অবশেষে নিউবারি নদীর উপত্যকায় এসে পড়ল।
টারজান তখন সবাইকে বলল, আমি এবার চলে যাব। তোমরা যাবে দক্ষিণে আর আমি যাব উত্তরে।
এই বলে সে তার হাত থেকে হীরের তালটা ভন আইকের হাতে দিয়ে বলল, এটা আজ রাতের মত রেখে দাও। কাল সকালে আমাদের সঙ্গে যে তিনজন কাজীদের মেয়েযোদ্ধা এসেছে তাদের একজনকে এটা দেব।
এরপর সে মেয়েযোদ্ধাদের বলল, আমি তোমাদের হাতে এটা তুলে দেব বলেছিলাম। এটা তোমরা ভাল কাজে ব্যবহার করবে। কোন অন্যায় করবে না।
এবার উডকে বলল, উড, গনফালার পক্ষ থেকে এই পান্নার তালটা নাও। আশা করি এর দ্বারা সুখী হবে সে।
স্পাইক বলল, তাহলে আমরা কি পাব?
টারজান বলল, শুধু মুক্তি নিয়ে চলে যাবে তোমরা। দিনকতক আগে এই মুক্তির কথাও ভাবতে পারতে না তোমরা।
স্পাইক বলল, এত বড় হীরের তালটা ঐ সব নিগ্রো মেয়েদের দিয়ে দিলে? আমরা তার একটা অংশও পাব না। এটা কিন্তু ঠিক নয়। এটা তুমি করতে পার না।
টারজান বলল, আমি তা ইতোমধ্যেই করে ফেলেছি।
স্পাইক তখন তার সঙ্গীদের বলল, এর জন্য তোমরা সবাই রুখে দাঁড়াবে না? ঐ দুটো ধাতু আমরা লন্ডনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে সব টাকা সমানভাবে ভাগ করে নেব।
ভন আইক বলল, আমি আমার জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি-এতেই আমি খুশি। গনফালার একটা ধাতুতে অধিকার আছে। অন্য ধাতুটা জুলি আর কাজীরা ভাগ করে নেবে। তাই নিয়ে তারা বাইরের জগতে চলে যাবে। তারপর যা হয় হবে।
কয়েকজন বন্দী শ্বেতাঙ্গ সমর্থন করল স্ট্রোলকে। অন্য শ্বেতাঙ্গরা বলল, আমরা মুক্তি পেয়েছি এটাই যথেষ্ট।
টারজান তাকে বলল, তুমি পাবে না। আমি যা বলার সব বলে দিয়েছি। আমি এখন উত্তর দিকে যাচ্ছি। কিন্তু তোমরা এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাবার আগেই আবার আমি ফিরে আসব দক্ষিণ দিকে। আমি এসে দেখব তোমরা কেউ কোন অন্যায় কাজ করছ কি না।
এই বলে চলে গেল টারজান। রাত্রির অন্ধকার তখন ঘন হয়ে উঠেছে। একশোজন পলাতকের সেই দলটি তখন শিবির স্থাপন করে রান্না খাওয়ায় মন দিল। যে সব নিগ্রো ক্রীতদাস হয়ে ছিল কাজীদের। দেশে তারা এখন কুলির কাজ করতে লাগল আর শ্বেতাঙ্গদের ভৃত্য হিসেবে ফাই-ফরমাশ খাটতে লাগল।
উড আর ভন আইক টারজনের সহকারী ছিল। টারজনের অনুপস্থিতিতে তারা এখন দলের নেতৃত্ব করতে লাগল। টারজান তাদের বলে গেছে দক্ষিণ দিকে মাইল তিনেক গেলেই আদিবাসীদের একটা গা পাবে। তারপর এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ হবে তাদের পক্ষে।
গনফালা বলল, সে যতক্ষণ আমাদের মাঝে ছিল বড় নিরাপদ বোধ করতাম। ও যে আফ্রিকার। একটা অংশ। এখানকার সব কিছুই ওর জানা।
রাত্রিটা ছিল মখমলের মত নরম। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল শিবিরের উপর। নিগ্রোরা কিছু তীর ধনুক তৈরি করল।
শ্বেতাঙ্গরা এক একটা ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গল্প করতে লাগল। উড গনফালা আর ভন আইক কাজীদের দেশ থেকে আনা একটা চামড়ার উপর শুয়ে ভবিষ্যতের কথা আলোচনা করতে লাগল। গনফালা যাবে লন্ডনে। অন্যান্য শ্বেতাঙ্গরা আমেরিকায় তাদের বাড়ির কথা ভাবতে লাগল। তাদের বাড়ির লোকেরা তাদের মৃত ভেবে তাদের আশা ত্যাগ করেছে।
কিছুক্ষণ কথা বলার পর গনফালা তার ছোট আস্তানাটায় শুতে চলে গেল। উডও শুয়ে পড়ল। গনফালার কিন্তু ঘুম এল না চোখে।
কিছুক্ষণের মধ্যে শিবির থেকে নিঃশব্দে বনচ্ছায়ার মধ্যে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। শিবিরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চাঁদ তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে।
গাছের ছায়ার মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছিল গনফালা ধীর পায়ে।
সহসা এক জায়গায় কাদের কথা বলার চাপা শব্দ শুনতে পেল।
গনফালা স্পষ্ট শুনতে পেল আড়াল থেকে কে একজন বলছে, হীরে আর পান্না দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেল আমাদের। তার দাম কত জান স্ট্রোল? আমরা কিছুই পেলাম না।
স্ট্রোল বলল, পান্নার তালটাকে ও নিগ্রো মেয়েটাকে দিয়ে দিল জোর করে। ওটা কিন্তু দেখো, উড নামে ঐ আমেরিকানটা ভালবাসবার নাম করে ভুলিয়ে নেবে ওর কাছ থেকে, ও কখনো নিগ্রো মেয়েটাকে বিয়ে করবে না।
কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আর দাঁড়াল না গনফালা। ছায়াঘেরা নৈশ বনপথের মধ্যে। ছুটতে লাগল সে। কোথায় যাবে সে তা জানে না।
পরদিন সকালে উড ঘুম থেকে উঠেই কামুদিকে ডাকল। বলল, সবাইকে ডাক। আজ আমরা তাড়াতাড়ি রওনা হব।
ভন আইক চারদিকে তাকিয়ে কিসের খোঁজ করতে লাগল। হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠল।
ভন আইক বলল, গনফাল নেই। গতরাতেও এইখানে ছিল একটা চামড়ায় মোড়া।
উড তার বিছানাটা ভাল করে খুঁজে দেখল, তারপর হতাশ হয়ে বলল, পান্নার তালটাও নেই। কে এ কাজ করল?
এরপর তারা দু’জনে শিবিরের অন্য জায়গায় গিয়ে মেয়েযোদ্ধারা যেখানে শুয়ে ছিল সেখানে গিয়ে খোঁজ করল।
টারজান সেটা রাত্রির মত ভন আইককে রাখতে দিয়েছিল।
এরপর দেখা গেল স্পাইক আর স্ট্রোল শিবিরে নেই।
এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল ওরা।
উড বলল, এরকম কিছু একটা ঘটবে তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। ওরাই সেটা নিয়ে পালিয়েছে।
উড তখন গনফালার তাঁবুতে গেল। গণফালার নাম ধরে অনেক ডাকাডাকি করল। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। তারপর ও নিজে ঢুকল তাবুতে। কিন্তু হতাশ হয়ে বেরিয়ে এল পরমুহূর্তে। মুখখানা সাদা হয়ে উঠল ওর। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ওরা ওকেও নিয়ে পালিয়ে গেছে।
