগর দেখা যাচ্ছে বাওয়ানা।
সেদিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল উড। দেখল, খড়ের চালওয়ালা কতকগুলো কুঁড়ে ঘরের সমন্বয়ে গড়া কোন গাঁ নয়। সাদা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সোনার গম্বুজ ও চূড়াওয়ালা অসংখ্য প্রাসাদ আর অট্টালিকায় ভরা এক মনোরম নগর।
উড সেই ওয়াজিরিকে জিজ্ঞাসা করল, এ কোন্ নগর?
আমি ওদিকে কোনদিন যাইনি বাওয়ানা তাই ঠিক জানি না।
অন্য একজন ওয়াজিরি যোদ্ধা বলল, মেমসাহেব বোধ হয় ঐ নগরেই আছে বাওয়ানা।
উড বলল, হয়ত আছে। কিন্তু ওখানকার লোকগুলো কেমন হবে তা জানি না। যদি শত্রুভাবাপন্ন। হয় তাহলে সেখানে গেলেই তারা আমাদের সবাইকে বন্দী করবে।
ওয়াজিরি যোদ্ধারা বলল, আমরা ওয়াজিরি, আমাদের সবাইকে বন্দী করতে পারবে না। আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমরা ভয় পাইনি।
উড বলল, তোমরা বরং ফিরে গিয়ে টারজানকে খবর দাও। সে যা হয় ব্যবস্থা করবে। টারজান না থাকলে মুভিরোকে বলবে।
ওয়াজিরি যোদ্ধারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে গেল। উড তখন একা পা চালিয়ে দিল সেই স্বৰ্ণনগরীর পথে।
এদিকে টারজান তখন সেই ওনথার উপত্যকার একধারে একটি উঁচু মালভূমির একটি প্রান্ত থেকে সেই স্বৰ্ণনগরী ক্যাথনির দিকে তাকিয়ে ছিল। নগরদ্বারের কাছে যে একটা নদী ছিল তার উপর একটা সোনার সেতু চকচক করছিল সূর্যের আলোয়।
কিন্তু ওই স্বৰ্ণনগরী অজানা নয় টারজনের। ও নগরে একদিন বন্দী ছিল সে। তারপর সেখানকার রাজনৈতিক উত্থানপতনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। স্বৰ্ণনগরী ক্যাথনি থেকে কিছু দূরে এথ্যানি নামে আর একটা নগর আছে। সেখানকার সবকিছু হাতির দাঁত দিয়ে বাঁধানো অথবা নির্মিত। তাই বলা হয় ক্যাথনি যেমন স্বৰ্ণনগরী তেমনি এ্যাথনি হচ্ছে হাতির দাঁতের নগরী।
এই দুই নগরীর অধিবাসীদের মধ্যে এক তীব্র বিরোধ ও শত্রুতা চলে আসছে। সুযোগ পেয়ে এক নগরের লোকেরা আক্রমণ করে অন্য নগরের লোকদের। ক্যাথনির যোদ্ধারা পোষমানা সিংহদের গলার দড়ি ধরে ঘুরে বেড়ায় আর এ্যাথনির যোদ্ধারা হাতির পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়।
টারজান ভাবল একদিন সে নগরে বন্দী থাকলেও আজ সে নগরীতে আর শত্রু নেই তার। কারণ তার প্রধান শত্রু রানী নেমোনি আজ আর নেই। আলেক্সটার নামে তার নিজের যে ভাইকে কারাগারে বন্দী করে রাখে রানী নেমোনি সেই ভাইই আজ রাজা হয়েছে এবং ফোর্সো, যুডো, জেমনন নামে টারজনের অন্তরঙ্গ বন্ধুরাই তাকে রাজা করে। তার সেই সব বন্ধুরা আজও আছে সে নগরীতে। রানীর প্রধান পরামর্শদাতা কুখ্যাত তোমো হয়ত এতদিনে নিহত হয়েছে। তাকে আর ভয় করার কিছু নেই।
এই ভেবে সাহসের সঙ্গে উপত্যকাটা পার হয়ে নগরদ্বারে উপস্থিত হলো টারজান। প্রহরীরা টারজানকে এগিয়ে আসতে দেখে আগেই চিনতে পেরেছিল।
নগরদ্বারের কাছে এসে টারজান থামতেই অভ্যর্থনা জানাল তাকে।
প্রহরীদের ক্যাপ্টেন টারজানকে সঙ্গে করে রাজ প্রাসাদের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
ক্যাপ্টেন বিষাদগম্ভীর মুখে বলল, আমি দুঃখিত টারজান, আলেক্সটার আমাকে আপনাকে গ্রেপ্তার করার হুকুম দিয়েছেন।
টারজান দেখল কুড়িটা বর্শা তাকে ঘিরে আছে। আলেক্সটারের অকৃতজ্ঞতায় সে বিস্মিত ও মর্মাহত হলেও বাইরে সে বিস্ময়ের বা বিহ্বলতার ভাবটা প্রকাশ করল না।
যোদ্ধারা টারজনের সব অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাকে রাজপ্রসাদের দোতলার একটা ঘরে নিয়ে গেল। টারজান দেখল এই ঘরটা বড় এবং তাতে আলো বাতাস আছে। আগের ঝরে সে যখন বন্দী ছিল এখানে তখন তাকে একটা অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছিল।
যোদ্ধারা ঘরের দরজাটা বন্ধ করে চলে গেলে টারজান একটা ভোলা জানালার ধারে দিয়ে বাইরে উঠোনের দিকে তাকিয়ে কি দেখতে লাগল। তারপর একটা বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়ে কোন বিপদের কথা চিন্তা না করেই ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত্রির অন্ধকার বাইরে ঘন হয়ে উঠলে টারজনের ঘরের দরজা খুলে একজন ঘরে ঢুকল। তার হাতে। ছিল একটা জ্বলন্ত মশাল। সে ঘরে ঢুকে তার পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর সে টারজনের কাছে এসে তার কাঁধের উপর একটা হাত রেখে টারজনের প্রতি তার বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের কথা জানাল।
টারজান তাকে চিনতে পেরে বলল, তোমাকে দেখে খুশি হলাম জেমনন। ডোরিয়া আর তার বাবা মা ভাল আছে ত? তোমার বাবা ফোর্ডোই বা কেমন আছেন?
জেমনন বলল, তারা সবাই ভাল আছে, কিন্তু কেউ সুখে নেই। তোমার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে। তার থেকে তুমি অনুমান করতে পেরেছ রাজ্যের অবস্থা কি চলছে।
