গনফালা বলল, ঠিক আছে। আগে আমার হুকুম তামিল করো। তারপর জুলিদের বন্দী করে নিয়ে দরবার ঘরে এস। তখন মাফকাকে দেখতে পাবে।
মেয়েযোদ্ধাটি চলে গেলে যে ঘরে টারজানরা অপেক্ষা করছিল গনফালা সে ঘরের দরজা খুলে দিল। টারজান বেরিয়ে এসে বলল, আমি সব শুনেছি। তোমার এখন পরিকল্পনা কি?
আমি কিছু সময় চাই।
এরপর তাহলে মাফকাকে দরবার ঘরে হাজির করাতে চাও?
না, কারণ মাফকাকে বাঁধা অবস্থায় দেখলে ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। আবার মাফকাকে ছেড়ে দিলেও সে আমাদের হত্যা করবে।
তাহলেও এটা একটা ভাল মতলব। আমরা এটাই করব।
টারজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
গনফালা বলল, তুমি কি পাগল হয়েছ?
হয়ত তাই। আমরা যদি এখন এখান থেকে চলে যাই তাহলে আমরা কাজীদের সঙ্গে যুদ্ধ না করে যেতে পারব না। মেয়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না আমি। আমার মনে হয় উপায় একটা আছে। আচ্ছা তুমি জান আসল গনফালটা কোথায় আছে?
হা জানি।
এই বলে গনফালা মাফকার ঘরে গিয়ে একটি দরজা খুলল। সেই দরজা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে আবার একটা ছোট দরজা পেল। সেই দরজা খুলে বেরিয়েই তারা দরবার ঘরে মঞ্চের পিছনে এসে পড়ল।
দরবার ঘর তখন শূন্য। মেয়েযোদ্ধারা তখনো ফিরে আসেনি। টারজনের নির্দেশ অনুসারে উড সিংহাসনের পাশে একটা উঁচু জায়গায় আসল গনফালটা রাখল। স্ট্রোল আর স্পাইক হাত, পা ও চোখ মুখ বাধা অবস্থায় মাফকাকে তার চেয়ারে বসিয়ে দিল। গনফালা পাশের একটি চেয়ারে বসল।
টারজান গনফালা বা হীরের তালটায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্যরা চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে রইল। ভন আইক পান্নার তালটা চামড়া দিয়ে ঢেকে রাখল।
এমন সময় ঘরের বাইরে বারান্দায় পদশব্দ শোনা গেল। ঘরের দরজা খুলে দেয়া হলো। কাজী যোদ্ধাদের নেত্রীরা ঘরে ঢুকল। মাফকা আর রানীর প্রতি শ্রদ্ধাবশত তারা সবাই মাথা নত করল।
কিন্তু মাফকার অবস্থা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। একজন ক্রুদ্ধভাবে গনফালাকে প্রশ্ন করল, এ সবের অর্থ কি গনফালা?
কয়েকজন অপরিচিত বিদেশীকে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো আশ্চর্য হয়ে গেল তারা।
তাদের প্রশ্নের উত্তর দিল টারজান। বলল, এর অর্থ হচ্ছে এই যে মাফকার আর কোন শক্তি নেই। সে তোমাদের সকলের জীবনকে তার হাতের মুঠোর মধ্যে রেখেছিল। সে তার নিজের স্বার্থের জন্য তোমাদের দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে নিয়ে যুদ্ধের সব ফল সে একা ভোগ করেছে। তোমাদের সে বন্দী করে রেখেছিল। তোমরা তাকে ভয় করতে, ঘৃণা করতে। কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারতে না।
মেয়েযোদ্ধাটি তখন বলল, মাফকা আমাদের শক্তি যোগ্যতা। তার শক্তি চলে গেলে আমরা শক্তিহীন হয়ে পড়ব।
টারজান বলল, সে শক্তি যায়নি। শুধু সে শক্তি এখন মাফকার হাতে নেই।
মেয়েযোদ্ধাদের একজন বলল, ওদের মেরে ফেল। মেরে ফেল।
তখন সবাই এই কথা বলে চীৎকার করতে লাগল। তারা এইভাবে চীৎকার করতে করতে মঞ্চের দিকে এগোতে লাগল।
টারজান তখন গণফালার উপর একটা হাত রেখে বলল, থাম, তোমরা রানীর সামনে নতজানু হও।
কথাটা শুনতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে যোদ্ধারা সবাই নতজানু হলো।
টারজান বলল, এবার উঠে দাঁড়াও। যাও, নগরদ্বারে যাও। বন্দীদের নিয়ে এস। তারা আসবে। যুদ্ধ বন্ধ হবে না।
যোদ্ধারা সকলে দরবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে টারজান তার দলের লোকদের বলল, আমাদের পরিকল্পনা ঠিকমত কাজ করেছে। আমি জানতাম এতে কাজ হবে। মাফকার যা কিছু অলৌকিক শক্তি ছিল তা এই গণফানের মধ্যেই আছে নিহিত। পান্নার তালটাতেও একই শক্তি আছে। তবে বাজে লোকের হাত পড়লে এর ফল খারাপ হবে। এ শক্তিকে ভাল কাজে নিয়োজিত করতে হবে।
গনফালা সব কিছু মন দিয়ে শুনছিল। এমন সময় বারান্দায় আবার পদশব্দ শোনা গেল। গনফালা বলল, ওরা আসছে।
পঞ্চাশজন মেয়েযোদ্ধা ঘরে ঢুকল। তাদের মধ্যে অর্ধেক ছিল কাজী আর অর্ধেক জুলি। অনেকের গা থেকে তখন রক্ত ঝরছিল। তাদের দেহে অনেক ক্ষত ছিল।
টারজান তাদের বলল, এখন তোমরা মুক্ত। উরা আর মাফকা দুজনেরই শাসন থেকে মুক্ত তোমরা। উরা মৃত। আর মাফকাকে আমি তোমাদের হাতে তুলে দেব। তোমাদের যা খুশি করবে। গনফালটা সরিয়ে নেবার সঙ্গে সঙ্গে তার সব শক্তি চলে গেছে। আমরা এ দেশ থেকে চলে যাচ্ছি। রানী গনফালাও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। যে সব বন্দী ও ক্রীতদাসরা আমাদের সঙ্গে যেতে চায় তারা যেতে পারে। আমরা নিরাপদে এ দেশের সীমানা ছেড়ে চলে গেলে গনফালটা আমি তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। এখন সকাল হয়ে গেছে। আমরা যাচ্ছি। এই নাও মাফকাকে।
এই বলে টারজান মাফকাকে দু’হাত দিয়ে তুলে মেয়েযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিল।
মেয়েযোদ্ধারা সব স্তব্ধ হয়ে রইল। টারজান তার দলের লোকদের নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার হাতে ছিল চামড়া ঢাকা গনফাল। ভন আইকের হাতে ছিল জুলিদের পান্নার তালটা।
নগরের রাজপথে এলে তারা দেখল একদল নিগ্রো ক্রীতদাস ও শ্বেতাঙ্গ বন্দী দাঁড়িয়ে ছিল পথের ধারে।
টারজান তাদের বলল, আমরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমরা ইচ্ছা করলে আমাদের সঙ্গে যেতে পার।
বন্দীরা ভয়ে ভয়ে বলল, মাফকা আমাদের খুন করবে।
টারজান বলল, মাফকা আর কাউকে খুন করতে পারবে না।
নিরাপদে তারা কাজীদের দেশের সীমানাটা পার হয়ে গেল। গনফাল হাতে টারজান তাদের পথ। দেখিয়ে নিয়ে গেল। বন্দী ও ক্রীতদাসদের মন থেকে ভয় কাটেনি তখনো।
