ভন আইক বলল, কিন্তু তা কি করে সম্ভব? গনফালা ত তাহলে চীৎকার করত। তাহলে শিবিরের সবাই জেগে উঠত। ওকে ত ওরা জোর করে নিয়ে যেতে পারবে না।
উড পাগলের মত বলল, তাকে আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। তাড়াতাড়ি করতে হবে।
ওরা যে পথে পালিয়ে গেছে নিগ্রোভৃত্যরা সেই পথই ধরল। পথটা চলে গেছে দক্ষিণ দিকেই।
এরপর দু’সপ্তা কেটে গেল। টারজান তার কাজ সেরে উত্তর দিক থেকে ফিরতে লাগল।
সেদিন বিকালের দিকে টারজান বনের মধ্যে শিকারীদের পায়ে চলা একটা পথ পেল। হালকা মৃদুমন্দ বাতাসে তার মাথায় কালো লম্বা চুলগুলো দুলছিল। সহসা সামনের দিক থেকে একটা সিংহের গন্ধ এসে লাগল তার নাকে। গন্ধ থেকে টারজান বুঝল সিংহটা বুড়ো।
এর পরেই টারজান আর একটা গন্ধ পেল। সে গন্ধ হলো এক শ্বেতাঙ্গ মহিলার।
গাছের উপর দিয়ে সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখল আলুথালু বেশে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একটি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে বন পথে কোনরকমে পা টেনে টেনে চলেছে। তার পরনের পোশাক ময়লা এবং ছেঁড়া। ক্রমাগত অনাহার, অনিদ্রা আর পথকষ্টে তার ইন্দ্রিয়চেনাগুলো ভোতা হয়ে গিয়েছিল। কোন কিছু সে যেন শুনতে পাচ্ছিল না।
সহসা পিছন ফিরে একটা সিংহকে দেখে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।
গনফালা থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে সিংহটাও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মাটিতে পেটটা ঠেকিয়ে শুয়ে ঝাঁপ দেবার জন্য গর্জন করে উঠল ভয়ঙ্করভাবে। এমন সময় গনফালা তার বিস্ফারিত চোখ দিয়ে দেখল একটা গাছের ডাল থেকে একজন নগ্নপ্রায় লোক সিংহটার পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সিংহটার মত এক ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল। সে দেখল একটা ধারাল চকচকে ছুরি বারবার ওঠানামা করতে লাগল। তারপর শেষবারের মত একবার গর্জন করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সিংহটা।
লোকটি এবার খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়াতে গনফালা চিনতে পারল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
গনফালা তখন যা যা হয়েছিল সব বলল। বলল, এই সব শুনে আমি বুঝলাম আমি থাকলে বিপদ নেমে আসবে উডের জীবনে। তাই আমি শিবির ছেড়ে একা পালিয়ে এসেছি। ওরা দক্ষিণ দিকে যাবে বলেই আমি এসেছি উত্তর দিকে।
গনফালা সব শেষে বলল, সে এখন কাজীদের দেশেই ফিরে যেতে চায়। কারণ সে তাদেরই শুধু চেনে।
টারজান বলল, সেখানে যাবে না তুমি। এখন মাফকা নেই। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।
টারজান বলল, এখন তুমি আমার সঙ্গে এস। পরে যা হোক একটা ব্যবস্থা হবে। উডের সঙ্গে অবশ্যই দেখা হবে।
কয়েক সপ্তা ধরে পথ চলার পর টারজান তার আফ্রিকার বাংলোতে তার স্ত্রীর কাছে নিয়ে গেল গনফালাকে। তার স্ত্রী গনফালাকে যথেষ্ট আদর যত্নের সঙ্গে রেখে দিল বাড়িতে।
এদিকে উড ও ভন আইকের অনেক খোঁজ করল। কিন্তু তাদের বা তাদের দলের কোন সন্ধান পেল না। এরই মধ্যে কোথায় কতদূরে গেল তারা তা বুঝতে পারল না টারজান।
দু’জন শ্বেতাঙ্গ অন্ধকার বনপথ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা পথ হারিয়ে ফেলেছিল।
উড একবার থেমে মাথার ঘাম মুছল। তারপর ভন আইককে বলল, আমরা যদি পূর্ব দিকে আরও এগিয়ে যাই তাহলে কোন গাঁ পাব। তাহলে আমরা কাউকে পথ-প্রদর্শক হিসেবে নিতে পারব।
এক ঘণ্টার মধ্যেই তারা একটা বড় বাংলোবাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছল। ভিতরে মুভিরো খবর পাঠাতেই টারজান বেরিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।
টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য হয়ে গেল উড আর আইক। দু’জনেই একবাক্যে বলে উঠল, ক্লেটন!
টারজান বলল, তোমাদের অনেক খোঁজ করেও কোন খবর পাইনি। ওখানে কি করছিলে? যাই হোক, তোমাদের দেখে খুব আনন্দ পেলাম। কোথায় ছিল এতদিন?
উড বলল, যে রাতে তুমি চরে আস সেই রাতেই স্পাইক আর স্ট্রোল গলফান আর পান্না দুটো ধাতুই চুরি কের নিয়ে পালিয়ে যায়। গনফালাকেও ধরে নিয়ে যায়। আমরা তাদের খোঁজ করে বেড়াচ্ছি।
টারজান বলল, হীরে আর পান্না দুটোই চুরি গেছে? একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। ওগুলো সুখের থেকে দুঃখই নিয়ে আসত তোমাদের জীবনে।
উড বলল, ওসব পাথর চুলোয় যাক। আমি শুধু গনফালাকেই চাই।
টারজান বলল, আমার মনে হয় খুব শীঘ্রই তাকে পাওয়া যাবে। এখন চল তোমাদের থাকার ঘর দেখিয়ে দিই। তোমরা স্নান করে নতুন পোশাক পাবে। তারপর বাগানে চলে যাবে। সেখানে আমরা থাকব।
ভনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে লাফিয়ে উঠল গনফালা। বব তুমি! সে কোথায়?
গনফালা তুমি! উড এখানে আছে। তুমি স্পাইক আর স্ট্রোলের হাত থেকে মুক্তি পেলে কি করে?
স্পাইক আর স্ট্রোলের সঙ্গে আমি কখনো ছিলাম না। আমি ত একাই চলে আসি।
এরপর সে রাতের ঘটনাটা সব বলল গনফালা।
গনফালা বলল, আমি তখন দেখলাম আমার জন্য স্ট্যানলির জীবন বিপন্ন হতে পারে। সে শুধু পান্না ধাতুটার জন্য আমাকে চায় এটা আমি ভাবতেই পারিনি।
ভন আইক বলল, একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম তার সঙ্গে। সে আমাকে বলেছে দরকার হলে তোমাকে নিয়ে নরকে যাবে, তোমার তুলনায় পান্না তুচ্ছ তার কাছে।
গনফালার চোখে জল এল। বলল, তার সঙ্গে এখন দেখা হবে?
এমন সময় উড বাগানে এসেই গনফালাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি যে গনফালাকে কত কষ্ট করে খুঁজে আসছে এতদিন সেই গনফালাকে এখানে দেখতে পেয়ে যাবে।
