সন্ধ্যাবেলায় তারা সকলে মিলে ভবিষ্যতের কথা আলোচনা করতে লাগল।
উড বলল, আমরা এখন আমেরিকায় চলে যেতে চাই। সেখানেই আমাদের বিয়ে হবে।
কিন্তু গনফালা বলল, আমাকে তার আগে একবার লন্ডনে যেতে হবে। ঔপনিবেশিক দপ্তর থেকে আমি একখানি চিঠি পেয়েছি।
গনফালা উঠে গিয়ে তার ঘর থেকে একখানা চিঠি বার করে এসে টারজানকে পড়তে দিল।
এই চিঠিখানি আমি লিখছি আমার মেয়ের উদ্দেশ্যে। সে যদি ভাগ্যক্রমে কাজীদের দেশ থেকে কখনো মুক্তি পায় তাহলে সে যেন লন্ডনে গিয়ে পরিচয় দান করে। কাজীদের দেশেই তার জন্ম হয় এবং তার জন্মের পরেই কাজীরা তার মাকে হত্যা করে। পরে তাকে তারা তাদের রানী করে এবং তাকে গনফালা নামে অভিহিত করে। মাফকা নিষেধ করায় আমি তাকে বলতে পারিনি সে আমার মেয়ে। কারণ মাফকা তাকে তার মেয়ে বলেই প্রচার করত।–মাউন্টফোর্ড।
বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে উড এক সময় গনফালাকে বলল, খুব ক্লান্তি বোধ হচ্ছে?
গনফালা বলল, মোটেই না।
ভন আইক বলল, কষ্ট হবে বৈকি! তুমি ত শুধু ওখানে সারাদিন সিংহাসনে বসে থাকতে।
গনফালা বলল, কিন্তু মাঝে মাঝে কাজীদের সঙ্গে শিকার করতাম আমি, তাই আমার সঙ্গে ছুটে পারবে না তোমরা।
গনফালা, উড আর ভন আইক পথ চলছিল বনের ভিতর দিয়ে। ওরা টারজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলেছে সভ্য জগতের দিকে। টারজান ওদের জন্য এক ভাল ও নির্ভরযোগ্য সফরী আনিয়ে দিয়েছে।
সারাদিন পথ চলার পর ওরা এক জায়গায় শিবির গড়ে তুলল। রাত্রিতে শিবিরের ধারে আগুন জ্বালিয়ে পাহারার ব্যবস্থা হলো।
এদিকে এই শিবিরের উত্তর দিকে এক মাইল দূরে স্পাইক আর স্ট্রোল আগুন দেখতে পেল।
ওটা কাদের শিবির, কারা ও আগুন জ্বেলেছে তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল দু’জনে। ও আগুন আদিবাসীরা জ্বালাতে পারে আবার শ্বেতাঙ্গ শিকারীদলও হতে পারে। আবার ক্লেটনও হতে পারে।
রাত্রিকালে এই বনাঞ্চলে সিংহের দারুণ ভয়। তবু ওরা আগুনটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে লাগল। তারা তখন সংখ্যায় মাত্র চারজন।
আগুনের কাছে গিয়ে শিবিরটাকে ভাল করে দেখল।
হঠাৎ গনফালাকে দেখতে পেযে স্পাইক চুপি চুপি স্ট্রোলকে শিবিরের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, ঐ দেখ কে।
স্ট্রোল দেখতে পেয়ে বলল, গনফালা।
তার সঙ্গে আছে উড আর ভন আইক।
স্ট্রোল বলল, আমরা শুধু গনফালাকে চাই। ওরা চুলোয় যাক।
কিন্তু গনফালাকে নিয়ে কি করব আমরা? কি কাজ হবে আমাদের?
তুমি একটা আস্ত বোকা। গনফালা কাছে থাকলে আমাদের হীরেটা কাজ করবে। যেমন করত মাফকার হাতে।
শিবিরের মধ্যে তখন উড, ভন আইক আর গনফালা কথা বলছিল। তাদের কথাবার্তার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্ট্রোল আর স্পাইক।
পরদিন ওরা কি করবে তার একটা কর্মসূচি তৈরি করছিল ভন আইক।
পরদিন সকালে প্রাতরাশের পরই শিকারে বেরিয়ে পড়ল ওরা তিনজন। ভন আইক গেল পূর্ব দিকে, উড গেল দক্ষিণে আর গনফালা গেল উত্তর দিকে। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল বন্দুক হাতে একজন করে সহকারী।
উডদের শিবিরের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি ছোট পাহাড়ের উপর থেকে স্ট্রোল আর স্পাইক উডদের এই শিকার-অভিযান লক্ষ্য করতে লাগল। গনফালা তার বন্দুকধারী সহকারীকে নিয়ে কোন দিকে গেল তা বিশেষ করে নজর রাখতে লাগল তারা।
গনফালাকে একা ভিন্ন এক দিকে শিকারে যেতে দিতে কিছুতেই মন চাইছিল না উডের। কিন্তু গনফালা না ছাড়ায় বাধ্য হয়েছে তাকে যেতে দিতে।
কিন্তু গনফালা তখন ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি একটা পাহাড়ের উপর থেকে স্ট্রোল আর স্পাইক তাকে লক্ষ্য করছে।
এমন সময় দুটো রাইফেলের গুলির আওয়াজ শুনে গনফালা তার বন্দুকবাহককে বলল, ওরা কেউ শিকার পেয়েছে। আমরা হয়ত ভুল পথে এসেছি।
বন্দুকবহনকারী বলল, না মেমসাহেব, ঐ দেখুন।
এই বলে একদিকে হাত বাড়িয়ে গণফালাকে দেখল। গনফালা সেদিকে তাকিয়ে একটা গাছের তলায় বড় খাদের মাঝে একটা সিংহকে দেখতে পেল।
গনফালা হাঁটু গেড়ে বসে তার বন্দুক থেকে গুলি করল। গুলিটা সিংহটার পায়ে লাগল, কিন্তু সে থামল না। সিংহটা মাটিতে পড়ে গিয়ে একবার গড়াগড়ি দিয়ে আবার উঠে ভয়ঙ্করভাবে দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে। গনফালা আবার গুলি করল। কিন্তু গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। তখন তার বন্দুকবাহক একটা গুলি করল। কিন্তু সে গুলিটাও লাগল না। সে তখন ছুটে পালাতে লাগল।
সিংহটা তখন গনফালাকে ছেড়ে পলাতক বন্দুকবাহকের দিকে ছুটতে লাগল। গনফালা আবার গুলি করল। গুলিটা এবার সিংহের গায়ে লাগল। কিন্তু সিংহটা পলাতক বন্দুকবাহকে ধরে ফেলল। তাকে ধরেই তার মাথায় একটা কামড় বসিয়ে দিল।
গনফালার বন্দুকবাহক লোকটা মারা যেতেই স্ট্রোল স্পাইককে বলল, ভালই হলো, আমরা মেয়েটা আর সেই সঙ্গে দুটো বন্দুক পেয়ে যাব।
স্ট্রোল আর স্পাইক এবার গনফালার দিকে এগিয়ে গেল।
তারা গনফালার কাছে এসে অন্তরঙ্গতার হাসি হেসে বলল, তুমি অল্পের জন্য বেঁচে গেছ।
গনফালা তাদের জিজ্ঞাসা করল, এখানে কি করছিলে তোমরা?
স্পাইক বলল, আমরা কোন একটা রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। তারপর পথ হারিয়ে ফেলি।
স্ট্রোল এবার মৃত বন্দুকবাহকের রাইফেল আর গুলিগুলো নিয়ে নিল। স্পাইক তখন গনফালার ভাল বন্দুকটাকে লক্ষ্য করতে লাগল।
