এই ভেবে টারজানও উত্তর দিক বরাবর স্পাইকদের পথের সমান্তরাল একটা পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল।
দু’দিন যাওয়ার পর পথে এক জায়গায় হায়েনার অট্টহাসি শুনে সেখানে গিয়ে দেখল একটা বড় গর্তের মধ্যে একটা বড় হাতি পড়ে আর্তনাদ করছে।
এই হাতিটা টারজনের সেই হাতিবন্ধু প্রিয় ট্যান্টর না হলেও তারই সমজাতীয়। টারজান তাই গর্জের একপাশে মাটি খুঁড়ে মুক্ত করল হাতিটাকে। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে তার শুড় দিয়ে টারজনের দেহটাকে সোহাগভরে স্পর্শ করল কিছুক্ষণ ধরে। তারপর আবার উত্তর দিকে রওনা হয়ে পড়ল টারজান।
এদিকে টারজনের বাড়িতে টারজান ফিরে না আসায় অধৈর্য হয়ে পড়ল স্ট্যানলি উড। টারজনের কোন খবর পেল না সে। তাই একদিন ওয়াজিরিদের সর্দার মুভিরোকে উড বলল, আমাকে কিছু লোক দাও, আমি নিজেই গনফালার খোঁজে বার হব।
অবশেষে মুভিরো তাকে দু’জন ওয়াজিরি যোদ্ধা দিল। তাই নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়ল উড।
বাতাঙ্গোদের দেশে তারা এসে পড়লে ওয়াজিরিরা সেদিকে না গিয়ে স্ট্রোল ও স্পাইকদের মত অন্য পথে যেতে লাগল।
কয়েকসপ্তা যাবার পর আদিবাসীদের একটা গায়ে এসে তারা বুঝল, ঠিক পথেই এসেছে তারা। আদিবাসীদের সর্দার বলল, ন’জন লোকের এক সফরী এসেছিল তাদের গায়ে। তাতে ছিল দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আর ছ’জন নিগ্রোভৃত্য। সর্দার তাদের সঙ্গে পথ প্রদর্শক দিয়ে উত্তরের দিকে আর এক গাঁয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।
তা শুনে আশান্বিত হলো উড। বুঝল গনফালা তাহলে বেঁচে আছে এখনো।
সেদিন উত্তরাঞ্চলের এক গাঁয়ে এক আদিবাসী সর্দারের সঙ্গে কথা বলছিল স্ট্রোল আর স্পাইক।
স্পাইক একসময় জিজ্ঞাসা করল সর্দারকে, উত্তর দিকে কি আছে?
সর্দার বলল, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।
আমি যে উপত্যকার কথা বলছি সে উপত্যকাটা ঐ পাহাড়গুলো দিয়েই ঘেরা।
সর্দার বলল, আমি আগামীকাল তোমাদের সঙ্গে কিছু পথ-প্রদর্শক দেব।
স্পাইক তখন নিশ্চিন্ত হয়ে স্ট্রোল আর গনফালার পাশে বসে কথা বলতে লাগল। সে তার পরিকল্পনাটার কথাটা তুলে বলল, আর দেরী নেই। সেই উপত্যকাটায় একবার গিয়ে পৌঁছলেই আমরা নিরাপদ হয়ে উঠব।
গনফালা বলল, মোটেই না। স্ট্যানলি আর টারজান তোমাদের খুঁজে বার করবেই।
স্পাইক বলল, আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে ওরা যেতেই পারবে না। সে জায়গা কখনো খুঁজে পাবে না।
সর্দার ওদের পথ-প্রদর্শক দেবে যেমন আমাদের দিচ্ছে।
সে রাতে ভাল করে খাওয়ার পর তারা শুতে চলে গেল তাড়াতাড়ি। কিন্তু স্ট্রোল ঘুমোল না। ইচ্ছা করে জেগে কান পেতে রইল।
স্ট্রোল শুধু ভাবতে লাগল স্পাইক কখন ঘুমিয়ে পড়বে গভীরভাবে। এই স্পাইকই তার সেই মধুর স্বপ্ন পূরণের পথে একমাত্র বাধা।
স্ট্রোল বিছানা থেকে উঠে ঘরের দরজার কাছে এসে দেখল গায়ের সব লোক ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঘর থেকে নিঃশব্দে বার হতে গিয়ে একটা রান্নার পাত্রে তার পা লেগে গিয়ে জোর শব্দ হলো। স্পাইকের ঘুমটা সে শব্দে কিছুটা ব্যাহত হলো, কিন্তু ভাঙ্গল না একেবারে। তবে ঘুমটা পাতলা হয়ে গেল তার।
এদিকে গনফালার ঘরের দিকে চুপিসারে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল স্ট্রোল।
গনফালা তখনো ঘুমোয়নি। সে দরজার ওপারে অন্ধকারে তাকিয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টিতে। সহসা দরজার কাছে কার চাপা পদশব্দ শুনে চমকে উঠল সে। বুঝতে পারল কে একজন হাতে পায়ে হেঁটে গুঁড়িমেরে তার ঘরে ঢুকছে।
গনফালা ভয়ে ভয়ে বলল, কে তুমি? কি চাও?
স্ট্রোল চাপা গলায় বলল, চুপ কর। কোন গোলমাল করো না।
স্ট্রোল তেমনি চাপা গলায় বলল, আমার কথা শোন। ওই উপত্যকায় যাবে না তুমি। তুমি নিশ্চয় স্পাইকের সঙ্গে সারা জীবনটা কাটাতে চাও না সেখানে। সেখানে গেলেই সে আমাকে খুন করে একা আধিপত্য করবে তোমার উপর। আমি ওকে জানি। তার থেকে আমার সঙ্গে হীরেটা নিয়ে ইউরোপে চল।
আমি তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে চাই না। চলে যাও এখান থেকে। তা না হলে আমি স্পাইককে ডাকব।
গনফালার গলাটা টিপে ধরল স্ট্রোল। গনফালা স্পাইকের নাম ধরে চীৎকার করে উঠল। সে স্ট্রোলের হাত দুটো তার গলা থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগল। সে ছটফট করতে লাগল।
চীৎকার শুনে জেগে উঠল স্পাইক। সে স্ট্রোলের নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু দেখল স্ট্রোল ঘরের মধ্যে তার বিছানায় নেই।
স্পাইক তখন গনফালার ঘরের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু দরজার কাছেই বাধা দিল স্ট্রোল। সে ঘুষি পাকিয়ে গর্জন করতে লাগল। গনফালা ঘরের এককোণে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওরা দু’জনে জড়াজড়ি করে খালি হাতে মারামারি করতে লাগল।
কিন্তু সর্দার তার যোদ্ধাদের পাঠাবার আগেই ওরা নিজেরাই থেমে গেল।
স্পাইক গুঁড়ি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। গনফালা তা দেখে ভাবল স্পাইক নিশ্চয় স্ট্রোলকে খুন করে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। সে তাই ছুটে গিয়ে গাঁয়ের একটা কুঁড়ের মধ্যে আশ্রয় নিল।
দু’জনের মধ্যে স্পাইককেই সব সময় বেশি ভয় করত গনফালা। সে-ই বেশি বিপজ্জনক দু’জনের মধ্যে। কারণ সে বেশি শক্তিমান এবং দুঃসাহসী। স্ট্রোলের অতটা সাহস বা শক্তি ছিল না তার মত।
কিন্তু আসলে স্ট্রোল মরেনি। পরদিন সকালে গায়ে একটা রাস্তার উপর আহত অবস্থায় পড়ে ছিল স্ট্রোল। তা দেখতে পেয়ে স্পাইক তার কাছে গেল।
