ফাদ কোমর থেকে তার ছোরাটা বার করে বলল, আমি ওকে শেষ করব।
মতলগ বাধা দিয়ে বলল, আল্লার নামে বলছি তোমার ছোরাটা রেখে দাও। আমরা ওকে শেখের কাছে বেঁধে নিয়ে যাব। শেখ যা করার করবে।
ফাদ বলল, তাহলে ওকে বেঁধে ফেল।
টারজনের হাত দুটো পেটের উপর জড়ো করে উটের চামড়ার দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল ওরা। টারজান তখন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল। সে আরবদের দেখে চিনতে পারল। সে তাদের বলল, তোমরা আমায় বাঁধছ কেন? আমার বাঁধন খুলে দাও বলছি।
ফাদ হেসে বলল, তুমি যে দেখছি শেখের মত হুকুম চালাচ্ছ। নিজেকে শেখ ভাবছ নাকি?
টারজান বলল, লোকে আমাকে টারজান বলে। আমি হচ্ছি শেখের শেখ।
টারজান!
চমকে উঠল মতলগ। গলার স্বর নিচু করে বলল, আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই লোকটার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে গেল। গত দু’সপ্তাহর মধ্যে যে গাঁয়েই গিয়েছি সেখানেই ওর নাম শুনেছি। গ্রামবাসীরা একবাক্যে বলেছে, থাম, টারজান আসছে। তার দেশ থেকে ক্রীতদাসদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোমাদের হত্যা করবে সে।
ফাদ বলল, তুমি বাধা দিলে আমায়। ওকে মেরে ফেলাই ভাল ছিল।
মতলগ বলল, পরে একথা প্রচার হয়ে গেলে আমাদের আর জীবন্ত দেশে ফিরে যেতে হবে না। আমাদের ক্রীতদাসরাই পালিয়ে গিয়ে প্রচার করে বেড়াবে একথা।
ফাদ বলল, ঠিক আছে। শেখের কাছেই নিয়ে চল ওকে।
শেখ ইবন জাদের মঞ্জিলে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। মঞ্জিলের ভিতরে একটা তাঁবুর ঘরের ভিতরে টারজান হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়েছিল। বাঁধনগুলো খোলার জন্য অনেক চেষ্টা করল। কোনভাবে ছিঁড়তে বা খুলতে পারল না।
টারজান শুনতে পেল তাঁবুর বাইরে কারা ফিস ফিস করে কথা বলছে।
হঠাৎ ওরা কিসের একটা শব্দ শুনে চমকে উঠল। সে শব্দ শুনে সবাই চমকে উঠল। ক্রীতদাসরা তাঁবুর বাইরে এসে দেখতে লাগল। আরবরা বন্দুক তুলে নিল হাতে।
ইবন জাদ বলল, তাঁবুর ভিতর থেকে শব্দটা আসছে। মনে হচ্ছে একটা পশু গর্জন করছে। বন্দীটা ত মানুষ।
ফাদ বলল, ও মানুষ হলেও ওর মধ্যে শয়তান আছে।
ইবন জাদ হাতে বন্দুক আর কাগজের লণ্ঠন নিয়ে টারজনের ঘরে গিয়ে উঁকি মেরে দেখল টারজান ঠিকই আছে। সে জিজ্ঞাসা করল, তুমি একটা শব্দ শুনেছ? ওটা কিসের শব্দ?
টারজান বলল, এক পশুর প্রতি অন্য এক পশুর ডাক। জঙ্গলের ডাক শুনে বেদুইনরা ভয় পায়।
ইবন জাদ বলল, বেদুইনরা ভয় পায় না। আমরা ভেবেছিলাম বাড়ির মধ্যে হয়ত বা কোন জন্তু জানোয়ার ঢুকেছে। যাই হোক, আগামীকাল তোমাকে মুক্তি দেব।
টারজান বলল, কিন্তু আজ নয় কেন?
ইবন জাত বলল, সিংহ অধ্যুষিত এই নৈশ জঙ্গলে একা তোমাকে ছাড়া ঠিক হবে না।
টারজান হাসল। হাসিমুখে বলল, রাত্রির জঙ্গলে টারজান নিরাপদ। কোন সময়েই জঙ্গলকে ভয় করে না টারজান।
এদিকে টারজনের-ডাকটা জঙ্গলের মধ্যে দূরে একজন শুনতে পেয়েছিল এবং সে সাড়াও দিয়েছিল। সে হলো টারজনের বন্ধু ট্যান্টর। শেখের মঞ্জিলের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ল এবং গোটা বাড়িটা স্তব্ধ হয়ে গেল তখন হাতিটা গঁড় তুলে জ্বলন্ত লাল চোখদুটো নিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হুড়মুড় করে আসতে লাগল।
এদিকে শেখের বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও শেখ তার ঘরের সামনে বসে তার ভাই-এর সঙ্গে বসে ধূমপান করছিল। শেখ এক সময় তার ভাই তোলোগকে বলল, কোন ক্রীতদাসকে জানাবে না যে তুমি টারজানকে হত্যা করছ। কাজটা হয়ে গেলে কবর খোঁড়ার জন্য দু’জন বলিষ্ঠ ক্রীতদাসকে জাগাবে। তাদের মধ্যে একজন হবে ফেজুয়ান আর একজন অন্য কেউ।
তোলোগ বলল, আব্বাস আর ফেজুয়ান-দু’জনেই বিশ্বস্ত।
শেখ বলল, তাহলে যাও। এখন সবাই ঘুমিয়েছে।
এই কথা বলে শেখ তার শোবার ঘরে চলে গেল। এদিকে হাতিটা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্করভাবে ছুটে আসতে লাগল। তার পথের সামনে কোন সিংহ বা চিতাবাঘ দাঁড়াতে পারল না। সবাই একপাশে সরে যেতে লাগল।
অন্ধকারে পা টিপে টিপে তোলোগ টারজনের তাঁবুর ভিতরে চলে গেল। টারজান তখন মাটিতে কান পেতে কিসের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল। তোলোগ তার ঘরে ঢুকতেই টারজান খাড়া হয়ে উঠে বসল। সে আবার সেই আগের মত চীৎকার করে উঠল। গোটা শিবিরটা কেঁপে উঠল সেই চীৎকারের শব্দে।
তোলোগ বলল, এখানে কোন জন্তু আসেনি ত?
সে দেখল তাঁবুর মধ্যে কোন জন্তু নেই। সে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে একটা কাগজের লণ্ঠন নিয়ে এল। তোলোগ দেখল টারজান তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে বলল, তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ!
তোলোগ টারজনের বুকে ছুরিটা বসাবার জন্যে এগিয়ে এলে টারজান তার বাঁধা হাতদুটো দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। তোলোগ আবার এলে টারজান তার মাথায় হাত দুটো দিয়ে এমনভাবে আঘাত করল। যে সে পড়ে গেল। কিন্তু তোলোগ উঠেই এবার টারজনের পেছন থেকে আঘাত করতে গেল। টারজান হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বাধা দিতে গেলে সে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। তোলোগ এবার সুযোগ পেয়ে ছুরিটা টারজনের বুকে বসাতে গেলেই সে আশ্চর্য হয়ে দেখল গোটা তাবুটা উপর থেকে কে তুলে নিল। তারপর দেখল একটা বিরাট হাতি খুঁড় দিয়ে তার দেহটা জড়িয়ে ধরে তাকে তুলে একটা তাবুর মাথায় ফেলে দিল।
হাতিটা এবার টারজানকে খুঁড় দিয়ে তার পিঠের উপর চাপিয়ে বেগে ছুটে পালাতে লাগল।
শেখের লোকজন ছুটে এসে দেখল বন্দী নেই। হাতিটা তখন জঙ্গলে পালিয়ে গেছে।
