ঘরটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল টারজান। জানালাগুলো ঘরের অনেক উপরে। সেদিক দিয়ে বাইরে যাবার কোন উপায় নেই।
সে তখন আগুন জ্বালাবার শূন্য চুল্লীটাকে পরীক্ষা করে দেখল। দেখল সেটা আসলে কোন চুল্লী নয়, নিচের তলায় যাবার একটা গুপ্ত পথ। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ দিয়ে নিচের তলায় একটি বড় ঘরে গিয়ে পড়ল টারজান। ঘরটির দরজায় ভিতর থেকে খিল আঁটা ছিল। মৃদু আলোকিত সেই ঘরের একপ্রান্তে একটি চেয়ারের উপর কাজীদের রানী গনফালা বসে তন্ময় হয়ে কি ভাবছিল।
নিঃশব্দে গনফালার দিকে এগিয়ে গেল টারজান। বুঝতে পেরে মুখ ফিরিয়ে টারজানকে দেখে বিস্মিত হলো গনফালা। কিন্তু চীৎকার করল না।
টারজান বলল, ভয় পেও না। আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে আসিনি।
গনফালা বলল, আমি ভয় পাইনি। আমার হাতের নাগালের মধ্যে অনেক যোদ্ধা আছে এবং ডাকলেই তারা ছুটে আসবে। কিন্তু তুমি কি করে এলে এখানে?
টারজান দেখল রানী গনফালার মধ্যে প্রভুত্বসূচক কোন কঠোর বা উদ্ধত ভাব নেই। সে এখন শান্ত মিষ্টি একটি মেয়ে।
টারজান তার কোন জবাব না দিয়ে বলল, স্ট্যানলি উড এখন কোথায়? ওরা ওকে নিয়ে কি করবে?
তুমি স্ট্যানলি উডকে চিনলে কি করে?
আমি তার বন্ধু। সে এখন কোথায়?
গনফালা বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে টারজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তার বন্ধু? তাতে কিছু যায় আসে না। তার যত বন্ধুই থাক, কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না।
তোমারই সাহায্যে সে কিন্তু একদিন মুক্ত হয়ে পালিয়ে যায়।
চুপ করো। মাফকা আমাকে এ ব্যাপারে সন্দেহ করে বলেই আমাকে কড়া পাহারায় এ ঘরে নজরবন্দী করে রেখেছে। সে বলে আমারই নিরাপত্তার জন্যই এই পাহারার ব্যবস্থা। কিন্তু আমি জানি এর আসল কারণ কি।
মাফকা কোথায়? আমি তাকে দেখতে চাই।
তুমি তাকে আগেই দেখেছ। তোমাকে বন্দী করে তারই কাছে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিন্তু তুমি একজন বিদেশী হয়ে তাকে না জানিয়ে তার নগর সীমানার মধ্যে প্রবেশ করেছ শুনে তোমাকে দেখতে চায় সে। কিন্তু তুমি আসলে কে?
টারজান নিচু গলায় বলল, কিন্তু তুমি স্ট্যানলি উডকে মুক্ত করতে চাও এবং তার সঙ্গে তুমি যেতে চাও। তবে তুমি কেন আমাকে সাহায্য করছ না?
কিন্তু কি করে তোমায় সাহায্য করতে পারি আমি?
তুমি শুধু আমাকে বলে দাও মাফকাকে একা কোথায় পেতে পারি আমি।
সহসা গনফালার মুখের ভাবটা বদলে গেল একেবারে। এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার ছাপ ফুটে উঠল তার চোখে মুখে। উডের কথাটা মনে পড়ে গেল টারজনের। মাঝ মাঝে এমনি করে আশ্চর্যভাবে বদলে যায় গনফালা।
কোন কথা না বলে রক্ষী রক্ষী বলে চীৎকার করে উঠল গনফালা। সে তার কোমরের খাপ থেকে ছুরিটা বার করে টারজানকে মারতে গেল লাফ দিয়ে। টারজান তার হাতের কব্জিটা ধরে ফেলে কেড়ে নিল ছুরিটা। তারপর বলল, বল, কিছু হয়নি। ওদের যেতে বল।
রক্ষীরা গনফালার চীৎকার শুনে রুদ্ধ দরজায় করাঘাত করছিল। গনফালা আরো জোরে চীৎকার করতে লাগল সাহায্যের জন্য।
টারজান তখন তাকে ধরে ঘরের অন্য দিকের একটি দরজা খুলে ভিতর দিকের একটি ঘরে তাকে ভরে দরজাটায় শিকল তুলে দিল। তারপর যে গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে এসেছিল সেই পথে এক মুহূর্তে তার উপরতলার ঘরে চলে গেল।
রক্ষীরা সেই ঘর খুলে গনফালাকে মুক্ত করলে গনফালা বলল, নোকটা কোথায়? তাকে ধরেছ?
রক্ষীবাহিনীরা একজন বলল, এ ঘরে ত কেউ নেই।
যে লোকটাকে আজ বন্দী করে আনা হয় সেই লোকটা নেই।
এখানে ত কেউ ছিল না।
মাফকার কাছে গিয়ে এখনি জানাও বন্দীটা পালিয়েছে। তোমাদের মধ্যে কয়েকজন বন্দীর ঘরে এখনি গিয়ে দেখ সে সেখানে আছে কি না। আমি বলছি লোকটা আমার ঘরে একটু আগে এসেছিল। আমার ছুরিটা সে কেড়ে নিয়ে ঐ ঘরে আমাকে ভরে রাখে। তোমরা কয়েকজন এ ঘরে থাক। সে আবার আসতে পারে।
রক্ষীরা টারজনের ঘরে গিয়ে যখন দেখল সে বসে আছে সেই ঘরে তখন তারা আশ্চর্য হয়ে গেল সকলে।
একজন রক্ষী জিজ্ঞাসা করল তাকে, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?
কোথায় আর যাব?
তুমি রানী গনফালার ঘরে গিয়েছিলে।
সেটা আমাকে জিজ্ঞাসা না করে রানীকে জিজ্ঞাসা করগে। কেউ যদি পাগল হয়, আমি ত আর পাগল নই।
রক্ষীরা চলে গেল ঘর বন্ধ করে। ঘণ্টাখানেক পর ডজনখানেক মেয়েযোদ্ধা এসে টারজানকে সঙ্গে করে মাফকার কাছে নিয়ে গেল। টারজান দেখল মাফকার শোবার ঘরটা রানীর ঘরের পাশেই।
একটা টেবিলের ধারে তখন দাঁড়িয়ে ছিল মাফকা। টেবিলের উপর কাপড় জড়ানো কি একটা জিনিস ছিল। তার পাশেই ছিল গনফাল নামে সেই হীরকের তাল। মাফকা তার উপর একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল।
নাকে রক্তের গন্ধ পেল টারজান। সে দেখল কাপড় ঢাকা সে বস্তুটা টেবিলের উপর ছিল তার উপর রক্তের দাগ রয়েছে। সে বুঝল বস্তুটা যাই হোক সেটা তাকে দেখাতে চায় মাফকা।
মাফকার সামনে দাঁড়িয়েছিল টারজান। দু’জনেই ছিল নীরব নির্বাক, শুধু মনে মনে যুদ্ধ চলছিল।
হঠাৎ মাফকা প্রশ্ন করল টারজানকে, রানীর ঘরে কি করে গিয়েছিলে?
টারজান কড়া গলায় বলল, কিন্তু তুমি কেমন করে জেনেছ যে আমি রানীর ঘরে গিয়েছিলাম?
গনফালা তোমাকে দেখেছে।
গনফালা আমাকে সশরীরে দেখেছে না এটা তার মনের অসার কল্পনা। তাছাড়া এমনও হতে পারে যাদুকর মাফকাই হয়ত তার মনে এই চিন্তাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে।
