টারজান ভাবল যারা গনফালাকে ধরে নিয়ে গেছে তারা এদিকে এসে পড়লে বন্দী হতে পারে বাতাঙ্গোদের হাতে। তারা ধরা পড়েছে কিনা সে বিষয়ে বাতাঙ্গোদের সর্দারের গায়ে গিয়ে খোঁজ করতে হবে।
টারজান দেখল,তার পূর্ব দিকে কতকগুলো ছোট ছোট পাহাড় উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়ে আছে। সে সব পাহাড়গুলোর কাছে গিয়ে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার উপর উঠে দূরে কতকগুলো গাঁ দেখতে পেল।
টারজান দেখল সব গাগুলোর মধ্যে কোন্ গাঁটা সবচেয়ে বড়। সে বুঝল ঐ গাঁটাই তাহলে বাতাঙ্গোদের সর্দারের গাঁ।
ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে এল। আকাশে চাঁদ ছিল না। দূর থেকে জ্বলন্ত উঠোনের আগুনের আলো দেখতে পাচ্ছিল।
পাহাড় থেকে একটা সিংহও নেমে এগিয়ে যাচ্ছিল সেই সব গাগুলোর দিকে।
গাগুলোর কাছাকাছি গিয়ে গ্রামবাসীদের ভীতি-বিহ্বল দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আকাশের দিকে মুখ করে বুকের ভিতর থেকে পশুসুলভ এক ভীষণ চীৎকার করল টারজান।
সে চীৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেল বাতাঙ্গোরা। পুরুষরা অস্ত্র তুলে নিল হাতে। মেয়েরা তাদের শিশুগুলোকে কোলে তুলে নিল।
একজন বাতাঙ্গো বলল, একটা দানব।
বাতাঙ্গোদের সর্দার বলল, এ চীৎকার আমি এর আগে একবার শুনেছিলাম। ওটা হলো ওয়াজিরিদের শয়তান অপদেবতার চীৎকার। বহুকাল আগে আমরা একবার ওয়াজিরিদের দেশ আক্রমণ করেছিলাম।
তার কথায় কান না দিয়ে সকলে আবার এই ধরনের কোন চীৎকার হয় কিনা তা শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে রইল।
টারজান গাঁয়ে গেটের কাছে এসে দেখল তার পাশে একটা বড় গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখল গায়ের চারদিকে একটা অনুচ্চ পাঁচিল ঘিরে আছে গাঁটাকে।
খাওয়ার পর বাতাঙ্গোদের অনেকেই তাদের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। একদল নাচগান করতে লাগল বাজনা বাজিয়ে। গায়ের কাছে এসে একটা সিংহ গর্জন করছিল মাঝে মাঝে।
টারজান এবার সর্দারের কুঁড়েটাকে দেখতে গেল দাওয়ায় যে মশালের আলো জ্বলছিল তাতে সে দেখতে পেল একটা টুলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে সর্দার। তার পায়ের কাছে রয়েছে সেই পান্নার তালটা যা স্ট্রোল আর স্পাইক নিয়ে পালিয়ে আসে।
তা দেখে টারজনের সন্দেহ হলো গনফালা, স্ট্রোল আর স্পাইক এই গাঁয়েই বন্দী হয়ে আছে।
অবশেষে রাত গম্ভীর হতে নাচগান বন্ধ হয়ে গেল। গাঁয়ের পথঘাট একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়লে গাছ হতে নিঃশব্দে নেমে পড়ল টারজান। ছায়ার মত গাঁয়ের পথ ধরে প্রতিটি কুঁড়ের সামনে থেকে বাতাসে গন্ধ শুঁকে খুঁকে পরীক্ষা করল ঘরগুলো। কিন্তু কোথাও কোন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ বা মহিলার সন্ধান পেল না।
অবশেষে সর্দারের ঘরের দরজার সামনে এসে টারজান দেখল ঘরের দরজার কাছে মেঝের উপর পান্নার তালটা পড়ে আছে। সর্দার তার স্ত্রীদের নিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।
টারজান এবার ঘরে ঢুকে সর্দারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার গলাটাকে আলতোভাবে দু’হাত দিয়ে ধরল।
সর্দার চমকে জেগে উঠতেই টারজান চুপি চুপি বলল, যদি বাঁচতে চাও ত চেঁচাবে না।
সর্দার নিচু গলায় বলল, কে তুমি? কি চাও?
আমি শয়তান-দেবতা। দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা কোথায়?
আমি কোন শ্বেতাঙ্গা নারী দেখিনি। বেশ কিছুদিন আগে বনে শিকার করতে গিয়ে বনের দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে দেখি। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোন নারী ছিল না। একটা সিংহ আমাদের সকলকে আক্রমণ করতেই তারা ছুটে পালিয়ে যায়।
টারজান আবার সর্দারকে বলল, তারা কোন্ দিকে পালিয়েছে? সঙ্গে লোক ছিল?
জঙ্গলের পশ্চিম দিকে। তারা ছিল মোট দু’জন। দু’জন শ্বেতাঙ্গ আর সব আদিবাসী। বন্দুক বা খাবার ছিল না তাদের সঙ্গে।
টারজান বলল, এই পান্নাটা তোমরা চুরি করে এনেছ?
সর্দার বলল, না, তারা ভয়ে পালিয়ে যাবার সময় এটা ফেলে যায়। তারা সাদা পাথরুটা সঙ্গে করে নিয়ে যায়।
টারজান বলল, আচ্ছা, পরে কি কোন শ্বেতাঙ্গ মহিলা তোমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে যায়?
কোন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে যায়নি। গেলে অবশ্যই আমি জানতে পারতাম।
আর কিছু না বলে নিঃশব্দে পান্নার তালটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল টারজান। গেটের কাছে। এসে দেখল সিংহটা তখনো ওৎ পেতে বসে আছে। টারজান আর সে রাতে সিংহটাকে না ঘাটিয়ে সেই গাছটার উপর শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল।
এদিকে স্ট্রোল আর স্পাইকের সঙ্গে সমানে উত্তর দিকে হেঁটে চলল গনফালা। বাতাঙ্গোদের গাঁটাকে এড়িয়ে যাবার জন্য অনেকটা ঘুরতে হয় তাদের।
একজন নিগ্রোভূত হীরের তালটাকে বয়ে নিয়ে যেত।
কিছুক্ষণ একটা সফরীর সঙ্গে যাবার সময় স্পাইক পাহাড়ঘেরা একটা উপত্যকা দেখে। ও এখন সেই জায়গাটায় যেতে চাইছিল।
সে একদিন গনফালাকে বলে, জায়গাটা যেন স্বর্গোদ্যান মিস। আমরা সেখানে রাজার হালে থাকব। সেখানকার আদিবাসীরা শান্তিপ্রিয়।
এদিকে বাতাঙ্গোদের গাঁটাকে ফেলে পশ্চিম দিকে গিয়ে বনের প্রান্তে এসে দাঁড়াল টারজান। সেইখানে সে কয়েকটা গাছে ঘেরা ত্রিভুজাকৃতি একটা জায়গায় মাটি খুঁড়ে পান্নার তালটা পুঁতে রেখে। মাটি চাপা দিয়ে তার উপর কিছু ঘাস আর গাছের পাতা দিয়ে সেখানকার মাটিটা ঢেকে দিল।
ঝড়েতে গন্ধসূত্রটা হারিয়ে যাওয়ায় পলাতকদের অনুসরণের পথে বাধা পড়ল।
সে ভাবল, ওরা যখন গনফালাকে পেয়েছে তখন তাকে দিয়ে হীরের তালটাকে কাজে লাগাবে। তার অলৌকিক শক্তির দ্বারা অনেক কিছু চাইবে তারা এবং তার জন্য নিশ্চয় ওরা অন্য কোথাও না গিয়ে কাজীদের দেশেই ফিরে যাবে। সেখানে গিয়ে গনফালাকে রানী করে রাজ্যসুখ ভোগ করতে চাইবে ওরা। কারণ কাজীরা গনফাল আর গনফালার মর্ম বোঝে।
