স্ট্রোল বলল, কি হয়েছিল, আমার এই অবস্থা হলো কেন?
স্পাইক বলল, তুমি লরীচাপা পড়েছিলে। কই, আমি ত কোন লরী দেখিনি।
গনফালা যে ঘরে লুকিয়ে ছিল সে ঘর থেকে ওদের দুজনকে দেখতে পেয়ে বেরিয়ে তাদের দুজনের সামনে এসে হাজির হলো।
তাকে দেখে স্ট্রোল বলল, মেয়েটিকে দেখতে আমার বোনের মত মনে হচ্ছে।
স্পাইক দেখল, স্ট্রোল বেশি আহতও হয়নি। তবে তার মাথাটায় হয়ত কোন গোলমাল হয়েছে।
যাই হোক, সেদিন সকালেই কিছু খাওয়ার পর দু’জন পথ-প্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল তিনজনে। স্পাইক চলল আগে আগে। স্ট্রোল গনফালার পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। এক বিহ্বলতার ভাব ছিল তার চোখে।
গনফালা বলল, চল আমরা ফিরে যাই। কি হবে আর এগিয়ে গিয়ে তার থেকে আমায় আমার। বন্ধুদের কাছে নিয়ে চল। অজানা দেশে গিয়ে তুমি নিজেই যদি নিহত হও তাহলে গলফান নিয়ে কি হবে? কিন্তু আমাকে আমার বন্ধুদের কাছে নিয়ে গেলে আমি তাদের বলে গলফানটা তোমায় দিয়ে দেব এবং তোমাকেও ছেড়ে দেয়া হবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। আমি উডকে যা। বলব সে তাই করবে।
স্পাইক মাথা নেড়ে বলল, না, তোমাকে আমি ছাড়ব না। আমি যেখানে যাবার ঠিক যাব তোমাকে নিয়ে। তাতে যদি গলফানটা আমায় হারাতে হয় ত হবে।
গনফালা বলল, আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিলাম। তুমি বোকা বলে তা গ্রহণ করতে পারলে না।
পথ-প্রদর্শকরা চলে গেলে ওরা অজানা পার্বত্য পথে দিনের পর দিন ধরে এগিয়ে চলল। প্রতিদিনই সকাল হলেই স্পাইক ভাবে আজ সে ঠিক তার স্বপ্নের সেই মায়াময় দেশে পৌঁছে যাবে। প্রতি রাত্রেই সে বলে পরের দিন সে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।
স্ট্রোলের মানসিক অবস্থা সেই একই রকমের রয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল গনফালা তার বোন। এই ভেবে গনফালার নিরাপত্তা সম্বন্ধে বেশি তৎপর হয়ে উঠল সে।
স্ট্রোল জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। দিনের পর দিন সে শুধু মূক পশুর মত নীরবে পথ। হেঁটে যায়।
এইভাবে বহুদিন ধরে সেই পার্বত্য অঞ্চলে সেই মায়াময় উপত্যকার সন্ধানে এগিয়ে যেতে লাগল। স্পাইকরা। অবশেষে একদিন একটা পাহাড়ের উপর একটা ঝর্ণার ধারে বিকালের দিকে শিবির স্থাপন। করল ওরা।
তখন বিকালবেলা। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল পশ্চিম আকাশে। স্পাইক বসেছিল গনফালার পাশে।
স্পাইক বলল, ওটা সূর্য নয়, আগুন। হয়ত ওখানে একটা আগ্নেয়গিরি আছে। মনে হয় আমরা। আমাদের সেই আকাঙ্খিত উপত্যকায় এসে গেছি।
গনফালা কোন উত্তর দিল না। এখন আর সে ভয় করল না স্পাইককে। কারণ সে জানে স্পাইক তার কোন ক্ষতি করতে এলে বা পীড়ন করলে স্ট্রোল খুন করবে ইককে।
সেদিন রাতে খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল স্পাইককে। কিন্তু পরদিন যখন সে শুনল তাদের দুজন নিগ্রোভৃত্য তাদের সফরী ছেড়ে চলে গেছে তখন তার মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল। তবে দেখল গলফানটা নিয়ে যায়নি তারা।
এরপর থেকে স্পাইক গলফানটা কাছে নিয়ে শুত।
সেদিন দুপুরের দিকে একটা বিস্তীর্ণ উপত্যকা পেল তাদের সামনে।
একজন নিগ্রোভূত্য হঠাৎ থেমে কান খাড়া করে কি শুনে বলল, একদল মানুষ আসছে বাওয়ানা।
স্পাইক গনফালার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ত কিছু শুনতে পাচ্ছি না, তুমি পাচ্ছ?
গনফালা বলল, হ্যাঁ, আমি মানুষের গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
স্পাইক বলল, তাহলে পথ থেকে সরে গিয়ে আমরা এক জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারি।
এই বলে সে তাদের সব লোকদের একশো গজ দূরে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেল। তারপর সেখানে থেমে কান পেতে কি শুনতে লাগল। তারা বুঝল আগন্তুকরা সেইদিকেই আসছে।
স্পাইক কোন লুকোবার জায়গা পেল না। তাদের পিছনে যে একটা ঝোপ ছিল তাতে প্রবেশ করা যাবে না, বড় দুর্গম।
পিছন ফিরে তাকিয়ে গনফালা দেখল, আগন্তুকদের যে দলটা উপত্যকার উপর দিয়ে এগিয়ে আসছিল তাদের সামনে ছিল প্রায় বারোজন কৌপীন পরা নিগ্রো। তাদের পিছনে ছিল ছ’জন অদ্ভুত পোশাক পরা শ্বেতাঙ্গ। তাদের সেই পোশাকের মধ্যে জাঁকজমক ছিল। তাদের পিছনে কিছুদূরে ছিল আরো বিশজন সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ। তবে তাদের পোশাকে কোন জাঁকজমক ছিল না। তাদের হাতে ছিল বর্শা আর তরবারি। একজন যোদ্ধার হাতে একটা মানুষের রক্তাক্ত কাটা মুণ্ডু ঝোলানো ছিল।
গনফালা বলল, ওরা শ্বেতাঙ্গ। ওরা আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে পারে।
স্পাইক বলল, আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না। গনফালা আর তোমার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি আমি।
এই বলে গনফালা দলের অন্যদের মত পালাবার চেষ্টা না করে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। বলল, তোমার থেকে যে কোন লোকই ভাল আমার কাছে।
স্পাইক চীৎকার করে বলল, বোকামি করো না, চলে এস।
এই বলে সে গনফালার একটা হাত ধরে তাকে টানতে লাগল।
গনফালা স্ট্রোলকে বলল, স্ট্রোল, তুমি আমাকে বাঁচাও।
স্ট্রোল তাদের কিছুটা আগে ছিল। গনফালার ডাকে সে পিছন ফিরে দেখল স্পাইক আর গনফালা ধস্তাধস্তি করছে।
স্ট্রোল তা দেখে রেগে গিয়ে চীৎকার করে স্পাইককে বলল, ছেড়ে দাও ওকে, আমার বোনকে ছেড়ে দাও।
বলতে বলতে স্পাইকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল স্ট্রোল। দু’জনে পরস্পরকে কিল, চড়, ঘুষি মারতে লাগল।
প্রথমে কি করবে তা ভেবে পেল না গনফালা। তারপর সে অগ্রসরমান যোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এগিয়ে গেল কিছুটা। আসলে সে স্পাইকের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিল। সে দেখল যোদ্ধারা। তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। দেখল সামনের সারির নিগ্রোদের দু’জন একটা সিংহকে ধরে আছে।
