কালি বাওয়ানা শিউরে উঠল। তার শরীরের ভিতরটা যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। একবার ভাবল এই জংলী মানুষটার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তখনই সে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল; পালাবার সুযোগই হল না। ভাবল, তীর-ধনুক তো হাতেই আছে; কিন্ত তা দিয়ে কি এই মানুষটাকে ভয় দেখানো যাবে!
লোকটি কিন্তু সহজভাবেই বলল, ঠিক সময়েই এসে পড়েছি। তোমার বন্ধুটিও এখনই এসে পড়বে; একটু থেমে বলল, ধনুকটা নামিয়ে রাখ, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।
ধনুকটা পাশে রেখে মেয়েটি বলল, আমার বন্ধু! কে? তুমি কার কথা বলছ?
নাম তো জানি না। তোমার কি অনেক বন্ধু আছে?
বন্ধু তো একজনই আছে। কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম সে মারা গেছে। একটা মস্ত গোরিলা তাকে তুলে নিয়ে গেছে।
টারজান আশ্বাস দিয়ে বলল, সে ভালই আছে। এখনই আসবে।
কালি বাওয়ানা মাটিতে বসে পড়ল। অস্ফুট স্বরে বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!
বুকের উপর দুই হাত রেখে টারজান মেয়েটিকে দেখছে। কী সুন্দর দেখতে! এই নরম শরীরে এত কষ্ট সে সহ্য করেছে? অরণ্যরাজ সাহসের প্রশংসা করে; সে জানে, যে বিপদের ভিতর দিয়ে মেয়েটি এসেছে তাতে কতখানি সাহস থাকা দরকার।
কার যেন পায়ের শব্দ কানে এল। টারজান বুঝতে পারল। পরিশ্রমের ফলে লোকটা হাঁপাচ্ছে। মেয়েটিকে দেখেই ছুটে গিয়ে বলে উঠল, তুমি ভাল আছ? মরা চিতাটা তার পাশেই পড়ে আছে।
হ্যাঁ, মেয়েটি জবাব দিল।
দু’জনই কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কার মনে কি আছে তা কেউ জানে না। লোকটিকে নিরাপদ দেখে মেয়েটি তার মনের ভাবটা চেপেই রাখল। আবার ওদিকে বুড়ো টাইমারের কানে তখনও বাজছে কালি বাওয়ানার সেই কঠোর উক্তি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি।
টারজান বলল, তাদের দু’জনকে সে বুড়ো টাইমারের শিবিরে পৌঁছে দিতে পারে, অথবা নদীর ভাটিতে প্রথম থানায় তাদের রেখে আসতে পারে। মেয়েটি কিন্তু জিদ ধরল, সে শিবিরেই ফিরে যাবে, তারপর সেখান থেকে নতুন করে যাত্রার আয়োজন করবে; তখন বুড়ো টাইমার তার সঙ্গে নদীর ভাটিতেও যেতে পারে, অথবা জেরি জেরোমের অনুসন্ধানে তার সঙ্গীও হতে পারে।
রাত হবার আগেই টারজান মাংস নিয়ে ফিরে এল। দু’জনে সেই মাংস রান্না করতে বসল, আর টারজান একটু দূরে বসে শক্ত সাদা হাত দিয়ে কাঁচা মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। তার কাঁধে বসে ছোট্ট নকিমা ঘুমে ঢুলতে লাগল।
পশ্চিম অরণ্যের ওপারে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। বোবোলোর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় নদীটার খরস্রোতে তার আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। একটি পুরুষ ও একটি নারী সেই স্রোতধারার দিকে তাকিয়ে আছে। এই অন্ধকার গহন অরণ্য তার সভ্য জগতের মধ্যে এই নদীই একমাত্র যোগসূত্র; অনেক নগর, বন্দর পার হয়ে সে দীর্ঘ যাত্রায় চলেছে পশ্চিম দিকে সাগরের ডাকে।
লোকটি বলল, কালই আমরা যাত্রা করব। ছয় বা আট সপ্তাহের মধ্যেই তোমরা দু’জন বাড়ি পৌঁছে যাবে। বাড়ি’ এই একটি মাত্র ছোট শব্দের মধ্যে কত না ইচ্ছা পূরণের আনন্দ লুকিয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোকটি বলল, তোমাদের দুজনের জন্য আমার কত আনন্দ।
মেয়েটি আরও কাছে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল, তুমিও তো আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছ?
এ কথা কেন ভাবছ? লোকটি শুধাল।
যেহেতু আমি তোমাকে ভালবাসি, তাই তুমি যাবে।
জঙ্গলের রাজা টারজান (টারজান লর্ড অফ দি জাঙ্গল)
সেদিন ভরদুপুরে জঙ্গলের ছায়াঘেরা গভীরে টারজনের প্রিয় বন্ধু ট্যান্টর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার গুঁড়টা দোলাচ্ছিল। এই বিশাল জঙ্গলের মধ্যে বহু বছর ধরে নুমা, শীতা, ডাঙ্গো প্রভৃতি কত সব হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের কাছাকাছি বাস করে আসছে হাতিটা। কিন্তু এদের কাউকে ভয় করে না সে। কেউ তাকে অকারণে মারতে আসে না বা লড়াই করতে আসে না তার সঙ্গে। একমাত্র মানুষই তার শত্রু। কালো সাদা সব মানুষই তার দাঁতের লোভে তাকে মারতে আসে।
মানুষদের মধ্যে একমাত্র টারজানই হলো ব্যতিক্রম। সে সাদা চামড়ার মানুষ হলেও তাকে কোনদিন মারতে আসেনি। ছেলেবেলা থেকে সে খেলা করে আসছে তার সঙ্গে।
একদিন ফাঁদ ও মতলগ নামে দু’জন আরব ফেজুয়ান নামে এক নিগ্রো ক্রীতদাসকে সঙ্গে নিয়ে। শিকার করতে করতে উত্তর দিকে চলে আসে।
হাতিটাকে দূর থেকেই গুলি করে আরবরা। ফেজুয়ান প্রথমে দেখতে পায়। কিন্তু গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হাতিটার পাশ দিয়ে চলে যায়। হাতিটা ছুটে পালিয়ে যায়। টারজান তখন হাতিটার পিঠের উপর শুয়েছিল। হাতিটা ডালপালা ভেঙ্গে সেখান দিয়ে পথ করে পালিয়ে যেতে গেলে একটা গাছের ডালে মাথায় জোর আঘাতের ফলে টারজান মাটিতে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।
ফেজুয়ান ফাদকে বলল, তোমার গুলিটা লাগেনি মালিক।
ফাদ বলল, গুলিটার মধ্যে শয়তান ছিল। চল দেখি হাতিটার গায়ে হয়ত লেগেছে।
ফাদ বলল, একটা হাতি শিকার করতে গিয়ে একটা শ্বেতাঙ্গকে মারলাম?
মতলগ বলল, একটা খ্রিস্টান কুকুর, আবার প্রায় উলফঙ্গ। গুলিটা ওর কোথায় লেগেছে?
ওরা টারজনের দেহটা পরীক্ষা করে দেখল তার দেহে কোথাও কোন ক্ষতচিহ্ন নেই। শুধু মাথায় একটা ক্ষতচিহ্ন আছে।
ফেজুয়ান বলল, ও এখনো মরেনি। হাতিটা পালিয়ে গেছে। হাতিটা যখন পালিয়ে যাচ্ছিল তখন ওর মাথায় আঘাত লাগে।
