মাফকা গর্জন করে উঠল, না, আমি তা করিনি।
টারজান এবার বুঝল উপরতলার কারাকক্ষ থেকে নিচের তলায় গনফালার ঘরে যাবার যে একটা গোপন সুড়ঙ্গপথ আছে মাফকা তা জানে না।
টারজান আরও লক্ষ্য করল যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে মাফকা সে ঘরের পিছনে আর একটি আলোকিত ঘর রয়েছে। সেইটিই তার শোবার ঘর ও গবেষণাগার।
এবার এক নতুন প্রশ্ন করল মাফকা, কেন তুমি আমাকে না জানিয়ে জুলিদের দেশে গিয়েছিলে?
টারজান বলল, এ কথা কে বলেছে আমি ওখানে গিয়েছিলাম।
তুমিই আমার ভাই উরাকে মেরেছ। তুমিই তার পান্নার তালটা চুরি করেছিলে। তুমি আমাকে হত্যা করার জন্য এ দেশে এসেছ। তুমি জানতে চাইছিলে কে বলেছে আমাকে এ সব কথা। বলেছে এই লোকটি।
এই কথা বলেই সেই রক্তমাখা কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল মাফকা। সঙ্গে সঙ্গে লর্ডের কাটা মুণ্ডটা আর তার পাশে পান্নার সবুজ ধাতব তালটা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে।
কিন্তু টারজনের মুখের ভাবের মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। সে মোটেই বিচলিত হলো না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মাফকা বলল, মাফকার শত্রুদের এই অবস্থায়ই হয়। তোমাকেও এইভাবে মরতে হবে। যারা আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, আমার লোকদের উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ করে। তুলছে তাদেরকেও মরতে হবে এমনি শোচনীয়ভাবে।
এরপর সে তার রক্ষীদের ডেকে বলল, যাও, লোকটাকে সেই ঘরে বন্দী করে রাখগে। অন্য সব ষড়যন্ত্রকারীদেরও ওর সঙ্গে একই ঘরে রাখবে। একই সঙ্গে মারা হবে ওদের।
আগে যে ঘরে টারজান ছিল উপরতলার সেই ঘরে রক্ষীরা নিয়ে গেল তাকে। আর কোন্ কোন্ বন্দীকে তার ঘরে আনা হবে তা বুঝতে পারল না টারজান। সে জানালা দিয়ে নগরটার দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে তা দেখার চেষ্টা করছিল আর ভাবছিল উডের সঙ্গে কিভাবে দেখা হতে পারে তার।
টারজান একটা পরিকল্পনা খাড়া করল বটে, কিন্তু সেটা নির্ভর করছে উডের উপর।
টারজান যখন আপন মনে এই সব কথা ভাবছিল হঠাৎ তখন ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে খোলা হলো। চারজন বন্দী ঘরে ঢুকল। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে টারজান দেখল চারজন বন্দীর মধ্যে উড একজন।
টারজানকে দেখেই চীৎকার করে উঠল উড, ক্লেটন না? আরে তুমি কি করে এখানে এলে? এখানে কি করছ তুমি?
তোমাদের মতই মৃত্যুর জন্য প্রহর গণনা করছি।
তুমি কি করে ধরা পড়লে? আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ওরা কিছুতেই ধরতে পারবে না।
টারজান তখন তাকে বুঝিয়ে বলল, কিভাবে সে এদিকে আসতে আসতে চিতাবাঘ ধরার ফাঁদে পড়ে যায় এবং কিভাবে তারা ধরে তাকে।
উড তখন তার সঙ্গী তিনজনের সঙ্গে টারজনের পরিচয় করিয়ে দিল। তার সঙ্গে ভন আইক, স্ট্রোল আর স্পাইক। স্ট্রোলের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল টারজনের। এই তিনজন সঙ্গী তাদের সফরীতে ছিল।
টারজান বলল, মাফকা আমাকে একটু আগে বলেছে, আমাদের সবাইকে মারবে ওরা। মাফকা। বলেছে তোমরা গোলমাল বাধাও।
ভন আইক বলল, কোন গোলমাল বাধাবার আগেই ও সব জানতে পারে। তুমি কিছু ভাববার আগেই ও তা জানতে পারে।
টারজান বলল, স্পাইক ঠিকই বলেছে, গনফালার মধ্যে নিগ্রো রক্ত আছে। আমি কিছুক্ষণ আগে ওকে দেখেছি।
তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু বলেছ তাকে?
হা বলেছি। সে তোমাকে সাহায্য করতে চায়।
প্রথমে সে এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিল এবং আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু পরে হঠাৎ সে বদলে যায় এবং চীৎকার করে আমাকে ধরাবার জন্য প্রহরীদের ডাকতে থাকে অকারণে।
টারজান বলল, এখন আমাদের একমাত্র ভাববার বিষয় হলো কিভাবে আমরা মুক্তি পেতে পারি। তবে আমাদের যা কিছু তাড়াতাড়ি করতে হবে। হঠাৎ ওকে ধরতে হবে।
উড বলল, কিন্তু কড়া পাহারার মধ্যে রুদ্ধদ্বার ঘরে বন্দী থাকাকালে কিভাবে ওকে হঠাৎ ধরব?
টারজান বলল, অন্য বন্দীদের খবর কি? তারা কি আমাদের দলে যোগদান করবে?
উড বলল, একবার যদি হীরের তালটা হস্তগত করতে পারতাম! ঐ ধাতুটাই ওর সমস্ত শক্তির উৎস।
টারজান বলল, ওটা আমরা হাত করতে পারি।
উড বলল, অসম্ভব। মাফকা তার ঔষধবিদ্যা আর যাদু জানে। তার সাহায্যে ও একটা নকল হীরকখণ্ড তৈরি করেছে। সেটা যখন তখন দেখায়। আসল হীরেটা লুকিয়ে রাখে। রাত্রিবেলায় নকল হীরেটা সামনে রেখে আসলটা তার কাছেই কোনভাবে লুকিয়ে রাখে। রাত্রিবেলায় কেউ হীরে চুরির জন্য তার ঘরে ঢুকলে নকল হীরেটাই দেখতে পাবে সামনে। অবশ্য আসল হীরেটা ও কাছেই রাখে।
ভন আইক বলল, হীরেটা নিতে হলে রাত্রিবেলায় ওর নির্জন ঘরে ঢুকতে হবে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়।
টারজান বলল, মাফকার ঘরটা কি গনফালা বা রানীর ঘরের পাশেই?
হ্যাঁ পাশেই, কিন্তু মাফকা দুটো ঘরের মাঝখানের দরজাটা তালাবন্ধ করে রাখে রাত্রিতে।
টারজান বলল, আমার মনে হচ্ছে মাফকার ঘরে আমি যেতে পারব। আমি যাচ্ছি।
কেমন করে যাবে শুনি?
এরপর সে সেই চুল্লীর ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গপথে চলে গেল।
ভন আইক উডকে জিজ্ঞাসা করল, লোকটা কে?
ক্লেটন নামে এক ইংরেজ। আমি অন্তত তাই জানি। ও নিজে আমাকে বলেছে।
আমার মনে হয় টারজান নামে যদি কোন লোক থাকে ত ও হচ্ছে সেই।
উড বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছিল। ও গাছের উপর দিয়ে বাঁদরের মত যাওয়া আসা করে। তীর ধনুক দিয়ে জীবজন্তু মেরে কাঁচা মাংস খায়।
যে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে গনফালার ঘরে গিয়ে পড়েছিল টারজান সেই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে সে গনফালার ঘরটা পাশে ফেলে রেখে মাফকার বড় ঘরটায় গিয়ে পৌঁছল। দেখল মাফকা তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে নাক ডাকিয়ে গভীরভাবে ঘুমোচ্ছে। তার খাটের পাশে টেবিলে হীরে ও পান্নার দুটো তালই রয়েছে। টেবিলের উপর একটা ধারাল দা আর একটা বড় ছোরা রয়েছে। গনফালার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া ছুরিটা টারজনের হাতে ছিল।
